কালবেলা ডেস্ক
প্রকাশ : ২২ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ২২ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৭:৩৫ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
মিডল ইস্ট আইর নিবন্ধ

সিরিয়ায় অতি আগ্রাসনে যেভাবে ইসরায়েলের পতন হতে পারে

ছবি : সংগৃহীত
ছবি : সংগৃহীত

সিরিয়ার দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসক বাশার আল-আসাদের পতনের এক বছর পার হয়েছে। গত বছর যখন আলেপ্পো, হোমস, হামা এবং দামেস্কে তার কর্তৃত্ব তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছিল, তখন দোহা ফোরামে অংশ নেওয়া বিশ্বনেতারা অবাক হয়ে তা দেখছিলেন। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভের মতো প্রভাবশালী নেতার চেহারায়ও সেদিন পরাজয়ের ছাপ স্পষ্ট ছিল।

বাশারের পতনের পর বিদ্রোহী নেতা আবু মোহাম্মদ আল-জোলানি তার সামরিক পোশাক ছেড়ে ‘আহমেদ আল-শারা’ নামে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হন। শুরুতে তিনি ইসরায়েলের প্রতি কোনো হুমকি না হওয়ার সংকেত দিয়েছিলেন। এমনকি দামেস্কের নতুন গভর্নর মাহের মারওয়ানও বলেছিলেন, ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের কোনো শত্রুতা নেই এবং তারা শান্তি চান। অথচ সেই সময় গাজায় ইসরায়েলি হামলা চরম পর্যায়ে ছিল, যা ফিলিস্তিনিদের হতাশ করেছিল।

বদলে যাওয়া পরিস্থিতি: এক বছর পর সিরিয়ার মানুষের মেজাজ নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। সম্প্রতি এক সামরিক কুচকাওয়াজে শারার উপস্থিতিতে সেনারা স্লোগান দিচ্ছিলেন—‘গাজা, গাজা, গাজা। হে শত্রু, আমরা আসছি তোমার জন্য—এমনকি তুমি আগুনের পাহাড় হলেও আমি আমার রক্ত দিয়ে গোলাবারুদ বানাব এবং তোমার রক্ত দিয়ে নদী বইয়ে দেব।’

এর পরপরই একজন ইসরায়েলি সরকারি মন্ত্রী সিরিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধের ইঙ্গিত দেন। কয়েক দিন আগে দামেস্কের দক্ষিণে একটি গ্রামে ভোরের অভিযান প্রায় সামরিক বিপর্যয়ে রূপ নিচ্ছিল। নভেম্বরের শেষে ইসরায়েলি হেলিকপ্টার ও কামান দক্ষিণ-পশ্চিম দামেস্কের বেত জিন্ন গ্রামে আঘাত হানে এবং স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্যমতে, সেনারা ঘরে ঢুকে তিন গ্রামবাসীকে ধরে নিয়ে যায়।

এরপর বন্দুকযুদ্ধ শুরু হয় এবং পুরো গ্রাম ইসরায়েলি আক্রমণকারীদের প্রতিহত করতে যোগ দেয়। ইসরায়েলিরা যখন অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন যুদ্ধবিমান মোতায়েন করতে হয়।

সুযোগ ছিল বন্ধুত্বের, বেছে নিল যুদ্ধ: এক বছরে সিরিয়ার মেজাজ বদলে যাওয়ার পেছনে কী ঘটেছিল? শারা যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন ইসরায়েলের সামনে দুটি পথ ছিল— তারা হয় এ শাসন পরিবর্তনকে গ্রহণ করতে পারত এবং সিরিয়াকে নতুন মিত্র বানাতে পারত।

এর পরিবর্তে ইসরায়েল বিশাল এলাকাজুড়ে বোমাবর্ষণ শুরু করে, যা মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে সিরিয়ার বিমানবাহিনীকে ধ্বংস করে, তাদের নৌবহর ডুবিয়ে দেয় এবং আকাশ প্রতিরক্ষা রাডারগুলো গুঁড়িয়ে দেয়। এর পরপরই ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ সিরিয়ায় স্থল অভিযান শুরু করে।

