বিশ্ববেলা ডেস্ক
প্রকাশ : ০৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:৪২ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্প-ইইউ মুখোমুখি

বিরোধ তুঙ্গে
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্প-ইইউ মুখোমুখি

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি বরাবরই অপ্রচলিত ও আক্রমণাত্মক হিসেবে পরিচিত। সম্প্রতি সামারিক পন্থায় ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নেওয়ার ঘটনার পর মার্কিন প্রেসিডেন্টের হুমকিগুলো আর শুধু কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যার ফলে গ্রিনল্যান্ড তার প্রকাশ্য আগ্রহ, হুমকি ও সামরিক কায়দায় দখলের আস্ফালন বিশ্ব রাজনীতিকে এক নতুন অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ডেনমার্কের এই স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল নিয়ে ইউরোপ, ন্যাটো এবং আন্তর্জাতিক আইনের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিষয়টি নিয়ে একেবারে মুখোমুখি অবস্থানে চলে গেছেন ট্রাম্প ও ইউরোপীয় নেতারা।

গ্রিনল্যান্ড: বরফে ঢাকা এক কৌশলগত ভূখণ্ড

বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড আয়তনে প্রায় ২১ লাখ ৬০ হাজার বর্গকিলোমিটার, যার ৮০ শতাংশের বেশি বরফে আচ্ছাদিত। জনসংখ্যা মাত্র ৫৬ হাজারের মতো, যাদের বেশিরভাগই ইনুইট জনগোষ্ঠীর। এক সময় ডেনমার্কের উপনিবেশ হলেও ১৯৭৯ সালে স্বশাসন এবং ২০০৯ সালে আত্মশাসনের অধিকার পায় গ্রিনল্যান্ড। তবে প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্রনীতি ও মুদ্রানীতি এখনো ডেনমার্কের নিয়ন্ত্রণে।

ভৌগোলিকভাবে গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মাঝামাঝি অবস্থিত এবং জিআইইউকে গ্যাপের ওপর অবস্থানের কারণে এটি সামরিক ও নৌ-নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সামুদ্রিক করিডোর দিয়েই রাশিয়ার সাবমেরিন ও নৌযান আটলান্টিকে প্রবেশ করতে পারে, যা দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কৌশলের অংশ।

ট্রাম্পের আগ্রহের মূল কারণ কী

ট্রাম্প প্রকাশ্যে দাবি করেছেন, গ্রিনল্যান্ড প্রয়োজন ‘জাতীয় নিরাপত্তার জন্য, খনিজের জন্য নয়’। কিন্তু তার প্রশাসনের ভেতরের বক্তব্য ভিন্ন ইঙ্গিত দেয়। সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইক ওয়াল্টজ স্পষ্টভাবে বলেছেন, গ্রিনল্যান্ডের বিরল খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদই যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের মূল কেন্দ্রবিন্দু।

গ্রিনল্যান্ডে রয়েছে বিপুল পরিমাণ বিরল খনিজ, তেল ও গ্যাস—যেগুলো আধুনিক প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক গাড়ি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সামরিক সরঞ্জাম তৈরিতে অপরিহার্য। বর্তমানে এসব খনিজের বাজারে চীনের আধিপত্য যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ। জলবায়ু সংকটে বরফ গলতে থাকায় এসব সম্পদ ভবিষ্যতে আরও সহজে উত্তোলনযোগ্য হয়ে উঠতে পারে, পাশাপাশি উত্তর মেরু অঞ্চলের নতুন নৌপথ বিশ্ব বাণিজ্যের চেহারা বদলে দিতে পারে।

ভেনেজুয়েলা ও গ্রিনল্যান্ড: হুমকির বাস্তব রূপ

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযানের পর ট্রাম্প যখন বলেন ‘আমাদের গ্রিনল্যান্ড দরকার’, তখন ইউরোপ বিষয়টিকে আর কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে দেখছে না। হোয়াইট হাউস প্রকাশ্যে জানিয়ে দিয়েছে, গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণে সামরিক পদক্ষেপসহ ‘সব বিকল্প’ বিবেচনায় রয়েছে তাদের। ট্রাম্প নিজেই দাবি করেছেন, ডেনমার্ক গ্রিনল্যান্ড রক্ষা করতে পারবে না এবং সেখানে রাশিয়া ও চীনের উপস্থিতি বাড়ছে।

এই বক্তব্য সরাসরি ন্যাটোর ভেতরে ফাটল ধরানোর আশঙ্কা তৈরি করেছে। কারণ ডেনমার্ক ন্যাটোর সদস্য রাষ্ট্র, আর ন্যাটোর একটি মূল নীতি হলো— এক সদস্যের ওপর হামলা মানে সবার ওপর হামলা।

ইউরোপের প্রতিক্রিয়া: একজোট হওয়ার চেষ্টা

ট্রাম্পের হুমকির জবাবে ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, পোল্যান্ড, স্পেন ও যুক্তরাজ্য যৌথ বিবৃতিতে গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্বের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। তারা স্পষ্ট করেছে, গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার শুধু ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের জনগণের।

