

চট্টগ্রাম নগরীর বাকলিয়া এক্সেস রোড এলাকার প্রথম কিলিং মিশনে অল্পের জন্য প্রাণে বাঁচেন অন্তত ১৫টি মামলার আসামি সরোয়ার হোসেন বাবলা। অবশ্য প্রাণ হারান তার সঙ্গে একই প্রাইভেটকারে থাকা দুজন। এর ৯ মাস পরের দ্বিতীয় কিলিং মিশনে ভাড়াটে কিলারের ছোড়া গুলি আঘাত হেনেছে নির্ভুল নিশানায়, বাবলার মৃত্যু নিশ্চিত করেছে অস্ত্রধারীরা। দ্বিতীয়বারের এই কিলিং মিশনের সময় নগর বিএনপির আহ্বায়ক ও ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৮ আসনে দলের প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর গণসংযোগে ছিলেন বাবলা। সেখানে তার খুব কাছে থাকা এক ব্যক্তির হাতের ইশারা পাওয়ামাত্র পেছন থেকে টানা কয়েক রাউন্ড গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে অস্ত্রধারীরা। এ সময় গুলিবিদ্ধ হন এরশাদ উল্লাহসহ চারজন। পুলিশ বলছে, এরশাদ উল্লাহর গণসংযোগে বাবলার পাশে থাকা কালো পাঞ্জাবি পরিহিত লোকটির হাতের ইশারা অনেক কিছুর ইঙ্গিত বহন করে। লোকটি ওই এলাকার কারও পরিচিত নয়। অস্ত্রধারীরা বাবলাকেই টার্গেট করেছিল, এরশাদ উল্লাহকে নয়।
বুধবার রাতে আহত এরশাদ উল্লাহকে দেখতে গিয়ে হাসপাতালে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার হাসিব আজিজ বলেন, নির্বাচন বানচাল করা নয়, গহিন দুর্গম পাহাড় থেকে সন্ত্রাসীরা বেরিয়ে এসে গুলি করে মোটরসাইকেলে চড়ে পালিয়ে যায়। এরশাদ উল্লাহ নয়, তাদের টার্গেট ছিল সরোয়ার হোসেন বাবলা। অস্ত্রধারীরা যে স্থানে গুলি করে, সেই দোকানের ওপর বাবলার সঙ্গে আসলাম চৌধুরীর ছবি সংবলিত ব্যানার টানানো থাকায় এ ঘটনায় সীতাকুণ্ডের জঙ্গলসলিমপুর ও আলীনগরের অস্ত্রধারীদের সম্পৃক্ততার দিকে ইঙ্গিত করেছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা।
নিহত বাবলার পরিবারের দাবি, মৃত্যুর তিন দিন আগে মোবাইল ফোনে বাবলাকে হুমকি দিয়েছিল সন্ত্রাসী মো. রায়হান। বলা হয়, তার সময় শেষ, যা খাওয়ার যেন খেয়ে নেয়। বাবলার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, অস্ত্র, হত্যাসহ অন্তত ১৫টি মামলা রয়েছে। তিনি ছিলেন পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী।
এদিকে বিএনপি প্রার্থীর জনসংযোগে হামলার এই ঘটনার পর বায়েজিদ বোস্তামী চালিতাতলী এলাকা গতকাল বৃহস্পতিবারও ছিল থমথমে। সাধারণ লোকজনের মধ্যে কাজ করছে আতঙ্ক। আবার কখন কী হয়ে যায়। বুধবারের হামলার ঘটনার বিষয়ে স্থানীয় লোকজন কেউ ভয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
গণসংযোগে গুলির ঘটনায় মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বিএনপির নেতারা। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান। কালবেলাকে তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছি। মূলত নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য একটি পক্ষ ষড়যন্ত্র করছে। আমরা পুলিশ-প্রশাসনের কাছে অবৈধ এসব অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের আহ্বান জানাই।’
এই হামলার প্রতিবাদে গতকাল বিকেলে নগরীতে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি। চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক (দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত) শওকত আজম খাজা কালবেলাকে বলেন, ‘এরশাদ ভাইয়ের পেটের বাঁ পাশ দিয়ে গুলিটি লেগে বের হয়ে গেছে। এখন তিনি আশঙ্কামুক্ত। এইচডিউতে তিনি অবজারবেশনে আছেন।