

যাত্রা শুরু হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের। প্রথম অধিবেশন বসছে আজ বৃহস্পতিবার। বিএনপি ও সমমনাদের ভোট বর্জনের মধ্যে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি হয়েছিল দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। মূলত তখন থেকে কার্যকর বিরোধী দলের অভাবে প্রায় প্রাণহীন ছিল সংসদ। জুলাই অভ্যুত্থানের পর শুধু বিরোধিতা করার জন্য বিরোধিতা নয়, বরং দেশ ও জাতির স্বার্থে সরকার ও বিরোধী দলের কার্যকর ভূমিকায় দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় পর এবারের সংসদ প্রাণবন্ত ও কার্যকর হবে—এমনটাই আশা করছেন রাজনীতিক ও বিশ্লেষকরাসহ দেশের সাধারণ মানুষ।
এবারের সংসদে আলোচনা-বিতর্ক হবে সমস্যা সমাধানের জন্য, নতুন সমস্যা সৃষ্টির জন্য নয় বলে আশাবাদী সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘এই সংসদ প্রাণবন্ত হবে এই অর্থে—এখানে শুধু পরস্পরকে আক্রমণ বা অর্থহীন আলোচনার পরিবর্তে এই সংসদে গঠনমূলক আলোচনা হবে, সমালোচনা হবে। এই সমালোচনা-আলোচনা, বিতর্কগুলো হবে সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে, সমস্যা সৃষ্টি করার জন্য নয়।’
তিনি বলেন, ‘কার্যকর সংসদ মানেই সংসদে শুধু বক্তব্য দেবে, গালাগাল করবে, একে অপরকে ছোট করার চেষ্টা করবে, তা নয়। গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টাই হবে সত্যিকারের কার্যকর সংসদ। বহুদিন পরে আমাদের একটা নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচনের মাধ্যমে একদল তরুণও নির্বাচিত হয়ে এসেছেন।
আশা করি, আমাদের সংসদ সদস্যরা সংসদটাকে কার্যকর সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করবেন।’
গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদের সরকারি দলের সভাকক্ষে বিএনপির সংসদীয় দলের সভা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী দলের সংসদ সদস্যদের চলনে-বলনে মার্জিত ও সতর্ক থাকতে বলেছেন। এ ছাড়া বিএনপির নেওয়া জনকল্যাণমুখী বিভিন্ন কর্মসূচি এবং সামনের দিনগুলোতে করণীয় বিষয়ে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের দিকনির্দেশনা দেন। তিনি বলেন, ‘ভোটের আঙুলের কালির দাগ মোছার আগেই আমরা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু করেছি। এটাই হচ্ছে বিএনপি। এই বিএনপিকেই মানুষ দেখতে চায়।’
প্রধানমন্ত্রী জানান, দ্রুততম সময়ের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নের পাশাপাশি সারা দেশে খাল খনন কর্মসূচি শুরু করা হবে। ডেঙ্গুর মৌসুমকে সামনে রেখে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সবাইকে সতর্ক করেন তিনি।
এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই জাতীয় সনদের বিষয়ে বিএনপি যতটুকুতে সম্মত হয়েছে, সরকার ততটুকুই বাস্তবায়ন করবে।
সভা শেষে জাতীয় সংসদের এলডি হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, ‘স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের জন্য আমরা সংসদ নেতাকে দায়িত্ব দিয়েছি, তিনিই সিদ্ধান্ত দেবেন, আগামীকালকে (আজ) আমরা জানতে পারব। সংসদ উপনেতার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধানমন্ত্রী।’
সংসদীয় দলের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দিয়েছেন জানিয়ে চিফ হুইপ বলেন, ‘সংসদে আমরা (এমপি) কেমন আচরণ করব এবং কার্যক্রম কী হবে, সে বিষয়ে কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। সংসদে যেহেতু স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নেই, প্রথমে খালি চেয়ার দিয়ে শুরু করব। সংসদ নেতা সভার সভাপতিত্ব করার জন্য জ্যেষ্ঠ কোনো নেতার প্রস্তাব করবেন, এরপর কোনো একজন সমর্থন করবেন এবং তিনিই সভার সভাপতিত্ব করবেন। সেখানে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করব।’