আসল লক্ষ্য সিরিয়াকে টুকরো করা: ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ দাবি করেছেন, গালিলি অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য এ দখলদারিত্ব প্রয়োজন। কিন্তু প্রকৃত উদ্দেশ্য ভিন্ন। ইসরায়েল চায় সিরিয়াকে লিবিয়ার মতো ছোট ছোট গোষ্ঠীতে বিভক্ত করে স্থায়ীভাবে দুর্বল করে দিতে। তাদের পরিকল্পনা ছিল—হিজবুল্লাহর কাছে ইরানি অস্ত্র যাওয়ার পথ বন্ধ করা, সিরিয়াকে স্থায়ীভাবে পঙ্গু করা, তুরস্ককে উত্তর সিরিয়া থেকে দূরে রাখা এবং ইরানে হামলা চালানোর জন্য সিরিয়ার আকাশসীমা ব্যবহার করা।

ইসরায়েল মূলত সিরিয়ার দ্রুজ এবং কুর্দি সংখ্যালঘুদের ব্যবহার করে এ বিভাজন করতে চেয়েছিল। তবে শুরুতে দ্রুজ নেতারা এর বিরোধিতা করলেও পরবর্তীতে অভ্যন্তরীণ সংঘাতের মুখে তারা কিছুটা নতি স্বীকার করেছেন।

দেয়ালে আঘাত: শারা ক্ষমতায় আসার পর ইসরায়েল সিরিয়ায় ৬০০ বারের বেশি বোমা হামলা চালিয়েছে। তবে দামেস্ক এবং আঙ্কারা উভয় পক্ষ থেকেই কোনো কার্যকর প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়নি। সিরিয়ার আকাশসীমায় কে আধিপত্য করবে তা নিয়ে তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যে প্রতিযোগিতার মূল কেন্দ্র ছিল টি-৪ বিমান ঘাঁটি এবং পালমিরা সামরিক বিমানবন্দর। ইসরায়েল বারবার সেখানে বোমা হামলা চালিয়েছে যাতে আঙ্কারা সেখানে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা স্থাপন করতে না পারে।

এপ্রিলে তুরস্ক টি-৪ ঘাঁটি দখলের পদক্ষেপ নিলেও শেষ পর্যন্ত কিছুই হয়নি এবং তারা তেল আবিবের সঙ্গে আলোচনার সিদ্ধান্ত নেয় যা ব্যর্থ হয়। আঙ্কারার সামরিক অবস্থান ছিল অত্যন্ত সতর্ক, যা ইসরায়েলকে একটি শূন্যস্থান পূরণের সুযোগ করে দিয়েছে।

শারা ইসরায়েলি হুমকির জবাবে শুরুতে সৌদি আরবের দিকে হাত বাড়ান। মোহাম্মদ বিন সালমান তাকে আশ্বস্ত করেন যে, সৌদি একবার সিরিয়াকে হারিয়েছে, আর হারাবে না। তিনি শারাকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন, যা তার হোয়াইট হাউস সফর এবং নিষেধাজ্ঞা তোলার পথ প্রশস্ত করে; যার ফলে সিরিয়ায় আবার বিদেশি বিনিয়োগ শুরু হয়।

সম্পর্কের পরীক্ষা: সিরিয়ার বিষয়ে ট্রাম্প এবং তার দূত টম ব্যারাকের ধারণাগুলো শারার পক্ষে ছিল। ট্রাম্প নিষেধাজ্ঞা তোলার জন্য চাপ দেন এবং বলেন যে, সিরীয় সরকার একটি ‘প্রকৃত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র’ গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। গত সপ্তাহে এ সমর্থন পরীক্ষার মুখে পড়ে যখন সিরিয়ায় আইএএস হামলায় দুই মার্কিন সেনা নিহত হন। কিন্তু ট্রাম্প শারার ওপর চটে যাননি। ট্রাম্প কঠোর জবাবের শপথ নিলেও তা ছিল আইএস-এর বিরুদ্ধে, দামেস্কের বিরুদ্ধে নয়। সামরিক ফ্রন্টে কোনো বাধা না পেয়ে ইসরায়েল এখন কূটনৈতিক ফ্রন্টে ট্রাম্পের ওপর বিরক্ত।

ইসরায়েলি সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, সিরিয়া কোনো ‘ঐতিহাসিক রাষ্ট্র’ নয় বরং বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মিলনস্থল মাত্র এবং তারা শারাকে কেবল ‘দামেস্কের মেয়র’ হিসেবে দেখতে চায়।

