

কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো বলেছেন, তিনি বিশ্বাস করেন, এখন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের একটি ‘বাস্তব হুমকি’ রয়েছে। পেত্রো বলেন, যুক্তরাষ্ট্র অন্যান্য দেশকে তাদের ‘সাম্রাজ্যের’ অংশ হিসেবে দেখছে। স্থানীয় সময় গত বৃহস্পতিবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন গুস্তাভো পেত্রো। এর আগে কলম্বিয়াকে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প।
কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘বিশ্বকে শাসন’ করা থেকে ‘বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন’ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) এজেন্টরা ‘নাৎসি ব্রিগেডের’ মতো আচরণ করছে। অপরাধ ও অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করা অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার অংশ হিসেবে ট্রাম্প আইসিইর কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছেন। বিবিসি এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, কলম্বিয়াকে লক্ষ্য করে একটি সামরিক অভিযানের বিষয়টি ‘ভালো শোনাচ্ছে’। ট্রাম্প একাধিকবার পেত্রোকে ‘সাবধান থাকতে’ বলেছেন, যা পেত্রো কঠোরভাবে নিন্দা করেছেন।
গত বুধবার সন্ধ্যায় ট্রাম্প ও পেত্রোর মধ্যে ফোনালাপ হয়, এরপর ট্রাম্প বলেন, তিনি শিগগির হোয়াইট হাউসে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। বুধবার রাতে ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, পেত্রোর সঙ্গে তার কথোপকথন ছিল ‘বিরাট সম্মান’। কলম্বিয়ার এক কর্মকর্তা তখন বলেন, আলোচনায় ‘উভয় পক্ষের বক্তব্যে’ ১৮০ ডিগ্রি পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে।
তবে বৃহস্পতিবার পেত্রোর বক্তব্যে বোঝা যায় সম্পর্কের উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। তিনি বিবিসিকে বলেন, ফোনালাপটি প্রায় এক ঘণ্টার মতো স্থায়ী হয়েছিল, ‘যার বেশিরভাগ সময় আমি কথা বলেছি’ এবং আলোচনার বিষয়ের মধ্যে ছিল ‘কলম্বিয়ায় মাদক পাচার’, ভেনেজুয়েলা নিয়ে কলম্বিয়ার দৃষ্টিভঙ্গি এবং ‘লাতিন আমেরিকাজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে যা ঘটছে’।
পেত্রো যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক অভিবাসন দমন কার্যক্রমের তীব্র সমালোচনা করেন, আইসিই এজেন্টদের বিরুদ্ধে ‘নাৎসি ব্রিগেডের’ মতো আচরণের অভিযোগ তোলেন তিনি।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রায়ই যুক্তরাষ্ট্রে অপরাধ ও পাচারের জন্য অভিবাসনকে দায়ী করছেন এবং ব্যাপক অভিযানকে ন্যায্যতা দিতে এটি ব্যবহার করেছেন। তিনি কলম্বিয়া ও ভেনেজুয়েলার মতো দেশগুলোর বিরুদ্ধে মাদক পাচার রোধে যথেষ্ট পদক্ষেপ না নেওয়ার অভিযোগও করেছেন।
এই সপ্তাহে মিনিয়াপোলিস শহরে এক মার্কিন অভিবাসন এজেন্ট ৩৭ বছর বয়সী এক মার্কিন নাগরিককে গুলি করে হত্যা করেছে, যা রাতারাতি বিক্ষোভের জন্ম দেয়। ফেডারেল কর্মকর্তারা বলেন, রেনে নিকোল গুড নামের ওই নারী তার গাড়ি দিয়ে অভিবাসন এজেন্টদের চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তবে শহরের ডেমোক্র্যাট মেয়র জ্যাকব ফ্রে বলেন, যে এজেন্ট তাকে গুলি করেছেন, সে বেপরোয়া আচরণ করেছেন এবং তিনি এজেন্টদের শহর ছাড়ার দাবি জানান।
