

২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ভোরে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে গণতন্ত্রের স্বপ্ন চুরমার করে ক্ষমতা দখল করে সামরিক বাহিনী। এতে দেশটির রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ভেঙে পড়ে, অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয় এবং জনগণের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে তলিয়ে যায়। গতকাল রোববার ওই সামরিক অভ্যুত্থানের পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে।
এ অভ্যুত্থান ঘটে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার মাত্র তিন মাসেরও কম সময়ের মধ্যে। ওই নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয় অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি)। এর ফলে গণতন্ত্রপন্থি নেত্রী সু চি আবার সরকার গঠনের স্পষ্ট জনসমর্থন পান। তবে ওই নির্বাচনে ফলাফল জালিয়াতির অভিযোগ তুলে সু চিকে উৎখাত করে অং মিন হ্লাইংয়ের নেতৃত্বাধীন সেনাবাহিনী।
জান্তার শাসনে গত পাঁচ বছর মিয়ানমারের জনগণের জন্য ছিল চরম দুর্ভোগের। সামরিক জান্তার দমন-পীড়ন, মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া, রাজনৈতিক বন্দিত্ব, অর্থনৈতিক ধস, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভাঙন এবং দেশজুড়ে গৃহযুদ্ধ—সব মিলিয়ে দেশের সামাজিক কাঠামো পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। শহর ও গ্রাম পরিণত হয়েছে যুদ্ধক্ষেত্রে। ভয় আর সহিংসতা হয়ে উঠেছে নিত্যদিনের বাস্তবতা।
অভ্যুত্থান শুধু একটি সরকারকে উৎখাত করেনি, এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎও ধ্বংস করেছে। অভ্যুত্থানের আগে মিয়ানমারে একটি কার্যকর নির্বাচনী ব্যবস্থা ছিল, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ছিল, মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে উঠছিল এবং তরুণ প্রজন্ম রাজনীতির মাধ্যমে পরিবর্তনের আশা করছিল। সেই সম্ভাবনাই রাতারাতি ধ্বংস করে দেয় জেনারেলরা।
সাম্প্রতিক সময়ে জান্তা যে তথাকথিত নির্বাচন সম্পন্ন করেছে, তা প্রকৃত অর্থে কোনো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়। এটি ছিল একটি সাজানো রাজনৈতিক নাটক। জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলগুলো নিষিদ্ধ করা হয়, নেতাদের কারাবন্দি করা হয় এবং কোটি মানুষকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। এর ফল গণতন্ত্র নয়, বরং সামরিক শাসনকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা মাত্র।
এই সামরিক নেতারা মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত। বেসামরিক মানুষের ওপর বিমান হামলা, গণহত্যা, নির্যাতন, নির্বিচার গ্রেপ্তার এবং গ্রাম ধ্বংসের জন্য তারা দায়ী। তবুও তাদের বিরুদ্ধে কোনো বিচার বা জবাবদিহি নেই।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বড় একটি অংশ ধীরে ধীরে পরিস্থিতিকে ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে মেনে নিচ্ছে। কূটনৈতিক বিবৃতি আর সতর্ক অবস্থানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে তাদের প্রতিক্রিয়া। সামনের দিনগুলোয় সামরিক নেতারা বেসামরিক পোশাকে ক্ষমতায় থাকার ভান করবেন, কিন্তু প্রকৃত ক্ষমতা থাকবে সেনাবাহিনীর হাতেই।
তবে মিয়ানমারের জনগণ কখনোই নীরব থাকেনি। শান্তিপূর্ণ আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন, গোপন সংগঠন, ছাত্র আন্দোলন ও সশস্ত্র প্রতিরোধ—সব পথেই তারা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
ভয় ও দমন-পীড়নের আড়ালে এখনো জেগে আছে প্রতিরোধের শক্তি। ইতিহাসে মিয়ানমার কখনো সরল পথে এগোয়নি, কিন্তু এক দিকেই এগিয়েছে—স্বৈরশাসন থেকে মুক্তির দিকে।
অভ্যুত্থানের পাঁচ বছর পরও জেনারেলরা ক্ষমতায় আছেন, কিন্তু তারা দেশটির মানুষের মন জয় করতে পারেনি। আর কখনোই পারবে না।