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, বুধবার সন্ধ্যার পর নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানা এলাকায় চালিতাতলীর খন্দকারপাড়া এলাকায় নির্বাচনী জনসংযোগ করছিলেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ। সে সময় সরোয়ার হোসেন বাবলাকেও এরশাদ উল্লাহর পক্ষে লিফলেট বিতরণ করতে দেখা গেছে। কিছুক্ষণ পর একটি বাড়ির গেটের ভেতর ঢোকার সময় এরশাদ উল্লাহর সঙ্গে থাকা কালো পাঞ্জাবি পরিহিত একজন বাবলার দিকে ডান হাত নেড়ে কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন। তিনবার ইশারা দেওয়ার পরপরই বাবলার পেছন থেকে খুব কাছাকাছি তাকে লক্ষ্য করে গুলি করা হয়। তখন গণসংযোগে অংশ নেওয়া এরশাদ উল্লাহর অনুসারী ও এলাকাবাসী ছোটাছুটি করতে থাকেন। আর চিত হয়ে গেঞ্জি পরিহিত বাবলাকে সড়কে পড়ে থাকতে দেখা যায়।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বড় সাজ্জাদের হাত ধরে সরোয়ারের উত্থান হলেও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে আলাদা পক্ষ গড়ে তোলে সরোয়ার। আলাদা হওয়ার পর নিজস্ব বাহিনী তৈরি করে এলাকায় চাঁদাবাজিসহ আধিপত্য বিস্তার করে। বায়েজিদ এলাকায় নির্মাণাধীন ভবন ও টেম্পো স্ট্যান্ডে চলত এই গ্রুপের চাঁদাবাজি। সাজ্জাদ আলীর প্রতিপক্ষ হিসেবে পরিচিত বায়েজিদ এলাকায় ‘সন্ত্রাসী’ সরোয়ার হোসেন ও আকবর আলী। একসময় তারা সাজ্জাদের হয়ে কাজ করলেও বছর দুয়েক আগে তারা দল থেকে বেরিয়ে যান। শাহ আমানত সেতু সংলগ্ন এলাকায় কর্ণফুলী নদী থেকে বালু উত্তোলনের নিয়ন্ত্রণ নেয় সরোয়ারের অনুসারীরা। সেটি আগে নিয়ন্ত্রণ করতেন ছোট সাজ্জাদ। তাকে গ্রেপ্তারের পর সরোয়ার সেটি দখলে নেওয়ায় বিরোধ আরও চাঙ্গা হয়। জঙ্গল সলিমপুরে আধিপত্য বিস্তারে ভূমিকা ছিল সরোয়ারের।
২০১১ সালে গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে চট্টগ্রাম কারাগারে ছিলেন সরোয়ার। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান। কারামুক্তির পর থেকে সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে চাঁদাবাজি, বালুমহাল ও এলাকা দখল নিয়ে খুনোখুনিতে জড়িয়ে পড়েন সরোয়ার। তার বিরুদ্ধে খুন, অপহরণ, চাঁদাবাজি, অস্ত্রসহ বিভিন্ন অপরাধে নগরীর বায়েজিদ থানা, পাঁচলাইশ থানা, চান্দগাঁও থানা এবং ডবলমুরিং থানায় বিভিন্ন মামলা রয়েছে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজ বলেন, ‘যে এলাকায় সরোয়ারকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে, সেটি সরোয়ারের এলাকা। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ সেখানে গণসংযোগ চালাচ্ছিলেন। অস্ত্রধারীরা সরোয়ারকেই টার্গেট করেছিল, এরশাদ উল্লাহকে নয়। এর আগেও নগরীর বাকলিয়া এক্সেস রোড এলাকায় ব্রাশ ফায়ারের সময় সরোয়ার প্রাইভেটকারেই ছিলেন। ভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে যান। এখনো দেশের বাইরে থেকে অনেক ইন্ধন আসছে; আমরা তথ্য পেয়েছি। তদন্ত করে এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করতে অভিযান পরিচালনা করা হবে। অপরাধীদের শীর্ষ একজন (ছোট সাজ্জাদ) জেলে স্ত্রীসহ আছে। তার সহযোগীরা রিমোট (প্রত্যন্ত) এলাকায় পালিয়ে থাকে। তারা মোটরসাইকেল নিয়ে এসে ঘটনা ঘটিয়ে পালিয়ে যায়। বিদেশে বসে একজন (বড় সাজ্জাদ) কলকাঠি নাড়ছে। তাকে দেশে ফিরিয়ে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা রয়েছে।’
নিহত সরোয়ারের বাবা আবদুল কাদের বলেন, তার ছেলেকে প্রায়ই হুমকি দিত বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী, তার সহযোগী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ ও মো. রায়হান। এজন্য সতর্ক হয়ে চলাফেরা করত সরোয়ার। সঙ্গে লোকজনও থাকত। কিন্তু বুধবার তার বাড়ি থেকে দুই থেকে তিনশ গজ দূরে রাস্তার পাশে দোকানে গণসংযোগ চালান বিএনপি নেতা এরশাদ উল্লাহ। যেহেতু নিজের এলাকা কেউ কিছু করবে না, সেজন্য ছেলের আত্মবিশ্বাস ছিল। সরোয়ার নিজেও এরশাদ উল্লাহর সঙ্গে মসজিদে মাগরিবের নামাজ পড়ে হামলার শিকার হওয়ার আগে। পরে গণসংযোগে বের হয়।