এর আগে জামায়াতকে ডেপুটি স্পিকার পদ নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েছিল বিএনপি। দলটি সরকারি দলের প্রস্তাব গ্রহণ করেছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে চিফ হুইপ বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী উদারতা দেখিয়ে এ প্রস্তাবটি দিয়েছিলেন। এ ব্যাপারে আমরা এখনো ইতিবাচক সাড়া পাইনি। সাড়া পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।’
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ আজ সংসদে আইনমন্ত্রী উত্থাপন করবেন বলে জানিয়েছেন চিফ হুইপ। এগুলো যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সব দলের সদস্যদের নিয়ে একটি ‘বিশেষ কমিটি’ গঠন করা হবে। এই কমিটি নির্ধারণ করবে কোন অধ্যাদেশগুলো বহাল থাকবে আর কোনগুলো ল্যাপস (বাতিল) হয়ে যাবে।
প্রথম দিনের বৈঠকে কার্য উপদেষ্টা, প্রিভিলেজ কমিটি এবং হাউস কমিটি গঠন করা হবে বলে জানান চিফ হুইপ। রাষ্ট্রপতির ভাষণ শেষ হলেই আজকের অধিবেশন মুলতবি করা হবে। ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের পর পাঁচ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মনোনীত করা হবে। এরপর শোক প্রস্তাব উপস্থাপন করা হবে। সেখানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত খালেদা জিয়া সম্পর্কে আলোচনা হবে। জুলাই যোদ্ধাদের সম্পর্কে আলোচনা হবে। এরপর দেশবরেণ্য মানুষ এবং বিদেশি বরেণ্য ব্যক্তিদের বিষয়ে শোক প্রস্তাব থাকবে।
জুলাই জাতীয় সনদে সংবিধান সংস্কার পরিষদের কথা বলা হয়েছিল, সেটার ভবিষ্যৎ কী—এমন প্রশ্নের জবাবে চিফ হুইপ বলেন, সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত না থাকায় তারা সেই শপথ নেননি। ভবিষ্যতে এটি সংবিধানে যুক্ত হওয়ার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
লিখিত বক্তব্যে চিফ হুইপ বলেন, ‘মানুষের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা, ভাতের অধিকার নিশ্চিত করা এবং গণতন্ত্রকে সুসংহত করার লক্ষ্যে আমাদের প্রধানমন্ত্রী যে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও ত্যাগ স্বীকার করেছেন, এরই ধারাবাহিক প্রতিফলন হচ্ছে আজকের এই জাতীয় সংসদ। জাতীয় সংসদ শুধু একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি বাংলাদেশের মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা, আস্থা ও প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটিয়ে আগামীকাল (আজ) থেকে জাতীয় সংসদের নতুন অধিবেশন শুরু হতে যাচ্ছে। এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে আমরা দেশবাসীর কাছে দোয়া ও সমর্থন কামনা করছি।’
তিনি বলেন, ‘আগামীকাল (আজ) যে সংসদ অধিবেশন শুরু হবে, সেটি হবে জনগণের সংসদ-দেশের মানুষের অধিকার, আশা এবং স্বপ্নের প্রতিনিধিত্বকারী একটি সর্বোচ্চ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে একটি কার্যকর, প্রাণবন্ত ও দায়িত্বশীল সংসদ পরিচালনা করা। আমরা চাই সংসদে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা, যুক্তিপূর্ণ তর্ক ও সুস্থ বিতর্কের পরিবেশ সৃষ্টি হোক।’
