

নিউইয়র্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) ২০২৬ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলেছে, বাংলাদেশে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে শেখ হাসিনার আমলের মতো ভয়ভীতি ও দমন-পীড়নের সংস্কৃতি অনেকাংশে কমলেও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিবেচনায় নির্বিচার গ্রেপ্তার ও বিচারহীন আটক অব্যাহত রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন একনায়কতান্ত্রিক আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার দেশে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও মানবাধিকার সংস্কার বাস্তবায়নে হিমশিম খাচ্ছে। ফেব্রুয়ারিতে সাধারণ নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করা হলেও রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতা এবং বিচারহীনতা রয়ে গেছে। গত বছরের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করে। ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে ২০২৪ সালের আন্দোলন দমনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়।
এইচআরডব্লিউ জানিয়েছে, বর্তমানে শতশত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী আটক রয়েছেন। এ তালিকায় অভিনেতা, আইনজীবী, গায়ক ও রাজনৈতিক কর্মীরাও রয়েছেন। ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ অভিযানে কমপক্ষে ৮ হাজার ৬০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আসকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের আগস্টের মধ্যে গণপিটুনিতে নিহত হন অন্তত ১২৪ জন। প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে রাজনৈতিক সহিংসতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। নারী অধিকার ও এলজিবিটিবির বিরুদ্ধে কট্টরপন্থি গোষ্ঠীর সহিংসতা বাড়ছে। জুলাইয়ে গোপালগঞ্জে এনসিপির সমাবেশে পাঁচজন নিহত হয়। এরপর পুলিশ কয়েকশ আওয়ামী লীগ সমর্থককে আটকসহ অজ্ঞাতনামা ৮ হাজার ৪০০ জনের বিরুদ্ধে ১০টি হত্যা মামলা করে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও ফৌজদারি মামলায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ‘অজ্ঞাতনামা’ আসামি করার প্রবণতা, জামিন নামঞ্জুর করার ঘটনা অব্যাহত আছে।
সাইবার নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার, সাংবাদিকদের ওপর হামলা, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত-সংক্রান্ত মামলায় লেখকদের বিরুদ্ধে পুলিশি তদন্ত এবং বাকস্বাধীনতার সীমাবদ্ধতার বিষয়গুলোও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের তদন্তে গঠিত কমিশন ১ হাজার ৮৫০টির বেশি অভিযোগ পেয়েছে। তবে নিরাপত্তা বাহিনী তথ্য গোপন ও তদন্তে সহযোগিতা না করায় কার্যকর অগ্রগতি হয়নি।
২০২৪ সালের আন্দোলনে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি জাতিসংঘও উল্লেখ করেছে। সেই সময়ে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হন। পুলিশ জানিয়েছে, মাত্র ৬০ জন কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সংঘটিত অপরাধ বিচারে অন্তর্বর্তী সরকার নতুনভাবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে ব্যবহার করছে। তবে এর বিচারিক মান ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও মৃত্যুদণ্ডের বিধান বহাল রয়েছে।
২০২৫ সালে ‘জুলাই ঘোষণা’র মাধ্যমে গঠিত ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার ও গণভোট আয়োজনের পরিকল্পনার কথা জানানো হলেও রাজনৈতিক ঐক্যের অভাবে বড় সংস্কার বাস্তবায়িত হয়নি।
প্রতিবেদনে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জীবনমানের অবনতি, বিদেশি সহায়তা হ্রাস, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং নারীর প্রতি সহিংসতার বিষয়গুলোকেও মানবাধিকার সংকট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।