জানা গেছে, কারাগারে থাকাকালে বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীর সঙ্গে সরোয়ারের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মুক্তির পর আসলাম চৌধুরী ছাড়াও চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আবু সুফিয়ানের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। মাত্র এক মাস আগে বাবলা বিয়ে করেন। সেই বিয়েতে এরশাদ উল্লাহ, আবু সুফিয়ানসহ বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এর পর থেকে বাবলাকে এই বিএনপি নেতাদের সঙ্গে বিভিন্ন সভা-সমাবেশেও দেখা গেছে। তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেছেন, এ ঘটনার সঙ্গে বিএনপির কোনো সম্পর্ক নেই। বিএনপির প্রার্থীর গণসংযোগ করার সময় সেখানে শত শত লোক অংশ নেন।
বায়েজিদ বোস্তামী থানার এসআই নুরুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, ‘বিএনপির মনোনীত প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর গণসংযোগে দলীয় নেতাকর্মীরা ছাড়া অপরিচিতরাও ছিলেন। ভিডিও পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, গুলি ছোড়ার কয়েক সেকেন্ড আগে সরোয়ার হোসেন বাবলার বাঁ পাশে থাকা কালো পাঞ্জাবি পরিহিত একজন বাবলার দিকে হাত নেড়ে ইশারা দেওয়ার পরই বাবলার খুব কাছাকাছি পেছন থেকে কয়েক রাউন্ড গুলি করে অস্ত্রধারীরা। কিন্তু হাত নেড়ে ইশারা দেওয়া লোকটি অপরিচিত বলে জানতে পেরেছি। এ ঘটনায় এখনো থানায় কেউ মামলা করতে আসেননি। পুলিশ সজাগ রয়েছে।’
বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওসি জসিম উদ্দিন বলেন, ‘আহত ব্যক্তিরা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এলাকায় স্পেশাল ফোর্স জোরদার করা হয়েছে। অভিযান চলমান।’
৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অবৈধ অস্ত্রধারী ও পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় আনার দাবি: নির্বাচনী গণসংযোগকালে গুলি বর্ষণকারী, অবৈধ অস্ত্রধারী ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছে বিএনপি। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনের কাছে এই আহ্বান জানান বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার মীর মো. হেলাল উদ্দিন।
গতকাল বিকালে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির কার্যালয় নাসিমন ভবনের দলীয় চত্বরে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সমাবেশে এই আহ্বান জানান তিনি।
সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মীর হেলাল বলেন, ‘চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও চট্টগ্রাম-৮ আসনের ধানের শীষের প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ’র উপর নির্বাচনী গণসংযোগকালীন যে সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয়েছে, তা জাতীয় নির্বাচনকে বিলম্বিত করার গভীর ষড়যন্ত্র ও গণতন্ত্রবিরোধী অপতৎপরতার নির্মম বহিঃপ্রকাশ। এ ধরনের হামলা কেবল একজন প্রার্থী বা দলের ওপর নয়—এটি সমগ্র জাতির গণতান্ত্রিক অধিকারকে পদদলিত করার চেষ্টা।’
চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এনামুল হক এনাম বলেন, ‘নির্বাচনকে বানচাল করতে একটা পক্ষ সবসময় ষড়যন্ত্র করে আসছে। যেহেতু আমরা নির্বাচনী প্রচারণায় থাকব ফলে যে কোনো মুহূর্তে অঘটন ঘটতে পারে, তাই প্রার্থীরা শঙ্কায় আছেন। সরকারের কাছে আবেদন জানাই, যেন অবৈধ অস্ত্রগুলো উদ্ধার করার মাধ্যমে শান্তি ফিরিয়ে আনা হয়।’
গুলিবিদ্ধ বিএনপি প্রার্থীকে দেখতে হাসপাতালে জামায়াত নেতা শাহজাহান চৌধুরী: গুলিবিদ্ধ বিএনপি প্রার্থী এরশাদ উল্লাহকে দেখতে হাসপাতালে যান জামায়াত নেতা শাহজাহান চৌধুরী। তিনি জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী ও সাবেক সংসদ সদস্য। বুধবার রাতে চট্টগ্রামের এভারকেয়ার হাসপাতালে তিনি এরশাদ উল্লাহকে দেখতে যান। এ সময় তার সঙ্গে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনসহ আরও অনেককে দেখা যায়।