পেত্রো বলেন, আইসিই এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে তারা শুধু রাস্তায় লাতিন আমেরিকানদের তাড়া করে না, বরং তারা মার্কিন নাগরিকদেরও হত্যা করছে, যা আমাদের জন্য অপমানজনক।
তিনি আরও বলেন, যদি এটি চলতে থাকে, তাহলে বিশ্বকে শাসন করার একটি সাম্রাজ্যবাদী স্বপ্ন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। বিচ্ছিন্ন হয়ে কোনো সাম্রাজ্য গড়ে ওঠেনি।
পেত্রো বলেন, যুক্তরাষ্ট্র দশকের পর দশক ধরে অন্যান্য সরকারকে, বিশেষ করে লাতিন আমেরিকায়, আইন উপেক্ষা করে ‘সাম্রাজ্যের’ অংশ হিসেবে দেখেছে।
ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের পর পেত্রো অভিযোগ করেন, ওয়াশিংটন ‘তেল ও কয়লা’ নিয়ে যুদ্ধ চাচ্ছে। তিনি বলেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র প্যারিস চুক্তি থেকে বেরিয়ে না যেত—যেখানে দেশগুলো জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার কমিয়ে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির সীমা নির্ধারণে সম্মত হয়েছিল—তাহলে কোনো যুদ্ধ হতো না, বিশ্ব ও দক্ষিণ আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক হতো অনেক বেশি গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ। ভেনেজুয়েলা ইস্যুটি এ নিয়েই।
ট্রাম্পের সামরিক পদক্ষেপের হুমকির মন্তব্যের পর কলম্বিয়াজুড়ে সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রের নামে বিক্ষোভ হয়েছে। পেত্রো বিবিসিকে বলেন, ট্রাম্পের মন্তব্য ছিল ‘বাস্তব হুমকি’। এ সময় তিনি উল্লেখ করেন যে কলম্বিয়া বিংশ শতকে পানামার মতো ভূখণ্ড হারিয়েছে। তিনি বলেন, ‘এই হুমকি দূর করার সম্ভাবনা নির্ভর করছে চলমান আলোচনার ওপর।’
যুক্তরাষ্ট্রের হামলার ক্ষেত্রে কলম্বিয়া কীভাবে আত্মরক্ষা করবে—এমন প্রশ্নে পেত্রো বলেন, তিনি চান এটি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হোক এবং তিনি জানান, এ নিয়ে কাজ চলছে। তবে তিনি যোগ করেন, কলম্বিয়ার ইতিহাস দেখায়, বড় সেনাবাহিনীর মোকাবিলায় আমরা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছি। আমাদের হাতে বড় সেনাবাহিনীর মোকাবিলার অস্ত্র নেই। আমাদের কাছে এমনকি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও নেই। বরং আমরা নির্ভর করি জনগণ, আমাদের পাহাড় ও জঙ্গলের ওপর—যেমন সব সময় করেছি।
পেত্রো বলেন, ভেনেজুয়েলা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার হস্তক্ষেপের শিকার। এসব সংস্থাকে কলম্বিয়ায় কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে কেবল মাদক পাচার মোকাবিলার জন্য। তিনি অভিযোগ করেন, অন্য গোপন অভিযান চালানোর চেষ্টা হয়েছে কলম্বিয়ায়।
ভেনেজুয়েলায় যা ঘটেছে, তা কলম্বিয়ায় পুনরাবৃত্তি হতে পারে কি না বা তিনি নিজের সরকার বা ঘনিষ্ঠ মহলে গুপ্তচর থাকার আশঙ্কা করেন কি না–এমন প্রশ্নে তিনি সরাসরি মন্তব্য করেননি।
মাদুরোকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর ডেল্টা ফোর্স, যা সামরিক বাহিনীর শীর্ষ সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিট। ভেনেজুয়েলার সরকারের এক সিআইএ সূত্র যুক্তরাষ্ট্রকে তার অবস্থান শনাক্ত করতে সহায়তা করেছিল।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় কোকেন উৎপাদক দেশ কলম্বিয়া বৈশ্বিক মাদক বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র। দেশটিতে উল্লেখযোগ্য তেল মজুদ রয়েছে, পাশাপাশি সোনা, রূপা, পান্না, প্লাটিনাম ও কয়লারও প্রাচুর্য আছে।
মন্তব্য করুন