রাজকুমার নন্দী
প্রকাশ : ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৮:১১ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

বিএনপিতে প্রাণচাঞ্চল্য

তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন
বিএনপিতে প্রাণচাঞ্চল্য

দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগ নির্বাসনে থাকার পর দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডন থেকে দেশে ফিরে আসায় বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের পালে নতুন করে হাওয়া লেগেছে। তার প্রত্যাবর্তন ঘিরে দলটির সব স্তরের নেতাকর্মীরা সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। যার প্রতিফলন দেখা গেছে গত বৃহস্পতিবার, যখন তাকে বহনকারী উড়োজাহাজ ঢাকায় অবতরণ করে। বিমানবন্দর থেকে পূর্বাচলের তিনশ ফিটসহ তার চলাচলের রাস্তায় যে জনসমাগম-উপস্থিতি, অনেকের মতে সেটা ছিল স্মরণকালের সবচেয়ে বড়। এরপর গতকাল শুক্রবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধি এবং সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে তারেক রহমানের শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের কর্মসূচি ঘিরেও বিপুল জনসমাগমের ধারাবাহিকতা বজায় ছিল। পুরো পথে নেতাকর্মীর ছিল উপচে পড়া ভিড়। বলা হচ্ছে, এর মধ্য দিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে ‘সাংগঠনিক স্পৃহা’ নতুন করে জেগে উঠেছে। দেশে এরই মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের প্রক্রিয়াও শুরু হয়ে গেছে। এমন অবস্থায় ভোটগ্রহণ সামনে রেখে তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তন বিএনপির নির্বাচনী বৈতরণি পার হতেও সহায়ক হবে বলে প্রত্যাশা নেতাকর্মীদের।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত, তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে বিএনপি এবং দেশ উভয়েরই লাভ হয়েছে। মানুষ মনে করছে, এই দলটাই সরকার গঠন করবে। সুতরাং বিএনপি সরকার গঠন করলে কে প্রধানমন্ত্রী হবেন, দেশ ও দেশের মানুষের জীবনমানের উন্নয়নের জন্য তিনি কী ভাবছেন, সেটা মানুষ বুঝতে পেরেছে। অন্যদিকে তারেক রহমানের উপস্থিতির কারণে দলীয় শৃঙ্খলাও ঠিক হয়ে যাবে। নিরসন হয়ে যাবে মনোনয়ন ঘিরে কিছু আসনে সৃষ্ট অসন্তোষ।

ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর চিকিৎসার জন্য সপরিবারে যুক্তরাজ্যের লন্ডন যান তারেক রহমান। লন্ডনে পৌঁছানোর পর প্রথম কয়েক বছর তিনি চুপচাপ ছিলেন, রাজনৈতিক কোনো কার্যক্রমে অংশ নেননি। কিন্তু ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর তারেক রহমান বিএনপির নেতৃত্বে আসেন। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে ভার্চুয়ালি দল পরিচালনা করতে থাকেন। বিএনপির দাবি, লন্ডন থেকে তারেক রহমান দলকে সুসংগঠিত করার পাশাপাশি আওয়ামী ফ্যাসিবাদবিরোধী দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিএনপির এই দীর্ঘ সংগ্রামের পথ ধরেই চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে।

জানা গেছে, ধানের শীষের বিজয় ত্বরান্বিত করতে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনকে নির্বাচনী গণসংযোগেও কাজে লাগাবে বিএনপি। যদিও এ ব্যাপারে দলের পক্ষ থেকে এখনো কোনো পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়নি। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, নেতাকর্মীদের আরও উজ্জীবিত করার পাশাপাশি জনগণের কাছে পৌঁছাতে এবং বিএনপি তাদের জন্য কী কী করতে চায়, সেটা তুলে ধরতে তারেক রহমান ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে নির্বাচনী প্রচারণায় নামবেন। এর অংশ হিসেবে বিভাগীয় শহরগুলোতে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের নিয়ে নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেবেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এতে করে নির্বাচনী মাঠে এতদিন যে শূন্যতা ছিল, সেটা কেটে যাবে। একই সঙ্গে মনোনয়ন নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় যে জটিলতা তৈরি হয়েছিল, বিক্ষোভ-বিদ্রোহ হয়েছে, সমাধান হবে তারও। এর ফলে ধানের শীষকে বিজয়ী করতে সবাই একযোগে মাঠে নেমে পড়বেন, যা বিএনপির বিজয় ত্বরান্বিত করতে সহায়ক হবে।

