

ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল জোটের মধ্যে গত শনিবার থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধ ষষ্ঠ দিনে গড়িয়েছে। এখন পর্যন্ত এ যুদ্ধ থেকে পিছু হটার ইঙ্গিত মেলেনি কোনো পক্ষ থেকে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও দেশটির শীর্ষ সামরিক কমান্ড পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, তাদের লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত এ যুদ্ধ থামবে না। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দাবি করেছে, তারা ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে গুঁড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। এই পাল্টাপাল্টি দাবির আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে হাজারো মানুষের হাহাকার। গত ছয় দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত শুধু ইরানেই নিহত হয়েছে ১ হাজার ২৩০ জনের বেশি মানুষ, যার একটি বড় অংশই শিক্ষার্থী। সংঘাতের আঁচ লেগেছে কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমানের মতো দেশগুলোতেও। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ও পারস্য উপসাগরে একের পর এক তেল ট্যাংকার ও যুদ্ধজাহাজে হামলার ঘটনা বিশ্ব অর্থনীতিকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কাতার তার রাজধানী দোহায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের চারপাশের এলাকা থেকে সাধারণ মানুষকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে স্পষ্ট করে তোলে। ইরাক থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এ রণক্ষেত্রে এখন শুধুই ধ্বংসের চিহ্ন এবং বারুদের গন্ধ। যুদ্ধের এ পর্যায়ে কোনো পক্ষই নমনীয় হওয়ার লক্ষণ দেখাচ্ছে না, বরং ইরানের পক্ষ থেকে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে যে, আগামী দিনগুলোয় তাদের হামলার পরিধি আরও বিস্তৃত ও তীব্র হবে। এক কথায়, মধ্যপ্রাচ্য এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে সামান্য ভুল পদক্ষেপ পুরো বিশ্বকে এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
গত শনিবার যখন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানের ওপর বিমান হামলা শুরু করে, তখন থেকেই পুরো অঞ্চলটি অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। বৃহস্পতিবার সকালেও তেহরানের আকাশে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা গেছে এবং দফায় দফায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। এ সংঘাতের ষষ্ঠ দিনে এসেও কোনো পক্ষই যুদ্ধবিরতির সংকেত দেয়নি। ইরানের সামরিক কমান্ডার মেজর জেনারেল আমির হায়দারি সাফ জানিয়েছেন, ‘সময় আমাদের কাছে বড় বিষয় নয়; আমরা এ যুদ্ধ থামাতে আসিনি।’ ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানকে ফোনে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, শত্রুদের অশুভ তৎপরতা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত ইরানের সশস্ত্র বাহিনী তাদের কার্যক্রম থামাবে না। ইরানের দাবি অনুযায়ী, তারা এরই মধ্যে ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ-৪’-এর ১৯তম ধাপের হামলা সম্পন্ন করেছে। এ অভিযানে তারা শুধু ইসরায়েল নয়, বরং কুয়েত, বাহরাইন ও কাতারে থাকা ২০টিরও বেশি মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। বিশেষ করে বাহরাইনের আমাজন ডাটা সেন্টারে আঘাত হানার মাধ্যমে তারা মার্কিন সামরিক গোয়েন্দা তৎপরতাকে বড় ধরনের ধাক্কা দেওয়ার দাবি করেছে।
অন্যদিকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা ইরানের রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরের সামরিক সদর দপ্তর ও রাজনৈতিক কেন্দ্রগুলোয় দফায় দফায় হামলা চালাচ্ছে। ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর দাবি অনুযায়ী, তারা ইরানের কোম শহরে থাকা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা এবং ইসফাহান শহরের একটি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত ইরানে ২ হাজারেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে, যার ফলে ইরানের আকাশসীমায় এখন মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর পূর্ণ আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
তবে এই দাবির বিপরীতে ইরান দাবি করেছে, তারা দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি এফ-১৫ই যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে, যদিও মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এ দাবিকে ভিত্তিহীন গুজব বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
হতাহতের চিত্র ও মানবিক বিপর্যয়: এ যুদ্ধের সবচেয়ে করুণ পরিণতি ভোগ করছে সাধারণ মানুষ। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ২৩০ জন ছাড়িয়ে গেছে এবং ৬ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছে মিনাব শহরে, যেখানে গত শনিবারের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় একটি বালিকা বিদ্যালয়ের ১৭৫ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে। ইরানের আধা-সরকারি গণমাধ্যম ফারস নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, রাজধানী তেহরানের দক্ষিণ-পশ্চিমে পারান্দ শহরের আরও দুটি স্কুলেও মার্কিন ও ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। সেখানে শ্রেণিকক্ষ ও আবাসিক ইউনিটের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ছবি ছড়িয়ে পড়লেও হতাহতের সঠিক সংখ্যা এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।
