

কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সহসভাপতি ও কুমিল্লা-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সেলিমা আহমাদ মেরী (৬৬) মারা গেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। রোববার (২১ জুন) সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে থাইল্যান্ডের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
বাংলাদেশের ব্যবসায় ও শিল্প খাতে নারীর নেতৃত্বের কথা উঠলে যে কয়েকটি নাম সবার আগে আসে, তাদের মধ্যে অন্যতম সেলিমা আহমাদ। তার জন্ম ১৯৬০ সালের ৭ জুলাই। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় ব্যবস্থাপনায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
পরে জাপান, ডেনমার্ক ও কানাডায় বিভিন্ন পেশাগত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলোশিপ লাভ করেন। ব্যবসায় ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে তার এই একাডেমিক প্রস্তুতি পরবর্তী কর্মজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তিনি দেশের অন্যতম শিল্পগোষ্ঠী নিটল-নিলয় গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
একইসঙ্গে তিনি নারী উদ্যোক্তা উন্নয়নের পথিকৃৎ, ব্যবসায়ী সংগঠক এবং সাবেক সংসদ সদস্য হিসেবেও সুপরিচিত।এছাড়া তিনি বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিডব্লিউসিসিআই) সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন। সংসদ সদস্যও ছিলেন তিনি।
দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি ও নিটল-নিলয় গ্রুপের চেয়ারম্যান মাতলুব আহমাদের সহধর্মিণী সেলিমা আহমাদ।
নিটল-নিলয় গ্রুপে নেতৃত্ব
সেলিমা আহমাদ দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিটল-নিলয় গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। গ্রুপটির ব্যবসা অটোমোবাইল, সিমেন্ট, কাগজ, রিয়েল এস্টেট, ইলেকট্রনিক্স, আর্থিক সেবা ও অন্যান্য খাতে বিস্তৃত। তিনি বিশেষভাবে মানবসম্পদ উন্নয়ন (এইচআরডি), করপোরেট ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা কার্যক্রমে নেতৃত্ব দিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে ভূমিকা রেখেছেন।
তার নেতৃত্বে নিটল-নিলয় গ্রুপ শুধু ব্যবসায়িক সাফল্য অর্জন করেনি, বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষ মানবসম্পদ গঠন এবং করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে।
নারী উদ্যোক্তা উন্নয়নে অনন্য ভূমিকা
সেলিমা আহমাদের কর্মজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিডব্লিউসিসিআই) প্রতিষ্ঠা। ২০০১ সালে তিনি এ সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন, যা দেশের নারী উদ্যোক্তাদের জন্য প্রথম জাতীয় পর্যায়ের বাণিজ্য সংগঠন। তার উদ্যোগে হাজার হাজার নারী উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ, ঋণ সুবিধা, বাজারসংযোগ ও ব্যবসায়িক পরামর্শ পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করেন।
তিনি বিশ্বাস করেন, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। এই দর্শন থেকেই তিনি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছেন।
ব্যাংকিং ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সম্পৃক্ততা
ব্যবসায়িক নেতৃত্বের পাশাপাশি সেলিমা আহমাদ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ছিলেন এবং সোনালী ব্যাংক লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হিসেবেও কাজ করেছেন।
রাজনীতিতে অংশগ্রহণ
ব্যবসা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি জাতীয় রাজনীতিতেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সংসদে তিনি নারী উন্নয়ন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি বিষয়ক নানা উদ্যোগে অংশগ্রহণ করেন।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও পুরস্কার
সেলিমা আহমাদের কর্মজীবনের অন্যতম বড় অর্জন হলো ২০১৪ সালে প্রাপ্ত অসলো বিজনেস ফর পিস অ্যাওয়ার্ড। ব্যবসার মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে এই আন্তর্জাতিক সম্মাননা দেওয়া হয়। তিনি এই পুরস্কারপ্রাপ্ত বাংলাদেশের অন্যতম ব্যবসায়ী নেতা। তিনি ২০১২ সালে প্রিয়দর্শিনী এবং ২০০৯ সালে বিজনেস এক্সপ্রেস পুরস্কার অর্জন করেন।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নারী অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে অবদানের জন্য পুরস্কার অর্জন ছাড়াও তিনি ২০০০, ২০০২ ও ২০০৩ সালে বেস্ট বিজনেস উইমেন উপাধি লাভ করেন।
সেলিমা আহমাদের কর্মজীবন বাংলাদেশের শিল্পায়ন, নারী উদ্যোক্তা বিকাশ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়নের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। নিটল-নিলয় গ্রুপের সফল করপোরেট নেতৃত্ব, নারী উদ্যোক্তাদের সংগঠিত করার উদ্যোগ এবং সামাজিক উন্নয়নে তার অবদান তাকে দেশের অন্যতম প্রভাবশালী নারী ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তার কর্মযাত্রা নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।