জানা গেছে, নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য আজ শনিবার ভোটার তালিকায় নাম লেখাবেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এদিন ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হওয়া সংক্রান্ত সব কাজ এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের কাজও সারবেন তিনি। অবশ্য কোন আসন থেকে বা কয়টি আসন থেকে নির্বাচন করবেন, দল থেকে সেটি এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি। বিএনপি থেকে এরই মধ্যে ঘোষণা করা হয়েছে, তারেক রহমান বগুড়া-৬ আসন থেকে নির্বাচন করবেন। তবে ঢাকার একটি আসন থেকেও তিনি ভোট করতে পারেন বলে আলোচনা আছে। সে ক্ষেত্রে গুলশান, বনানী ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৭ আসন থেকে নির্বাচন করতে পারেন। যদিও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থের জন্য বিএনপি এই আসনটি ছেড়ে দিতে পারে বলেও আলোচনা রয়েছে।

নির্বাচন সামনে রেখে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনে দল এবং দেশ উভয়েরই লাভ হয়েছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান। তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘বিএনপি বর্তমানে স্ট্রাইকে রয়েছে। যেহেতু মানুষ মনে করছে, এই দলটাই সরকার গঠন করতে পারে। তবে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ অবস্থায় তারেক রহমান দেশে ফেরায় এখন বিএনপি নেতৃত্বের মানুষের কাছাকাছি যাওয়া ও জনগণের কথা শোনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে করে বিএনপির প্রধান নেতা কে, ভবিষ্যতে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, দেশ ও মানুষের জন্য তিনি কী ভাবছেন—সেটা মানুষ বুঝতে পারল, অর্থাৎ এখন এই দলটার আর কোনো সীমাবদ্ধতা রইল না। অন্যদিকে তারেক রহমান নিজেও নাগরিকদের বুঝতে পারছেন। এটা দূর থেকে বলা-বোঝা আর সামনে এসে বলা-বোঝার মধ্যে পার্থক্য আছে। এককথায় মানুষের সঙ্গে তার সরাসরি একটা কানেকশন তৈরি হলো, এটা খুব দরকার ছিল। এটা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ বিনির্মাণের ক্ষেত্রে নাগরিকদের সঙ্গে বিএনপির একটা অটুট বন্ধন তৈরি করবে। এটা সার্বিক বিবেচনায় দেশের জন্যও ভালো।’

এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আরও বলেন, ‘এতদিন লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি দল পরিচালনা করে আসা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দেশে ফেরায় দলের ওপর তার অত্যন্ত ভালভাবে নিয়ন্ত্রণ থাকবে। এমনিতে উনি অনেকভাবে প্রমাণ করেছেন যে, উনি একজন সফল সংগঠক। সেটা উনি দুইভাবে প্রমাণ করেছেন। বিএনপি সরকারে থাকা অবস্থায় (২০০১ থেকে ২০০৬), তখন তিনি তরুণ বয়সে সংগঠক হিসেবে যোগ্যতা-দক্ষতা দেখিয়েছেন। এরপর ২০১৮ সালে খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর চরম দুর্দিনে দেশের বাইরে থেকে দলের হাল ধরেছেন। নির্বাচিত কর্তৃত্ববাদী-ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম করে টিকে থাকা, এখানে সংগঠক হিসেবে অত্যধিক সাফল্য দেখিয়েছেন তিনি, নেতৃত্বদানের গুণাবলিও দেখাতে পেরেছেন। এখন তার সামনে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ করার সম্ভাবনা খুবই কম। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সামনে দাঁড়িয়ে কারোর নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়া অনেক কঠিন কাজ। অর্থাৎ তার উপস্থিতির কারণে দলীয় শৃঙ্খলাটা ৯০% ঠিক হয়ে যাবে।’

কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমানের মতে, তারেক রহমান বাইরে থাকা অবস্থায় বিএনপি নির্বাচনে বিজয়ী হলে অনেকে কৃতিত্ব নেওয়ার চেষ্টা করত যে, নির্বাচনে তারাই দলকে জিতিয়ে এনেছেন। তাতে পরবর্তী সময়ে দেশে ফিরে দলকে নিয়ন্ত্রণ করা, শৃঙ্খলার মধ্যে রাখা তার জন্য কঠিন হয়ে যেত। এখন তিনি যেহেতু নির্বাচনে দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, নির্বাচনে সাফল্য যেমন তার ও নেতাকর্মীদের; ঠিক তেমনিভাবে সরকারের ক্ষেত্রেও নিয়ন্ত্রণ তার এবং তিনি যেসব নেতাকে দলের জন্য ভালো মনে করছেন তাদের। এটা কিন্তু নির্বাচনের পরে এলে হতো না।

জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম মনি কালবেলাকে বলেন, ‘বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ফেরায় দল এবং দেশ উভয়েরই লাভ হবে। তিনি অনেক কিছু ছাপিয়ে তো অনেক ওপরে উঠে গেছেন। আমরা বলি, তারেক রহমান বিএনপির নেতা, কিন্তু তিনি দেশের নেতা। তিনি শুধু দল নয়, দেশেরও সম্পদ। তিনি দেশকে বিনির্মাণ করতে চান। এর আগে তার মা যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তখন তিনি দেশ ঘুরে ঘুরে মানুষের সমস্যা দেখেছেন। সেই সমস্যা সমাধানের জন্যই তিনি দৌড়াদৌড়ি করছেন। আর সেটা করবেন বলেই তার এই প্রত্যাবর্তন। আমরা মনে করি, সেটা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পক্ষে করা সম্ভব এবং সেটা তিনি করবেন। এতে দেশের বিরাট লাভ হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ ছাড়া তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনে দলের জন্য তো অবশ্যই লাভ হবে। গতকাল (বৃহস্পতিবার) কোটি মানুষ তাকে রিসিভ করতে এসেছেন। যে পরিমাণ লোক মাঠে (তিনশ ফিট) এসেছে, তার চেয়ে অধিক পরিমাণ লোক বাইরে ছিল, যারা মাঠে ঢুকতে পারেননি। এটা হলো বিএনপি ও তারেক রহমানের গ্রহণযোগ্যতা। গত কয়েক বছর ধরে তিনি যেভাবে মমতা-ভালোবাসা দিয়ে দল চালিয়েছেন, তার আগমন ঘিরে সেটারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।’

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ‘তারেক রহমানের দেশে ফেরা শুধু একটি ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তন নয়; এটি দেশের রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা। এর মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও জনগণের প্রত্যাশা বাস্তবায়নের পথ আরও সুগম হবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে এখন সুবাতাস বইতে শুরু করেছে।’

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি চুক্তির প্রত্যাশা করছে পাকিস্তান

সৌদিতে বসবাসে নতুন নিয়ম জারি

জুলাই শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ

অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের বিতর্কিত প্রস্তাবে ভোট দিচ্ছেন সুইসরা

সংসদীয় আলোচনায় উত্থাপিত তথ্যের ব্যাখ্যা দিল নাবিল গ্রুপ 

হোয়াইটওয়াশের মিশনে দুর্দান্ত ব্যাট করছে টাইগাররা

মেক্সিকোতে সশস্ত্র হামলায় মেয়র নিহত

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে ইন্টিগ্রেটিভ মেডিসিনের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিলেন প্রফেসর ড. মজিবুল হক

তুরস্কের অঘটনে অস্ট্রেলিয়ার ঐতিহাসিক জয় 

আত্মসমর্পণ করতে সিরাজগঞ্জ যাচ্ছেন মুফতি আমির হামজা

১০

খুলনায় ফজরের নামাজের সময় মসজিদে ঢুকে গুলি, আহত ২

১১

মহারাষ্ট্রে একই পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ উদ্ধার

১২

ডেমোক্র্যাটদের সমালোচনা / আজকের চুক্তি মোজতবা খামেনির কাছে ট্রাম্পের আত্মসমর্পণ

১৩

ঘরে ঢুকে নৃশংসভাবে মা-মেয়েকে কুপিয়ে হত্যা, নেপথ্যে কী?

১৪

নবম পে-স্কেলে সুখবর: দ্বিগুণ হচ্ছে পেনশন, বাড়ছে বিভিন্ন ভাতা

১৫

রামিসা হত্যা মামলা / মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ২ আসামির জেল আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করলেন হাইকোর্ট

১৬

বেদে পল্লীতে এসি-সিসি ক্যামেরা লাগিয়ে মাদক ব্যবসায়ীর রাজকীয় জীবনযাপন

১৭

উদ্বোধনী ম্যাচে ড্র, ব্রাজিলের জন্য বড় অশনি সংকেত!

১৮

কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগ, পুলিশ পরিদর্শক প্রত্যাহার

১৯

প্রাথমিকের পরীক্ষায় ফি নির্ধারণ

২০
X