সংঘাতের এ উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিবেশী দেশগুলোতেও। কুয়েতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর ছয় সদস্য নিহত হয়েছেন। এর বাইরে কুয়েতের নিজস্ব বাহিনীর দুই সেনাসহ আরও চারজন প্রাণ হারিয়েছেন। ইসরায়েলের অভ্যন্তরেও ইরানের পাল্টা হামলায় এখন পর্যন্ত ১১ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যার মধ্যে গত ১ মার্চ বেইত শেমেশে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ৯ জন মারা যান। লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় গত সোমবার থেকে অন্তত ১০২ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতে তিনজন, ওমানে একজন এবং বাহরাইনে একজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ওমান উপকূলে একটি তেল ট্যাংকারে হামলায় একজন এবং বাহরাইনের সালমান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটিতে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার সময় সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ডে একজন প্রাণ হারান। আবুধাবিতে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে ড্রোন ধ্বংস করার সময় নিচে পড়া ধ্বংসাবশেষে পাকিস্তান ও নেপালের ছয় নাগরিক আহত হয়েছেন।
বৈরুতের একাংশ গাজার মতো ধ্বংস করার হুমকি ইসরায়েলের: লেবাননে ব্যাপক হামলা চালিয়েই যাচ্ছে ইসরায়েল। এতে বেড়ে চলে হতাহতের সংখ্যাও। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলকে গাজার মতো ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার হুমকি দিয়েছেন ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজলাল স্টরমিচ। লেবাননের সংবাদমাধ্যম ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সি দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে জানায়, গত সোমবার থেকে ইসরায়েলি হামলায় এ পর্যন্ত ১০২ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ৬৩৮ জন। হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করেছে মন্ত্রণালয়।
এদিকে ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজলাল স্টরমিচ হুমকি দিয়ে বলেছেন, ‘খুব শিগগির (বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলের) দাহিয়েহ এলাকা খান ইউনিসে পরিণত হবে।’
নৌপথ ও সমুদ্রসীমার উত্তেজনা: যুদ্ধের আঁচ এখন সমুদ্রপথেও প্রবলভাবে অনুভূত হচ্ছে। গত বুধবার শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ উপকূলে আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবস্থানরত ইরানের যুদ্ধজাহাজ ‘আইআরআইএস দিনা’ মার্কিন সাবমেরিন থেকে করা হামলার শিকার হয়ে ডুবে যায়। জাহাজটিতে থাকা ১৮০ জন আরোহীর মধ্যে ৮৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং ৩২ জনকে জীবিত উদ্ধার করেছে শ্রীলঙ্কা কর্তৃপক্ষ। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ ঘটনাকে ‘আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন’ হিসেবে আখ্যায়িত করে যুক্তরাষ্ট্রকে এর চরম মূল্য দিতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। এর পাল্টা জবাবে ইরানও উত্তর উপসাগরে একটি মার্কিন তেল ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে।
ইরাকের খোর আল-জুবাইর বন্দরে বাহামার পতাকাবাহী একটি তেল ট্যাংকারে নৌকা দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে, যার ফলে ট্যাংকারটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সমুদ্রে তেল ছড়িয়ে পড়েছে। কুয়েতের মুবারক আল-কাবির বন্দরের কাছেও একটি ট্যাংকারে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে এবং জাহাজটিতে পানি ঢুকে পড়ার খবর পাওয়া গেছে। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন সংস্থার (আইএমও) প্রধান আর্সেনিও ডোমিঙ্গুয়েজ জানিয়েছেন, ইরানের হুমকির কারণে হরমুজ প্রণালিতে প্রায় ২০ হাজার নাবিক এবং ১৫ হাজার পর্যটক আটকা পড়েছেন। বিশ্ব বাণিজ্যের এ গুরুত্বপূর্ণ পথটি অচল হয়ে পড়ায় বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রভাব ও জ্বালানি বাজার: মধ্যপ্রাচ্যের এ সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্ববাজারে। জ্বালানি অর্থনীতিবিদ এড হির্স সতর্ক করেছেন যে, যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, তবে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১৫০ ডলারে গিয়ে ঠেকতে পারে। এরই মধ্যে ইউরোপের দেশগুলোয় প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) বাজারে দাম ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক অবস্থান: যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল-বুসাইদি এক্সে দেওয়া এক পোস্টে লিখেছেন, ‘চলুন, এ যুদ্ধ এখনই বন্ধ করি।’ তিনি অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি এবং দায়িত্বশীল আঞ্চলিক কূটনীতিতে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন। কাতার তার নাগরিকদের সুরক্ষায় দোহায় মার্কিন দূতাবাসের চারপাশের এলাকা থেকে বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে উপযুক্ত বাসস্থানের ব্যবস্থা করেছে। বাহরাইন তাদের আকাশে অন্তত ৭৫টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১২৩টি ড্রোন ধ্বংস করার দাবি করেছে।
অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়া মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক সরঞ্জাম ও ছয়টি সংকট মোকাবিলা দল পাঠিয়েছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিও এ যুদ্ধে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা নাকচ করেননি, যদিও তিনি ইরানের ওপর হামলার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের ইরানের ড্রোন হামলা থেকে রক্ষা করতে কারিগরি ও বিশেষজ্ঞ সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছেন। যুদ্ধের এ ডামাডোলে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) ইরাকের কুর্দি অঞ্চলে ‘ইরানবিরোধী বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি’র ওপরও অভিযান শুরু করেছে।