ইউরোপীয় নেতারা সতর্ক করে দিয়েছেন, সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডের অখণ্ডতা জাতিসংঘ সনদের মৌলিক নীতি, যা লঙ্ঘন করা হলে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। একই সঙ্গে নর্ডিক দেশগুলোও আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা যৌথভাবে রক্ষার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।

ন্যাটো ও ইইউ কি ট্রাম্পকে থামাতে পারবে

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। ন্যাটোতে যুক্তরাষ্ট্রই সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তি। ইউরোপীয় দেশগুলো সরাসরি ওয়াশিংটনের মুখোমুখি হতে দ্বিধাগ্রস্ত। কারণ এতে ইউক্রেন যুদ্ধ, ন্যাটোর ভবিষ্যৎ ও ইউরোপের সামগ্রিক নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

ন্যাটোতে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত জুলিয়ান স্মিথ মনে করেন, শুধু কূটনৈতিক সংযম যথেষ্ট নয়; ইউরোপকে বিকল্প প্রতিরক্ষা কাঠামো নিয়েও ভাবতে হবে। অন্যদিকে ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স বলছে, ইইউ ও যুক্তরাজ্য একসঙ্গে শক্ত অবস্থান নিলে তা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

গ্রিনল্যান্ডবাসীর অবস্থান

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গ্রিনল্যান্ডের জনগণ কী চায়। জরিপে দেখা গেছে, ৮৫ শতাংশ গ্রিনল্যান্ডবাসী যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হতে চায় না। স্বাধীনতার প্রশ্নে মতভেদ থাকলেও ডেনমার্কের বদলে যুক্তরাষ্ট্রের শাসন চাওয়ার প্রবণতা খুবই সীমিত।

গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স ফ্রেডেরিক নিলসেন ট্রাম্পের বক্তব্যকে ‘অসম্মানজনক ও অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেছেন। তার ভাষায়, ‘গ্রিনল্যান্ড আমাদের ঘর। আর কোনো সংযুক্তিকরণের কল্পনা নয়।’

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের আগ্রহ শুধু একটি দ্বীপ দখলের প্রশ্ন নয়, এটি আন্তর্জাতিক আইন, ন্যাটোর ভবিষ্যৎ, ইউরোপের নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। ভেনেজুয়েলায় সামরিক হস্তক্ষেপ দেখিয়েছে—এই হুমকি বাস্তব হতে পারে। এখন প্রশ্ন হলো, ইউরোপ ও ন্যাটো কি কেবল বিবৃতি দিয়ে থেমে থাকবে, নাকি ট্রাম্পের আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে সত্যিকারের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে? গ্রিনল্যান্ডের বরফের নিচে লুকিয়ে থাকা সম্পদের চেয়েও হয়তো এই প্রশ্নের উত্তর বিশ্ব রাজনীতির জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তথ্যসূত্র: বিবিসি ও সিএনএন

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ভেনেজুয়েলার মতো কৌশল কি ইরানের ক্ষেত্রেও খাটাবে যুক্তরাষ্ট্র?

আমি নেতা হতে চাই না, আপনাদের সেবক হতে চাই : সেলিমুজ্জামান

১১ জানুয়ারি : ইতিহাসের এই দিনে যা ঘটেছিল

জনগণকে সরকারের পক্ষে নামার আহ্বান ইরানি কর্তৃপক্ষের

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ছাত্রদলে যোগ দিলেন গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া শতাধিক শিক্ষার্থী

জনগণের সঙ্গে ‘গভীর বিশ্বাসঘাতকতা’ করছে ইরান : ওয়াশিংটন

সাংবাদিকের বাড়িতে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ 

রোববার রাজধানীর যেসব এলাকার মার্কেট বন্ধ

২০৩৯ সালে বিরল যে ঘটনার সাক্ষী হতে পারে মুসলিম বিশ্ব

সিরিয়ায় আইএসের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বড় হামলা

১০

ইরানে বিক্ষোভ দমনে ছোড়া হচ্ছে তাজা গুলি, হাজারেরও বেশি নিহতের শঙ্কা

১১

প্রতিপক্ষকে ১০ গোল দেওয়ার ম্যাচে যে রেকর্ড গড়লেন পেপ গার্দিওলা

১২

স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন / সম্ভাব্য ইরান হামলা নিয়ে ‘প্রাথমিক’ আলোচনা করেছে ওয়াশিংটন

১৩

তামিম বিতর্কে অবস্থান পরিষ্কার করল কোয়াব

১৪

কিউই সিরিজের আগে ভারতীয় শিবিরে দুঃসংবাদ

১৫

আরেকবার চেষ্টা করে দেখি : মাহফুজ আলম

১৬

১১ জানুয়ারি : আজকের নামাজের সময়সূচি

১৭

বরিশালে ভ্যানচালককে কুপিয়ে হত্যা

১৮

৯ ঘণ্টা পর আইন বিভাগের সেই শিক্ষককে ছাড়ল চবি প্রশাসন

১৯

জমি নিয়ে বিরোধে ধস্তাধস্তি, একজনের মৃত্যু

২০
X