অন্তহীন যুদ্ধ: শারা এখন তার বক্তব্যের ধার বাড়িয়েছেন। দোহা ফোরামে তিনি বলেন, যে ইসরায়েল গাজায় তাদের নৃশংস গণহত্যা থেকে নজর সরাতে আঞ্চলিক সংকট রপ্তানি করছে। তবে তিনি এখনো ইসরায়েলি প্রত্যাহারের জন্য ট্রাম্পের ওপর নির্ভর করছেন। অন্যদিকে নেতানিয়াহু শপথ করেছেন তিনি দক্ষিণ সিরিয়া ছাড়বেন না। তিনি তার যুদ্ধগুলোকে ‘ক্যান্সার’ অপারেশনের সঙ্গে তুলনা করেছেন এবং বলেছেন এ যুদ্ধ ‘অন্তহীন’।

এ রূপকের মাধ্যমে নেতানিয়াহু স্বীকার করে নিচ্ছেন, যে ইসরায়েল কখনোই এ দ্বন্দ্বে জিতবে না; বরং শেষ পর্যন্ত তারা এর কাছে নতি স্বীকার করবে। হিজবুল্লাহ, ইরান এবং হামাসকে পরাজিত করার ভাবনায় এবং বারবার যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে দক্ষিণ লেবানন ও দক্ষিণ সিরিয়া দখল করে ইসরায়েলি বাহিনী এখন তাদের ক্ষমতার সর্বোচ্চ সীমার বাইরে চলে যাচ্ছে— বিশেষ করে যদি এ সবকটি ফ্রন্ট স্থায়ীভাবে সক্রিয় থাকে।

সিরিয়া শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার পতনের সন্ধিক্ষণ হতে পারে। নেতানিয়াহুর ভবিষ্যদ্বাণী শেষ পর্যন্ত সত্যি হতে পারে এবং যখন তা ঘটবে, পরিস্থিতি আর তার নিয়ন্ত্রণে থাকবে না।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে আবারও যাত্রীবাহী বাস পড়ল পদ্মা নদীতে

আগামী সপ্তাহে উত্তর কোরিয়া যাচ্ছেন শি জিনপিং

আশুলিয়ায় মাদকের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান, ছাত্রদল নেতাসহ গ্রেপ্তার ৪

দিল্লির হোটেলে আগুন দেখে পালান মালিক, গ্রেপ্তারের পর দিলেন স্বীকারোক্তি

ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুমড়েমুচড়ে গেল ইসরায়েলি ট্যাংক

বজ্রপাতে কিশোর ছেলের মৃত্যু, আহত মা

প্রস্তুতি ম্যাচে ফ্রান্সকে হারিয়ে আইভরি কোস্টের চমক

সিরাজগঞ্জে বাসচাপায় দম্পতিসহ নিহত ৩

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার টার্গেট কিউবার প্রেসিডেন্ট

বিশ্ব পরিবেশ দিবস আজ

১০

পুকুরে ডুবে দুই ভাইয়ের মৃত্যু

১১

দুপুরের মধ্যে দেশের ৮ জেলায় ঝড়সহ বজ্রবৃষ্টির শঙ্কা

১২

আজকের নামাজের সময়সূচি

১৩

৬ ঘণ্টা পর ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রাম-সিলেটের ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক

১৪

বিদ্যুৎস্পর্শে প্রাণ গেল স্বামী-স্ত্রীর

১৫

জার্মানিতে ভেঙে পড়লো উড়োজাহাজের ল্যান্ডিং গিয়ার

১৬

আদ্-দ্বীন হাসপাতালকে শোকজ, জবাব না দিলে লাইসেন্স বাতিল

১৭

ভৈরবে রেলপথ অবরোধ, ৫ ট্রেন আটকা

১৮

৬ দফা দাবিতে চমেক ইন্টার্ন চিকিৎসকদের মানববন্ধন, শনিবার থেকে কর্মবিরতির হুঁশিয়ারি

১৯

সিএন্ডএফ ভবনেই মিলবে চসিকের ট্রেড লাইসেন্স, বুথ স্থাপনের নির্দেশ মেয়রের

২০
X