

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধগুলোর একটি সুনির্দিষ্ট গতিপ্রকৃতি রয়েছে। এটি এখন প্রায় নিয়মে পরিণত হয়েছে: প্রথমে হামলা, তারপর বিজয়ের ঘোষণা, এরপর জমকালো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে যায়, ফ্রান্সের প্রাসাদে বসে সই করা একটি কাগজের টুকরো সংঘাতের মূল কারণগুলোকে দূর করতে পারে না।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র এক বছরের মধ্যে এই চক্রের পুনরাবৃত্তি দুবার করেছে। ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্র নীতি নির্ধারকরা আবারও লড়াইয়ের সাময়িক বিরতিকে স্থায়ী সমাধান বলে ভুল করছেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ঘোষণা যে যুদ্ধবিরতি শেষ, এবং এর ঠিক এক দিন পরেই দীর্ঘমেয়াদি সামরিক পদক্ষেপের কোনো উদ্দেশ্য নেই বলে তার জোর দাবি—আসলে কোনো বৈপরীত্য নয়, বরং একটি গভীর সংকটের লক্ষণ। এটি ইরানের প্রতি এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করে, যা গত দুই দশক ধরে চরমপন্থি বাগাড়ম্বর এবং কৌশলগত সংযমের মধ্যে দুলছে। ওয়াশিংটন আসলে এ সংঘাতের শেষ পরিণতি কী দেখতে চায়, তা কখনোই চূড়ান্ত করতে পারেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য কি শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন? নাকি পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ বা হরমুজ প্রণালিতে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা? যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি হামলা যেন আলাদা আলাদা প্রশ্নের উত্তর দিতে চায়। সহজ কথায়, ওয়াশিংটনের কেউই আসলে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি।
এ বিষয়টি নিয়ে ভাবা দরকার। কারণ গত ফেব্রুয়ারিতে এ যুদ্ধের সূত্রপাত হয়েছিল এমন কিছু হামলার মাধ্যমে, যা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা এবং শাসনব্যবস্থার শীর্ষ স্তরের নেতাদের হত্যা করেছিল। তখন একে একটি নেতৃত্বহীন করার অভিযান হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল, যা ইসলামিক রিপাবলিকের বিশৃঙ্খলা তৈরির ক্ষমতা ভেঙে দেবে। কিন্তু এর পরিবর্তে যা ঘটল, তা হলো দেশটির নিরাপত্তা-রাষ্ট্রের যুক্তি আরও কঠোর হলো। নেতৃত্ব হারানোর অপমানে কাবু না হয়ে ইরানের কট্টরপন্থিরা হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে সুনির্দিষ্টভাবে এক ধরনের হয়রানি শুরু করেছে। আর এটিই এখন আমেরিকার নতুন করে হামলা চালানোর অজুহাত হিসেবে কাজ করছে।
নাইন-ইলেভেন পরবর্তী সময়ে ওয়াশিংটনের যুদ্ধগুলো যারা দেখেছেন, তাদের কাছে এই প্যাটার্নটি বেশ পরিচিত। কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তির প্রয়োগ কাঙ্ক্ষিত আত্মসমর্পণ আনে না। উল্টো সেই হুমকিকে এমনভাবে ছড়িয়ে দেয়, যা প্রতিহত করা কঠিন এবং উত্তেজনা বাড়ানো সহজ। লক্ষ্য করার বিষয় হলো, এ বিপজ্জনক খেলার মাসুল কিন্তু ওয়াশিংটন দিচ্ছে না। মাশুল দিচ্ছে বাহরাইন, যারা মার্কিন পঞ্চম নৌবহরকে আশ্রয় দিয়ে এখন নিয়মিত বিমান হামলার সাইরেনের নিচে বাস করছে। মাশুল দিচ্ছে কুয়েত ও কাতার, যারা নিজেদের শুরু না করা একটি জলপথের লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েছে। মাশুল দিচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতি, যা যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে সংকট কাটার কথা থাকলেও আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তেল বাজারের ধাক্কা সামলাতে এখনো চড়া মূল্য চুকোচ্ছে।
উপসাগরীয় আরব দেশগুলোকে অংশীদার হিসেবে গড়ে তুলতে ওয়াশিংটন কয়েক দশক ব্যয় করেছে। সেই দেশগুলো এখন বুঝতে পারছে যে, এই অঞ্চলে মার্কিন শক্তির কাছাকাছি থাকার অর্থ এই নয় যে, তারা আমেরিকার দ্বারা সুরক্ষিত—এই শিক্ষা ইরাকের প্রতিবেশীরা ২০০৩ সালেই পেতে পারত। ওয়াশিংটনে এ প্রশ্নটি খুব কমই স্পষ্টভাবে করা হয় যে, মার্কিন ইরান নীতির ওপর ইসরায়েলের পরোক্ষ ভেটো ক্ষমতার কারণে আমেরিকার ঠিক কী পরিমাণ মূল্য চোকাতে হচ্ছে।
ইসরায়েলি নেতা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এ সপ্তাহে ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলনের ভেতর থেকেই তুর্কি নেতা রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ানকে উদ্দেশ্য করে প্রকাশ্যে খোঁচা দিয়েছেন, যেখানে সম্মেলনটির উদ্দেশ্য ছিল পশ্চিমা ঐক্য প্রদর্শন করা। এ ছাড়া একটি ন্যাটো মিত্রের কাছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির বিরুদ্ধে তার লবিং মনে করিয়ে দেয় যে, জেরুজালেমের আঞ্চলিক অগ্রাধিকার এবং ওয়াশিংটনের মিত্রদের কাঠামো সবসময় একই দিকে নির্দেশ করে না।
এর কোনোটিই অবশ্য হরমুজ প্রণালিতে ইরানের আচরণের পক্ষে যুক্তি নয়। বাণিজ্যিক ট্যাংকারে হামলা চালানো এবং বিশ্ব বাণিজ্যের ধমনিকে হুমকির মুখে ফেলা স্পষ্টতই সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু তেহরানের আচরণ উসকানিমূলক—এটি মেনে নেওয়ার অর্থ এই নয় যে, ওয়াশিংটনের জবাবটি বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ এটি এমন এক যুদ্ধ যার কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নেই।
আমেরিকান নীতিনির্ধারকদের কৌশলগত প্রশ্নটি কেবল এটি হওয়া উচিত নয় যে, আমরা সর্বশেষ হামলার জবাব কীভাবে দেব। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, আগামী পাঁচ বছর এ পরিস্থিতি কেমন রূপ নেবে এবং আমরা কি সেই খরচ বহন করতে পারব? বর্তমান প্রমাণ বলছে, ওয়াশিংটনে এ উত্তর খোঁজার জন্য কেউ থামেনি।