

সৌর প্যানেল ও বৈদ্যুতিক গাড়ি খাতে চীনের আধিপত্য সুপরিচিত। পারমাণবিক শক্তির ক্ষেত্রেও দেশটি এখন অভাবনীয় অগ্রগতিতে এগিয়ে চলছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যেই চীনের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে শীর্ষ স্থানে চলে যাবে। বর্তমানে দেশটিতে নির্মাণাধীন পারমাণবিক চুল্লির সংখ্যা বিশ্বের বাকি সব দেশের সংখ্যার প্রায় সমান।
চীনের বেশিরভাগ পারমাণবিক চুল্লি মার্কিন ও ফরাসি নকশার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। কিন্তু পশ্চিমা দেশগুলোর মতো নির্মাণ বিলম্ব ও ব্যয়বৃদ্ধির সমস্যায় তারা ভোগেনি। বেইজিংয়ের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো, বিশ্বের শীর্ষ পারমাণবিক বিদ্যুৎ সরবরাহকারী রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া।
চীনের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর একটি বই লিখেছেন মার্কিন থিংক ট্যাংক কার্নেগি এন্ডোমেন্ট ফর পিসের সিনিয়র ফেলো মার্ক হিবস। তিনি বলেন, পারমাণবিক শক্তিতে চীনারা খুব দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। চীন বিশ্বকে দেখাতে চায়, তাদের কর্মসূচি অপ্রতিরোধ্য।
পারমাণবিক শক্তিতে যেভাবে দক্ষ হয়ে উঠল চীন: আধুনিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল নির্মাণ প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম। তবে চীনের পারমাণবিক কোম্পানিগুলো সীমিতসংখ্যক নকশা ব্যবহার করে। সব সময় সেই মডেলগুলোই নির্মাণ করে। এতে নির্মাণ প্রক্রিয়ায় অভিজ্ঞতা বাড়ে, সরবরাহ শৃঙ্খলা সহজ হয় এবং প্রকল্প দ্রুত এগোয়। সাংহাইয়ের কাছে বিশাল কারখানায় নিয়মিতভাবে রিঅ্যাক্টর প্রেসার ভেসেল তৈরি হচ্ছে, যা দেশজুড়ে নতুন প্রকল্পে পাঠানো হয়। দক্ষ ওয়েল্ডার দল এক প্রকল্প শেষ করেই পরবর্তী প্রকল্পের সাইটে গিয়ে কাজ করে।
এ ছাড়া পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণে চীনের সাফল্যের পেছনে অন্যতম কারণ হলো, সরকার নিয়ন্ত্রিত একীভূত কৌশল। তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত পারমাণবিক সংস্থা সরকার সমর্থিত কম সুদে ঋণ পায়, যা প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। একই সঙ্গে সরকার বিদ্যুৎ গ্রিড কোম্পানিগুলোকে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কিনতে বাধ্য করে, যা বিনিয়োগকে সুরক্ষা দেয়।
চীনের নিরাপত্তা মান পশ্চিমা বিশ্বের সমতুল্য, তবে অনুমোদন প্রক্রিয়া অনেক দ্রুত। যুক্তরাষ্ট্রে কোনো প্রকল্পে রাজ্য সরকারের একাধিক অনুমতি লাগতে পারে, যা বছরজুড়ে বিলম্বের কারণ হতে পারে। কিন্তু চীনে সাধারণত অনুমোদনের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই নির্মাণকাজ শুরু হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা বনাম চীনের অগ্রগতি: যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২০৫০ সালের মধ্যে চার গুণ বাড়াতে চায় ট্রাম্প প্রশাসন। দেশটি নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তি বিকাশের মাধ্যমে পারমাণবিক চুল্লি বিদেশে রপ্তানি করতে চায়। তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, যদি চীন পারমাণবিক রপ্তানি বাজারে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে, তাহলে এর বৈশ্বিক প্রভাবও ব্যাপকভাবে বাড়বে। কারণ, একটি রিঅ্যাক্টর নির্মাণ প্রকল্প দুটি দেশের মধ্যে বহু দশকব্যাপী অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরি করে।
