

স্থায়ীভাবে হরমুজ প্রণালি খোলা রাখা এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেলের প্রবাহ আবার স্বাভাবিক করার বিষয়ে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে; তখন বাজারের পরবর্তী গতিপথ এমন একটি দেশের ওপর নির্ভর করতে পারে, যে দেশটি এই আলোচনায় সরাসরি উপস্থিত নেই। আর সেটি হলো চীন।
ইরানে চলমান যুদ্ধের কারণে প্রতিদিন ১ কোটি ১০ লাখ ব্যারেলেরও বেশি তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল ভোক্তা চীন নিজেদের জ্বালানি সরবরাহ বজায় রাখতে সম্ভাব্য সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আমদানি কমিয়ে, বিশাল তেল মজুতের ওপর নির্ভর করে এবং আরও বেশি পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবহার করে চীন দেশে উচ্চ তেলের দামের প্রভাবকে কিছুটা হলেও সামাল দিতে সক্ষম হয়েছে, যদিও পুরোপুরি তা দূর করতে পারেনি। চীনের এই পদক্ষেপগুলোর প্রভাব বৈশ্বিক বাজারেও অনুভূত হয়েছে।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তিন মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। এ সময় কিছু বিশ্লেষক পূর্বাভাস দিয়েছিলেন যে চলতি বছরে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে। কিন্তু মোট সরবরাহ ঘাটতি প্রায় ১ বিলিয়ন ব্যারেলের বেশি হওয়া সত্ত্বেও অপরিশোধিত তেলের দাম তুলনামূলকভাবে সীমিত পর্যায়েই রয়েছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এর প্রধান কারণ চীন।
জ্বালানি-বিষয়ক থিঙ্ক ট্যাংক এম্বারের প্রধান কর্মকর্তা ড্যান ওয়াল্টার বলেন, এশিয়ার বাকি অংশের জন্য এই পরিস্থিতিকে সামাল দিতে চীন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, আর এর মাধ্যমে বৈশ্বিক অর্থনীতিকেও সুরক্ষা দিয়েছে।
সোমবার বৈশ্বিক মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭৮ ডলারের নিচে নেমে আসে। কারণ বাজারে আশা তৈরি হয়েছে যে, বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়, সেখানে খুব শিগগিরই স্বাভাবিক বাণিজ্য আবার শুরু হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর হামলা চালানোর আগের সপ্তাহগুলোতে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৭০ ডলারের নিচে ছিল। পরে মে মাসের শুরুতে তা চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠে ব্যারেলপ্রতি ১১৪ ডলারে স্থিত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চীনের প্রভাব ক্রমশ বাড়ছে। তাই হরমুজ প্রণালি কত দ্রুত পুনরায় পুরোপুরি চালু হয়, তা নির্বিশেষে ভবিষ্যতে তেলের বাজারের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে চীনের নীতি, জ্বালানি ব্যবহার এবং ভোগের ধরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
চীনের ‘অদৃশ্য হাত’
এই মাসের শুরুর দিকে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে সোসিয়েট জেনারেলের বিশ্লেষকেরা লিখেছেন, ১৯৭৩ সালের ১৯৭৩ আরব অয়েল এম্বারগোর সময় বৈশ্বিক অপরিশোধিত তেল সরবরাহে ৭ শতাংশ ঘাটতি দেখা দিয়েছিল, যার ফলে তেলের দাম ১৩৪ শতাংশ বেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু ইরানে চলমান যুদ্ধের সময় দাম সেই তুলনায় প্রায় বাড়েনি, যদিও এই সংঘাত বৈশ্বিক তেল সরবরাহের ১৪ শতাংশকে প্রভাবিত করেছে।
তাদের মতে, এই আপাতবিরোধী পরিস্থিতির প্রধান কারণ চীন, যা বাজারকে পুনরায় ভারসাম্যে ফিরিয়ে আনতে একটি ‘অদৃশ্য হাত’ হিসেবে কাজ করছে। কারণ চীন প্রতিদিন প্রায় ৩০ লাখ ব্যারেল তেল আমদানি কমাতে সক্ষম হয়েছে, যা প্রায় জাপানের মোট অপরিশোধিত তেল চাহিদার সমান।
চীন কয়েকটি কারণে তেলের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পেরেছে। রিস্তাদ এনার্জির তেলবাজার বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট জনিভ শাহ বলেন, যুদ্ধ শুরুর আগে চীন ব্যাকআপ হিসেবে অপরিশোধিত তেলের মজুত গড়ে তুলছিল। এতে সহায়তা করেছে রাশিয়া ও ইরান থেকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা সস্তা তেলের সরবরাহ।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে চীনের বাণিজ্যিক ও কৌশলগত মজুতে ১০০ কোটিরও বেশি ব্যারেল তেল রয়েছে, এবং দেশটি মে মাস থেকে সেই মজুত ব্যবহার শুরু করেছে।
শাহ বলেন, ‘চীন এতদিন তেলের দামের জন্য একটি ন্যূনতম ভিত্তি তৈরি করে রেখেছিল। কিন্তু এ বছর সেই ধারা উল্টে গেছে।’
দেশটির সরকার অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে ডিজেল ও পেট্রলের মতো পরিশোধিত তেলজাত পণ্যের রপ্তানিও সীমিত করেছে। এর ফলে চীনের তেল শোধনাগারগুলো, যারা একদিকে কম মুনাফার মুখোমুখি এবং অন্যদিকে বিদেশি বাজারে প্রবেশাধিকার হারিয়েছে, তারা বৈশ্বিক বাজার থেকে অপরিশোধিত তেল কেনার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত হয়েছে।
