

গাজায় যুদ্ধবিরতি এক মাস পার করলেও এখনো হামলা থামেনি। শর্ত অনুযায়ী অবাধ ত্রাণ প্রবাহ নিশ্চিতের কথা থাকলেও অবরোধ তোলেনি ইসরায়েল। কিছু অঞ্চলে ব্যাংক খুললেও তাতে নেই নগদ অর্থ। ত্রাণ, তাঁবু ও অর্থ কোনো কিছুই ঠিকঠাক প্রবেশ করতে দিচ্ছে না দখলদার বাহিনী। এরই মধ্যে জেঁকে বসা শীতের মধ্যে হানা দিয়েছে মৌসুমি বায়ু ও বৃষ্টি। আর এতেই গাজাজুড়ে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের দুর্দশা বেড়েছে বহুগুণে। দুর্দশা এতটাই চরমে পৌঁছেছে যে, যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা যেন ‘নরকে’ পরিণত হয়েছে।
শনিবার শীতকালীন ভারী বৃষ্টিতে ভেসে গেছে অনেক অস্থায়ী তাঁবু। এসব তাঁবুতে আশ্রয় নিয়েছিলেন বাস্তুহারা গাজাবাসী। সেখানে ইসরায়েল এখনো তাঁবু ও জরুরি আশ্রয় সামগ্রী প্রবেশে বাধা দেওয়ায় হাজার হাজার মানুষ ঠান্ডা, কাদা আর মৌসুমি বাতাসের ভেতর জীবন বাঁচাতে হিমশিম খাচ্ছে।
মানবিক সংস্থাগুলো বহুদিন ধরে সতর্ক করে আসছে, উপকূলের এই উপত্যকায় তাঁবুতে থাকা মানুষের শীত সামলানোর মতো কিছুই হাতে নেই। এর ওপর গত দুই বছরের ইসরায়েলি হামলায় গাজায় অন্তত ১ লাখ ৯৮ হাজার স্থাপনা ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জাতিসংঘ বলছে, বারবার স্থানচ্যুত হওয়া পরিবারগুলোর অবস্থাই এখন সবচেয়ে নাজুক।
গাজা সিটি থেকে আলজাজিরাকে এক হতাশ মা জানিয়েছেন, ‘সকাল থেকে কাঁদছি।’ ভারী বৃষ্টিতে রাতে তার তাঁবু ডুবে গেছে। দুই সন্তান নিয়ে তিনি এখন সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ। তার স্বামীসহ পরিবারের কয়েকজন ইসরায়েলের ‘গণহত্যামূলক যুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘একটা ভালো তাঁবু চাই। একটা ম্যাট্রেস আর একটা কম্বল। আমার শিশুর জন্য পোশাক দরকার। কাউকে ডাকতে পারি না… কেউ নেই সাহায্য করার।’
জাতিসংঘ ও মানবিক সংস্থাগুলোর অনুরোধ সত্ত্বেও ইসরায়েল এখনো সহায়তা প্রবেশে কঠোর নিষেধাজ্ঞা বজায় রেখেছে। দুই বছরের যুদ্ধে ৬৯ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। যদিও ১০ অক্টোবর হামাসের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে, তবুও সীমান্তে কড়াকড়ি কমেনি।
সহায়তা সংস্থাগুলোর হিসাবে শীতের শুরুতে প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার পরিবার এবং প্রায় ১৫ লাখ মানুষ এখন সবচেয়ে ঝুঁকিতে আছে। ইউএনআরডব্লিউএ বলছে, তাদের কাছে ১৩ লাখ মানুষের জন্য পর্যাপ্ত আশ্রয় সামগ্রী মজুত আছে, কিন্তু ইসরায়েলের অনুমতি না থাকায় সেগুলো গাজায় ঢোকানো যাচ্ছে না। শনিবার ইউএনআরডব্লিউএ প্রধান ফিলিপ লাজারিনি সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ‘গাজায় এখন ঠান্ডা আর স্যাঁতসেতে অবস্থা। বাস্তুচ্যুত মানুষ বৃষ্টির আর শীতের সামনে সম্পূর্ণ অসহায়।’ তার ভাষায়, নড়বড়ে তাঁবুগুলো ‘পানি ঢুকলেই ভেঙে পড়ে’, আর মানুষের অল্প কিছু জিনিসও ভিজে নষ্ট হয়ে যায়। তিনি সতর্ক করেন, ‘আরও আশ্রয় সামগ্রী জরুরি ভিত্তিতে দরকার।’
গাজার মধ্যাঞ্চলের আয-জুয়াইদা এলাকা থেকে আলজাজিরার সাংবাদিক হিন্দ খাদরি জানিয়েছেন, বহু মানুষ জানেনই না কোথায় যাবেন। তাদের বাড়িঘর ধ্বংস, আশ্রয়কেন্দ্রগুলো ভর্তি; তাই কাঁদা-পানিতে ভিজে থাকা তাঁবু ছাড়া আর কোনো পথ নেই। তিনি বলেন, ‘অনেক বাবা-মা তাদের সন্তানদের শীতের পোশাক, জুতা এমনকি স্যান্ডেলও কিনতে পারছেন না। পরিবারগুলো সম্পূর্ণ অসহায়।’
শনিবার রাতেই দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের দক্ষিণ-পূর্ব আকাশে ইসরায়েলি বাহিনী ফ্লেয়ার ছোড়ে। সাধারণত শত্রুর অবস্থান চিহ্নিত করা বা হামলার আগাম সংকেত দিতেই এ ধরনের আলো ফেলা হয়। এর আগে যুদ্ধবিরতির ‘হলুদ রেখা’র ভেতরে এবং গাজা সিটিতেও ইসরায়েল বিমান হামলা চালায়।
গতকালও দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে ইসরায়েলের হামলায় তিন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। বোমা ফেলা হয়েছে রাফাহর উত্তরাঞ্চলেও।
এর মধ্যে গাজা থেকে বন্দি হয়ে ইসরায়েলে মারা যাওয়া আরও ১৫ জনের মরদেহ গতকাল হস্তান্তর করেছে ইসরায়েল। এদিন অধিকৃত পশ্চিম তীরেও গুলি করে এক ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে তেলআবিবের সেনারা।
ট্রাম্পের প্রস্তাবে জাতিসংঘে আজ ভোট: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত গাজা শান্তি পরিকল্পনাকে সমর্থন করার খসড়া প্রস্তাবের ওপর আজ সোমবার ভোট দেবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ।
এএফপি জানিয়েছে, খসড়া প্রস্তাবে গাজায় ‘বোর্ড অব পিস’ নামে একটি অন্তর্বর্তী শাসন কাঠামো গঠনের কথা বলা হয়েছে, যার তত্ত্বাবধায়ক থাকবেন ট্রাম্প। এ কাঠামোর মেয়াদ থাকবে ২০২৭ সালের শেষ পর্যন্ত। প্রস্তাবে ভবিষ্যতে একটি সম্ভাব্য ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের বিষয়টিও উল্লেখ রয়েছে।
এদিকে, রাশিয়া নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের কাছে একটি পাল্টা খসড়া প্রস্তাব পাঠিয়েছে। রাশিয়ার প্রস্তাবে ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন ‘বোর্ড অব পিস’ গঠন বা আন্তর্জাতিক বাহিনী তাৎক্ষণিক মোতায়েনের অনুমোদন নেই। তবে যুদ্ধবিরতি সমর্থনের পাশাপাশি সেখানে দ্বিরাষ্ট্র ভিত্তিক সমাধানকে স্পষ্টভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।