নূরুল ইসলাম বলেন, ‘গণতন্ত্রের সৌন্দর্যই হলো মতের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও আলোচনার মাধ্যমে জাতীয় সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করা। সেই লক্ষ্যেই আমরা সংসদকে একটি কার্যকর ও অর্থবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এই প্রেক্ষাপটে আমরা দেশের জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন কামনা করছি। একই সঙ্গে আমরা বিরোধী দলের গঠনমূলক ভূমিকা ও সহযোগিতাও প্রত্যাশা করি। আমরা বিশ্বাস করি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সংলাপ ও ঐক্যমতের ভিত্তিতে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর সমাধান করা সম্ভব এবং সেই পথ ধরেই আমরা জাতিকে আরও শক্তিশালী ও স্বাবলম্বী ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিতে পারব।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের অঙ্গীকার হচ্ছে সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, দারিদ্র্য দূর করা এবং দেশের অর্থনীতিকে আরও গতিশীল ও শক্তিশালী করে তোলা। একটি কার্যকর সংসদের মাধ্যমে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দেওয়াই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। পরিশেষে, দেশবাসীর কাছে আবারও দোয়া ও সহযোগিতা কামনা করছি, যাতে আমরা সবাই মিলে একটি শক্তিশালী, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে পারি।’
এ সময় সরকার দলীয় হুইপ জি কে গউছ, রকিবুল ইসলাম, মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, মো. আখতারুজ্জামান মিয়া এবং এ বি এম আশরাফ উদ্দিন (নিজান) উপস্থিত ছিলেন।
অন্যদিকে, সংসদে বিরোধী সংসদীয় দলের বৈঠক শেষে সাংবাদিকের ব্রিফ করেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়ে জামায়াত কী ভূমিকা নেবে—জানতে চাইলে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা অনেক আলাপ-আলোচনা করেছি এ ব্যাপারে। কালকে (আজ) আমাদের ভূমিকা দৃশ্যমান আপনারা দেখবেন। যেমন সূর্য উঠবে, তেমন ভাষণ শুনবেন এবং আমাদের ভূমিকাও দেখবেন।’
দায়িত্বশীল বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে চান উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, ‘সব ব্যাপারে বিরোধিতা নয়, আবার না বুঝেও কোনো সহযোগিতা নয়। দেশ ও জাতির কল্যাণে সরকারি দলের গৃহীত সব সিদ্ধান্ত এবং পদক্ষেপে আমাদের সমর্থন ও সহযোগিতা থাকবে। কিন্তু দেশ ও জাতির ক্ষতি হয়—এমন কোনো সিদ্ধান্ত কিংবা পদক্ষেপ নিলে আমরা আমাদের দায়িত্ব সেভাবেই পালন করব। ভুল করলে প্রথমে আমরা সেই ভুল ধরিয়ে দেব, সংশোধনের সুযোগ দেব, পরামর্শ দেব। যদি দেখি পরামর্শে কাজ হচ্ছে না, তাহলে প্রতিবাদ করব। প্রতিবাদে যদি কাজ না হয়, তাহলে জনগণের অধিকারের পক্ষে আমরা শক্ত হয়ে দাঁড়াব।’
সংখ্যাগরিষ্ঠতার বলে সরকার কোনো কিছু করতে চাইলে সেটা তারা পারবে উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘কিন্তু যদি আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে যৌক্তিক বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাহলে সেটা হবে জাতির জন্য উত্তম।’
জামায়াতের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ এই সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা করেন। দলের সংসদ সদস্য এ টি এম আজহারুল ইসলাম, মুজিবুর রহমান ও রফিকুল ইসলাম খান এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে বিরোধীদলীয় উপনেতা ও জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী সংসদে সব সময় একটা ইতিবাচক এবং সিরিয়াস ভূমিকা নেবে।’
জানা গেছে, আজ সংসদ অধিবেশন শুরুর পর দুই দিন (শুক্র ও শনিবার) বিরতি থাকবে। এরপর ১৫ মার্চ আবার সংসদ বসবে। ওই দিন মুলতবি হওয়ার পর ঈদুল ফিতরের পর ২৯ মার্চ ফের অধিবেশন শুরু হবে।