

এটি তাদের যুদ্ধ নয়। এই যুদ্ধে তারা সরাসরি অংশও নেননি। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই সংঘাত এখন মার্কিন মিত্রদের জন্য এক চরম রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার বিরোধিতা করা বিশ্বনেতারা এখন এক কঠিন দ্বিমুখী চাপের মুখে পড়েছেন। একদিকে যুদ্ধে যোগ না দেওয়ার কারণে ডোনাল্ড ট্রাম্পের তীব্র ক্ষোভ, অন্যদিকে নিজ দেশের ভোটারদের যুদ্ধবিরোধী অবস্থান—এই দুইয়ের মাঝে পড়ে মিত্রদেশগুলোর সরকার এখন টালমাটাল।
এই পরিস্থিতি ওয়াশিংটন ও তার দীর্ঘদিনের মিত্রদের মধ্যে সম্পর্কের চিরাচরিত ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে। যেসব নেতা একসময় মার্কিন প্রেসিডেন্টকে সন্তুষ্ট করতে তোষামোদের পথ বেছে নিতেন, তারা এখন প্রকাশ্যে ট্রাম্পের সমালোচনা করছেন এবং তার থেকে দূরত্ব বজায় রাখছেন। এই দূরত্বের কারণ শুধু আদর্শিক বিরাগ নয়, বরং যুদ্ধ-সম্পর্কিত প্রচণ্ড চাপ যা তাদের জনগণের জীবিকা এবং তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। এমনকি যেসব নেতা ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে তার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করেছিলেন, তারাও এখন তার অবজ্ঞার শিকার হয়ে কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি সম্প্রতি পোপকে নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সঙ্গে ট্রাম্পের বন্ধুত্ব এই যুদ্ধের কারণেই ভেঙে পড়েছে। স্টারমার স্পষ্ট জানিয়েছেন, ট্রাম্পের পদক্ষেপের কারণে ব্রিটিশ নাগরিকদের জ্বালানি বিল বৃদ্ধি পাওয়ায় তিনি অত্যন্ত বিরক্ত। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে তিনি দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেছেন, জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থি এই যুদ্ধে ব্রিটেন কোনোভাবেই যোগ দেবে না।
যুদ্ধ যেভাবে ইউরোপের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ককে চাপে ফেলেছে: আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাম্প্রতিক পূর্বাভাস বলছে, ইরান সংঘাত এখন আর কেবল দূরের কোনো পররাষ্ট্রনীতি সংক্রান্ত সংকট নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশগুলোর জন্য অভ্যন্তরীণ ও রাজনৈতিক অস্তিত্বের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। ট্রাম্পের পাশে দাঁড়ানো এখন অনেক নেতার জন্যই রাজনৈতিক ‘দায়’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ, জর্জিয়া মেলোনি ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যে ট্রাম্পের সবচেয়ে কাছের আদর্শিক মিত্র হওয়া সত্ত্বেও বর্তমানে চাপে আছেন। যুদ্ধের ফলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি তার জনপ্রিয়তায় ধস নামিয়েছে। তদুপরি, ক্যাথলিক প্রধান দেশ হিসেবে পোপের ওপর ট্রাম্পের আক্রমণ মেলোনিকে বাধ্য করেছে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে। এর ফলে বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা কূটনৈতিক সম্পর্ক এখন খাদের কিনারায়। ট্রাম্পও মেলোনিকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ আখ্যা দিয়ে তার ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন।
একই অবস্থা হাঙ্গেরিতেও দেখা গেছে। দীর্ঘ ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকা ভিক্টর অরবান, যাকে ট্রাম্পের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মনে করা হতো, তিনি গত সপ্তাহের নির্বাচনে বড় ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। ট্রাম্প ও তার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স অরবানের পক্ষে ব্যাপক প্রচার চালালেও ভোটাররা তাদের প্রত্যাখ্যান করেছেন। এই ফলাফল ইউরোপের অন্যান্য জনতুষ্টিবাদী নেতাদের ট্রাম্পের কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়ার প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।