এদিকে চীনে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাপক প্রসার দেশটির জীবাশ্ম জ্বালানির চাহিদা কমিয়ে দিয়েছে। বর্তমানে চীনে বিক্রি হওয়া প্রতি দুইটি নতুন যাত্রীবাহী গাড়ির মধ্যে প্রায় একটি হলো নতুন জ্বালানি প্রযুক্তিনির্ভর যানবাহন (নিউ এনার্জি ভেহিকল)।
আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, গত বছর চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ির বহর প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল তেল ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দিয়েছে।
চীনের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত বিশেষজ্ঞ ডেভিড ফিশম্যান বলেন, এটি বৈশ্বিক অপরিশোধিত তেলের বাজারের জন্য এক অসাধারণ চাপমুক্তির ভালভ হিসেবে কাজ করেছে।
তবে তিনি বলেন, উচ্চ তেলের দাম ভোক্তা ও শোধনাগারগুলোর চাহিদা কমিয়ে রাখতে পারে বটে, কিন্তু বৈশ্বিক সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় চীনের সক্ষমতা নির্ভর করবে তারা কতদিন জ্বালানি মজুত ধরে রাখতে পারে তার ওপর।
ফিশম্যানের ভাষায়, ‘যে বিষয়টি অনির্দিষ্টকাল ধরে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়, তা হলো অপরিশোধিত তেলের মজুত। যদি তেলের দাম কমতে শুরু করে, তাহলে আপনি আশা করতে পারেন যে তারা প্রথমেই আবার নতুন করে তেল মজুত করা শুরু করবে।’
ঘাটতি থেকে কি এবার অতিরিক্ত সরবরাহের যুগে?
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তেল সংকটের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে মাসের পর মাস উদ্বেগের পর আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা এখন সতর্ক করছে যে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে যাওয়ায় আগামী বছর বৈশ্বিক বাজারে তেলের অতিরিক্ত সরবরাহ সৃষ্টি হতে পারে।
বুধবার প্রকাশিত সংস্থাটির মাসিক তেলবাজার প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে অপরিশোধিত তেলের উৎপাদন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলে আগামী বছর সরবরাহ বৃদ্ধির হার চাহিদা বৃদ্ধির হারকে প্রতিদিন ৪৭ লাখ ব্যারেল দ্বারা ছাড়িয়ে যাবে।
প্রতিবেদনে সংস্থাটি লিখেছে, এটি বাজারের জন্য একটি স্বস্তিদায়ক সুযোগ এনে দিতে পারে এবং ক্ষয়প্রাপ্ত মজুত পুনরায় পূরণ করার কিংবা নতুন কৌশলগত মজুত গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। কারণ সংকটের প্রতিক্রিয়ায় বিভিন্ন দেশ তাদের জ্বালানি কৌশল ও নীতিমালা পুনর্মূল্যায়ন করছে।
যদিও আগামী বছর বৈশ্বিক তেলের চাহিদা বৃদ্ধির পূর্বাভাস রয়েছে, সাম্প্রতিক অস্থিতিশীলতা নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রতি আগ্রহও বাড়িয়ে দিয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে অপরিশোধিত তেলের ব্যবহার আরও কমিয়ে দিতে পারে। বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি ও সৌরশক্তি প্রযুক্তিতে বিশ্বের শীর্ষ দেশ চীন ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মার্চ মাসে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তি পণ্যের রপ্তানিতে রেকর্ড গড়ে।
চীনের জ্বালানি ও অটোমোবাইল খাত নিয়ে কাজ করা ট্রিভিয়াম চীনের বিশ্লেষক কসিমো রাইস বলেন, বিদ্যুতায়নের এই গতি ক্রমেই বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার অগ্রগতি কীভাবে হয়, তা আমাদের দেখতে হবে। তবে সামগ্রিকভাবে এটি বৈশ্বিক কার্বন নির্গমন হ্রাসের জন্য একটি অসাধারণ সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।
পণ্যবাজারভিত্তিক তথ্য ও বিশ্লেষণ প্ল্যাটফর্ম কেপলারের জ্যেষ্ঠ তেল গবেষণা বিশ্লেষক মুয়ু জু বলেন, অতিরিক্ত সরবরাহের পরিস্থিতি আগামী মাসেই শুরু হতে পারে। তার মতে, হরমুজ প্রণালি দ্রুত খুলে যাওয়ার পর বর্তমানে আটকে থাকা ১০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল আবার বাজারে প্রবেশ করবে।
একই সময়ে ইরানও সম্ভবত দ্রুতগতিতে নিজেদের তেল উৎপাদন বাড়াবে। তবে এর ফলে ইরানি তেল চীনের কাছে তুলনামূলকভাবে কম আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। কারণ, এতদিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের বিক্রির সুযোগ সীমিত ছিল এবং সে কারণে চীন ছাড়মূল্যে ইরানি তেল কিনতে পেরেছে।
তবে শু আরও বলেন, অনেক দেশ ইতোমধ্যে গ্রীষ্মকালীন সময়ের জন্য তাদের তেলের চাহিদা পূরণ করে ফেলেছে। ফলে বাজারে পুনরায় ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে চীন আবারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
শুর ভাষায়, ‘মাত্র দুই মাস আগের তুলনায় এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্তমানে অতিরিক্ত সরবরাহ শোষণ করার সক্ষমতা যে দেশের আছে, সেটি হলো চীন। কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো—চীন কি আর তেল কিনতে চায়?’