তবে রিঅ্যাক্টর নির্মাণে চীনের একটি সুস্পষ্ট সুবিধা রয়েছে। দেশটি তুলনামূলক কম খরচে এবং দ্রুত রিঅ্যাক্টর নির্মাণ করতে শিখেছে। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে একটি রিঅ্যাক্টর নির্মাণে গড়ে ১১ বছর সময় লাগে, সেখানে চীন মাত্র ৫-৬ বছরেই কাজ শেষ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ার ভোগটল পারমাণবিক কেন্দ্রের দুটি নতুন রিঅ্যাক্টর তৈরি করতে ১১ বছর লেগেছে। এতে ব্যয় হয়েছে ৩৫ বিলিয়ন ডলার।
বৈজ্ঞানিক জার্নাল নেচারে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে চীনে পারমাণবিক চুল্লির নির্মাণ ব্যয় অর্ধেকে নেমে আসে। এরপর থেকে স্থিতিশীল রয়েছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৭০-৮০-এর দশকে সুদের হার বৃদ্ধি, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কঠোর নিরাপত্তার বিধিবিধান এবং থ্রি মাইল আইল্যান্ড দুর্ঘটনার মতো ঘটনাগুলো পারমাণবিক খাতকে প্রায় বন্ধ করে দেয়। বেসরকারি খাত নতুন নকশায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে নির্মাণ ব্যয় ও জটিলতা বাড়ায়। এর ফলে অসংগতি ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা: যুক্তরাষ্ট্রে এখন রিপাবলিক ও ডেমোক্রেটিক উভয় দলের মধ্যেই পারমাণবিক শক্তির পক্ষে মতবিরোধ কমেছে। তবে দেশটি সরকারি নয়, বরং বেসরকারি উদ্ভাবননির্ভর পথ বেছে নিয়েছে। ডজনখানেক স্টার্টআপ ছোট আকারের চুল্লি নিয়ে কাজ করছে, যা প্রযুক্তি কোম্পানি যেমন—গুগল, অ্যামাজন ও ওপেনএআইয়ের ডাটা সেন্টারে বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে।
যদিও এসব প্রকল্প অগ্রসর হচ্ছে, তবে বড় আকারের রিঅ্যাক্টর নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও ভারী যন্ত্রপাতি তৈরির সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্র অনেকাংশে হারিয়ে ফেলেছে।
বৈশ্বিক রপ্তানি প্রতিযোগিতা: চীনের পারমাণবিক শক্তি কর্মসূচির লক্ষ্য শুধু অভ্যন্তরীণ নয়, বিশ্ববাজারও। পাকিস্তানে ছয়টি রিঅ্যাক্টর নির্মাণের পর দেশটি আরও অনেক দেশে রপ্তানির পরিকল্পনা করছে। একই সঙ্গে চীন ‘চতুর্থ প্রজন্মের’ গ্যাস কুলড রিঅ্যাক্টর তৈরি করেছে, যা বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি ভারী শিল্পে তাপ সরবরাহ করতে পারে। তারা থোরিয়াম চুল্লি ও ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি পুনর্ব্যবহারের প্রযুক্তিতেও কাজ করছে। কারণ, দেশটিতে পর্যাপ্ত ইউরেনিয়াম মজুত নেই। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরবর্তী প্রজন্মের রিঅ্যাক্টর স্থাপনে চীন যুক্তরাষ্ট্রের থেকে অন্তত ১০-১৫ বছর এগিয়ে।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বিশ্বে আধিপত্য বিস্তারের জন্য প্রতিযোগিতা করছে। এজন্য পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন এখন ভূ-রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন তেল, গ্যাস ও কয়লার মতো জীবাশ্ম জ্বালানির শীর্ষ সরবরাহকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অন্যদিকে চীন সৌর প্যানেল, বায়ু টারবাইন ও ব্যাটারি উৎপাদনে আধিপত্য বিস্তার করেছে। চীন নবায়নযোগ্য শক্তিকে সামনে ট্রিলিয়ন ডলারের বাজার হিসেবে দেখছে।