

সামরিক অভ্যুত্থানের পর জান্তা সরকারের অধীনে মিয়ানমারে প্রথম ধাপের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তীব্র সমালোচনা, বিরোধী দলগুলোর বর্জন এবং দেশজুড়ে চলা গৃহযুদ্ধের মধ্যেই জান্তা সরকারের অধীনে এই বহুল আলোচিত ‘প্রহসনের’ ভোট গ্রহণ শুরু হলো। সামরিক জান্তা এই নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের ক্ষমতার বৈধতা অর্জনের চেষ্টা করছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা।
এক প্রতিবেদনে বিবিসি জানিয়েছে, মিয়ানমারের জান্তা সরকার এই নির্বাচনকে মোট তিন ধাপে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা করেছে। গত রোববারের ভোটগ্রহণ ছিল এর প্রথম পর্যায়। দেশটির ৩৩০টি টাউনশিপের মধ্যে ২৬৫টিতে ভোটগ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও গৃহযুদ্ধ এবং অস্থিতিশীলতার কারণে অর্ধেকেরও বেশি এলাকায় ভোট হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। পরবর্তী দুই ধাপের ভোট আগামী ১১ এবং ২৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে এবং জানুয়ারি মাসের শেষ নাগাদ ফল ঘোষণার কথা রয়েছে।
ভোটের দিনটি ছিল সহিংসতা ও আতঙ্কে ঘেরা। মান্দালয় অঞ্চলে একটি রকেট হামলায় অন্তত তিনজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, থাইল্যান্ড সীমান্তের নিকটবর্তী মিয়াওয়াদ্দি টাউনশিপে ধারাবাহিক বিস্ফোরণে ১০টিরও বেশি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং একজন শিশু নিহত হয়েছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া জান্তা সরকার ভোটবিরোধী তৎপরতা দমনে কঠোর আইন প্রণয়ন করেছে, যার অধীনে ইতোমধ্যে ২০০ জনেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন বিশিষ্ট চলচ্চিত্র নির্মাতা ও কৌতুক অভিনেতাও রয়েছেন, যাদের ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক শূন্যতা ও বিরোধী দলহীন নির্বাচন: এই নির্বাচনে অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসিসহ (এনএলডি) অন্তত ৪০টি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সু চি এবং তার দলের শীর্ষ নেতারা বর্তমানে বিভিন্ন সাজায় কারাগারে বন্দি রয়েছেন। এই শূন্যতায় সামরিক বাহিনী সমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টিসহ (ইউএসডিপি) মাত্র ছয়টি দল দেশজুড়ে প্রার্থী দিয়েছে।
জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং রাজধানী নেপিদোতে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে ভোট দেওয়ার পর নির্বাচনকে ‘মুক্ত ও নিরপেক্ষ’ বলে দাবি করেন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো একে ‘বন্দুকের মুখে করা অভিনয়’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
জনমত ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া: ভোট দিতে আসা সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ একে নাগরিক দায়িত্ব মনে করে ভোট দিলেও, বড় একটি অংশ ভয়ে কিংবা অনাগ্রহে ভোটদান থেকে বিরত ছিলেন। ৮০ বছর বয়সী বৃদ্ধ রাল উক থাং বিবিসিকে বলেন, ‘সামরিক জান্তা দেশ চালাতে জানে না, তারা কেবল নিজেদের স্বার্থ বোঝে। অং সান সু চির সময় আমরা গণতন্ত্রের স্বাদ পেয়েছিলাম, এখন আমরা শুধু চোখের জল ফেলছি।’
আন্তর্জাতিক মহল এই নির্বাচনকে কঠোর ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছে। জাতিসংঘ ও পশ্চিমা দেশগুলো একে একটি ‘প্রহসন’ বলে আখ্যা দিয়েছে। জাতিসংঘের বিশেষ দূত টম অ্যান্ড্রুজ বলেন, ‘যে জান্তা বেসামরিক মানুষের ওপর বোমা হামলা করে এবং রাজনৈতিক নেতাদের বন্দি রাখে, তাদের আয়োজিত নির্বাচন থেকে বৈধ কিছু বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়।’
রাশিয়া ও চীনের প্রচ্ছন্ন সমর্থনে জান্তা সরকার এই নির্বাচনের আয়োজন করলেও, গৃহযুদ্ধকবলিত মিয়ানমারে এই ভোট কতটা শান্তি ফিরিয়ে আনবে—তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় রয়েই গেছে।