আমেনা হীরা
প্রকাশ : ১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০১:০৩ এএম
আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০১:৪১ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠাচ্ছে চীন

চীনের পতাকা। ছবি : সংগৃহীত
চীনের পতাকা। ছবি : সংগৃহীত

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণের লক্ষ্যে বাংলাদেশে পর্যবেক্ষক পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে চীন। কূটনৈতিক পত্রের মাধ্যমে চীন সরকার নিশ্চিত করেছে, এ নির্বাচনে দুজন অফিসিয়াল পর্যবেক্ষক পাঠাতে চান তারা।

সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র কালবেলাকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

সূত্রটি জানিয়েছে, এ দুই পর্যবেক্ষক নির্বাচনের আগে আগেই বাংলাদেশে আসবেন এবং ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া সরাসরি পর্যবেক্ষণ করবেন। ঢাকায় চীনা দূতাবাসের কর্মকর্তারা একটি টিমের মাধ্যমে এ পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে মিলে নির্বাচন পর্যবেক্ষণে কাজ করবেন।

এ সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের ধারাবাহিকতায় এসেছে। ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চীন প্রথমবারের মতো অফিসিয়ালি তিনজন পর্যবেক্ষক পাঠিয়েছিল। সেবার পশ্চিমা দেশগুলো (ইইউ, যুক্তরাষ্ট্র) পূর্ণাঙ্গ মিশন না পাঠালেও চীন, রাশিয়া, জাপানের মতো দেশগুলো ছোট দল পাঠিয়ে নির্বাচনকে সমর্থন জানিয়েছিল। এবারও চীন ছোট কিন্তু অফিসিয়াল দল পাঠাচ্ছে, যা দুই দেশের সম্পর্কের গভীরতা এবং চীনের নন-ইন্টারফারেন্স (অ-হস্তক্ষেপ) নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও কিছুটা সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

চীনের পররাষ্ট্র নীতির মূল ভিত্তি হলো অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা। নির্বাচনকে তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে দেখে এবং সরাসরি সমালোচনা বা চাপ না দিয়ে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সুষ্ঠু প্রক্রিয়া প্রত্যাশা করে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান সম্প্রতি বলেছেন, ‘বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। চীন অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে না। আমরা আশা করি, অন্তর্বর্তী সরকার ও বাংলাদেশের জনগণ নিজেদের বিষয় ভালোভাবে সামলাতে পারবে এবং সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।’

নির্ভযোগ্য সূত্র কালবেলাকে জানায়, ২০২৪-এর নির্বাচনে চীনা পর্যবেক্ষকরা নির্বাচনকে ‘সুষ্ঠু, অবাধ ও স্বচ্ছ’ বলে মন্তব্য করেছিলেন, যা চীনের অ-হস্তক্ষেপ নীতির প্রতিফলন। তবে চীনে দীর্ঘদিন ধরে কমিউনিস্ট পার্টি দেশ পরিচালনা করছে। ফলে দেশটিতে গণতন্ত্র না থাকায় তাদের গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে আসাটা কূটনৈতিক গুরুত্বের ওপরই নির্ভরশীল। বাংলাদেশকে চীন তাদের ভূ-রাজনীতিতে গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে এ নির্বাচনে অন্যান্য দেশের মতো তারাও নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে চাইছেন।

নির্বাচন কমিশনের গাইডলাইন অনুসারে বিদেশি পর্যবেক্ষকরা নির্বাচনের সব পর্যায়—প্রাক-নির্বাচনী প্রস্তুতি, প্রচার, ভোটগ্রহণ, গণনা ও ফল ঘোষণা পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। নির্বাচন কমিশন (ইসি) এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বিদেশি পর্যবেক্ষকদের অ্যাক্রেডিটেশন প্রক্রিয়া চলমান।

চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে এ সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই), অবকাঠামো প্রকল্প, ঋণ, বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় চীন বাংলাদেশের অন্যতম বড় অংশীদার। ২০২৪-এর পর থেকে চীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিভিন্ন দলের সঙ্গে বৈঠক করে দেশটির রাষ্ট্রদূতসহ প্রতিনিধিরা। সর্বশেষ বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গেও বৈঠক করেন ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত। মূলত এ পর্যবেক্ষক পাঠানো চীনের কৌশলগত আগ্রহের অংশ, যাতে নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক আরও মজবুত হয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে এ নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ। ২০২৪-এর অভ্যুত্থানের পর থেকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও আন্তর্জাতিক সমর্থনের প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে। চীনের মতো দেশের পর্যবেক্ষক পাঠানো নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে সাহায্য করবে, বিশেষ করে যখন পশ্চিমা দেশগুলোর পাশাপাশি এশিয়ান শক্তিগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, নির্বাচন পর্যবেক্ষণে চীন নিয়ে বাংলাদেশ তেমন আগ্রহ না দেখালেও চীনই এ ক্ষেত্রে আগ্রহ বেশি দেখিয়েছে। গত দুই বছরে চীনের হঠাৎ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ নিয়ে এত আগ্রহ কেন—এ নিয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ওবায়দুল হক কালবেলাকে বলেন, ‘চীনের বর্তমান কৌশল বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, তারা নিজেদের নিয়মনীতি ও কূটনৈতিক আচরণে কিছু পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছে, যাতে বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তিত গতিপথের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এগিয়ে যেতে পারে। তারা অন্যান্য দেশের মতো আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ বাড়াতে আগ্রহী, যদিও চীনে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা না থাকায় এ বিষয়ে সমালোচনার অবকাশ রয়েছে। তবুও বাংলাদেশের নির্বাচনে পর্যবেক্ষক হিসেবে অংশগ্রহণের মাধ্যমে চীন নিজেদের উপস্থিতি জোরদার করতে এবং নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক সুদৃঢ় করতে চাইছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্পে চীনের বিপুল বিনিয়োগ থাকায় তারা এ নির্বাচনকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, যাতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। এটি পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতিও একটি কৌশলগত বার্তা হতে পারে; কারণ ঐতিহ্যগতভাবে নির্বাচন পর্যবেক্ষণে পশ্চিমাদের প্রাধান্য থাকলেও চীন এখন সেখানে নিজেদের উপস্থিতি দৃশ্যমান করে যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে চাইছে। চব্বিশের বিপ্লবের পর চীনের আগ্রহ আরও বেড়েছে, কারণ এ পরিবর্তন দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের প্রভাব বিস্তারের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে, বিশেষত শেখ হাসিনার পতনের প্রেক্ষাপটে। চীন সতর্কতার সঙ্গে এসব পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করছে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমর্থন অব্যাহত রাখছে, যাতে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়।’

কালবেলা/নূর/এমএইচ
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

পড়ে ছিল বিচ্ছিন্ন মাথা, মাটি খুঁড়ে মিলল মরদেহ

জন্তর মন্তরে বিক্ষোভ: শিক্ষার্থীদের যে বার্তা দিলেন মোদি

পুকুরের উপচেপড়া পানিতে তলিয়ে গেছে স্কুলপথ, দুর্ভোগে শিক্ষার্থীরা

ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছে জিয়া হত্যার আসামি মোজাফফরকে

দেশ আর গণতান্ত্রিকভাবে চলছে না, দাবি আখতারের

১১ জুনের পর সর্বোচ্চ তেলের দাম

মুগ্ধসহ ১১ হত্যা: ডিসচার্জ চেয়ে আসামিপক্ষের শুনানি আজ

জামালপুরে যাচ্ছেন এনসিপির শীর্ষ ৫ নেতা

নবনিযুক্ত নৌপ্রধানকে ভাইস অ্যাডমিরাল র‍্যাংক ব্যাজ পরিয়ে দিলেন প্রধানমন্ত্রী

বন্ধ করা হলো কাপ্তাই বাঁধের ১৬ জলকপাট

১০

চট্টগ্রামের বন্যাদুর্গতদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ জেলা পরিষদের

১১

রাজা তৃতীয় চার্লস ও রানি ক্যামিলার উদ্বোধনে পর্দা উঠছে ২৩তম কমনওয়েলথ গেমস

১২

৩৭ ক্যাটাগরিতে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষে নিয়োগ, পদ ২৪৩

১৩

কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাইফুল মালিক মারা গেছেন

১৪

ঢাকাসহ ১০ অঞ্চলে বজ্রবৃষ্টির পূর্বাভাস, নদীবন্দরে সতর্কতা

১৫

ট্রাম্পকে সংকট থেকে বের হতে ‘আরও ভালো পথ’ খুঁজতে বলল ইরান

১৬

কেমন থাকবে আজকের ঢাকার আবহাওয়া

১৭

ঝুঁকি নিয়ে ভাসমান সেতু পারাপার, ভোগান্তিতে ৭ গ্রামের মানুষ

১৮

নয়টি বাণিজ্যিক জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করল যুক্তরাষ্ট্র

১৯

হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার কোনো আগ্রহ যুক্তরাষ্ট্রের নেই: ট্রাম্প

২০
X