রোকন উদ্দীন
প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:২৮ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

তল্লাশি ও জব্দের ক্ষমতা চায় প্রতিযোগিতা কমিশন

প্রতিযোগিতা কমিশন আইন-২০১২
ছবি : কালবেলা গ্রাফিক্স
ছবি : কালবেলা গ্রাফিক্স

চলমান মামলার তদন্তের স্বার্থে অফিস তল্লাশি এবং নথি, কম্পিউটার ও ইলেকট্রনিক তথ্য জব্দ করার সুযোগ চায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন (বিসিসি)। এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাইরে এ ধরনের ক্ষমতা রয়েছে কর কর্তৃপক্ষ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের। বর্তমানে চলমান মামলার কোনো ডকুমেন্ট প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে চিঠি বা মৌখিক নির্দেশের মাধ্যমে জোগাড় করতে হয়। এ ছাড়া অসন্তুষ্ট পক্ষ আপিলের জন্য একটি প্রতিযোগিতা আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠন করার জন্যও বলছে কমিশন। বর্তমানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আপিল করতে হয়। এর বাইরে লিনিয়েন্সি বা রাজসাক্ষীর দয়া দেখানো, চুক্তির সংজ্ঞায় পরিবর্তনসহ বেশ কিছু বিধান যুক্ত করে প্রতিযোগিতা কমিশন আইন ২০১২ কে সংস্কার করার প্রস্তাব করেছে বিসিসি।

কমিশনের কর্মকর্তারা বলেছেন, আইন না থাকায় চলমান মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চাইলেও অভিযুক্তরা দেয় না। মাঝে মাঝে মামলার স্বার্থে অনেক নথি জব্দ করার প্রয়োজন হয়। যা কমিশন পারে না। এতে অনেকে অপরাধ করেও পার পেয়ে যায়। এ ছাড়া প্রতিযোগিতা কমিশন যেহেতু বিচারিক কার্য সম্পাদন করে, তাই আপিল করার জন্যও বিচারিক আদালতের অধীন এটি আপিল ট্রাইব্যুনাল প্রয়োজন। সব মিলিয়ে এ প্রস্তাবগুলো দেওয়া হয়েছে।

তবে অনেকের দাবি, নতুন আইনে ব্যবসায়ীদের হয়রানি করার সুযোগ বাড়বে। আর সংস্কার প্রস্তাবে বিসিসির জবাবদিহি বাড়ানোর কোনো ধারা না থাকায় হতাশ বিশ্লেষকরা। তবে নতুন আইন অনুসারে প্রয়োজনীয় কর্মসম্পাদনের সক্ষমতা রয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে।

২০১২ সালের আইনে গঠিত প্রতিযোগিতা কমিশন ২০১৬ সালে তাদের কার্যক্রম শুরু করে।

বর্তমান আইনের ধারা-৩ মতে দেওয়ানি কার্যবিধি ১৯০৮ অনুসারে কমিশন দেওয়ানি আদালতের মতোই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন। এ ছাড়া এর চেয়ারম্যান বা সদস্য ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন।

প্রতিযোগিতা কমিশন বাজারে ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, মূল্য কারসাজি রোধ করা ও ভোক্তাদের অনৈতিক ব্যবসা থেকে সুরক্ষা দিতে কাজ করে। প্রতিযোগিতা আইন লঙ্ঘন করে বাজারে ভারসাম্য নষ্ট করলে যে কেউ কমিশনে মামলা বা অভিযোগ দিতে পারেন। এ ছাড়া কমিশন নিজ উদ্যোগেও মামলা করতে পারেন। প্রয়োজনীয় শুনানি শেষে মামলার রায় দেন চেয়ারম্যান। তবে রায় মনঃপূত না হলে বর্তমান আইনের ধারা ২৯ মতে সংক্ষুব্ধ পক্ষ রায় পুনর্বিবেচনার জন্য ৩০ দিনের মধ্যে কমিশনে আবেদন করতে পারেন। তবে জরিমানা হলে তার ১০ শতাংশ জমা দিয়ে আবেদন করতে হয়। এ ছাড়া রায়ের বিরুদ্ধে সরকারের কাছে (বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে) আপিল করতে পারবেন। জরিমানার বিরুদ্ধে আপিল করতে ২৫ শতাংশ জমা দিয়ে রশিদসহ আপিল করতে হয়।

কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, তাদের লক্ষ্য হলো ডিজিটাল অর্থনীতির যুগের সঙ্গে আইনে সামঞ্জস্য আনা এবং বাজারে ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করা। ন্যায্য শুনানি ও যথাযথ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে খসড়ায় স্বাধীন ট্রাইব্যুনাল গঠনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

বিসিসি সদস্য (আইন) আফরোজা বিলকিস বলেন, প্রতিটি দেশেই প্রতিযোগিতা আইন রয়েছে। আবার আপিল ট্রাইব্যুনালও রয়েছে। এটি অনেক উন্নত দেশের ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সংশোধন ও আইন সংযোজনের আগে আমরা বিভিন্ন দেশের যেমন— ভারত, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের প্রতিযোগিতা আইনগুলো পর্যালোচনা করা হয়েছে। তিনি বলেন, আইন হলে আমাদের সক্ষমতা না থাকলে আমরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা নিয়ে কাজ করব। যে তদন্ত আমরা করতে পারবো না, তা সরকারি অন্য তদন্ত সংস্থার ওপর ছেড়ে দেব।

কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, কমিশনের কর্মকর্তারা সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবেন এবং সাক্ষীর উপস্থিতিতে তল্লাশি ও জব্দ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন। বর্তমান আইনের ধারা-৪ অনুসারে কমিশন প্রয়োজনীয় দলীলাদি তদন্তে নিয়োজিত ব্যক্তির কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ দিতে পারেন।

সংশোধিত আইনে কমিশন একটি আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। এখানে কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে করা আপিল শুনানি ও নিষ্পত্তি হবে। এই ট্রাইব্যুনালে একজন চেয়ারপারসন থাকবেন। তাকে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক হতে হবে বা অন্তত ২০ বছরের বিচারিক অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।

সদস্য হিসেবে সর্বাধিক দুজনকে নিয়োগ দেওয়া যাবে। তাদের অর্থনীতি, আইন, ব্যবসা বা হিসাববিদ্যার ক্ষেত্রে অন্তত ২০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকবে। প্রতিটি খাত থেকে সর্বোচ্চ একজন করে সদস্য রাখা যাবে।

এ ছাড়া আইনে ‘লিনিয়েন্সি’ বা দয়া দেখানোর একটি নতুন বিধানও যুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে যেসব ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠান নিজেদের দোষ স্বীকার করবে এবং তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করবে কমিশন তাদের শাস্তি কমাতে বা মওকুফ করতে পারবে। এ ধারা বর্তমান প্রতিযোগিতা আইন-২০১২-তে ছিল না।

কমিশনের রায় মনঃপূত না হলে প্রতিযোগিতা আপিল ট্রাইব্যুনালে আপিল করতে পারবে সংশ্লিষ্ট পক্ষ। আপিল করার আগে জরিমানার ২৫ শতাংশ অর্থ জমা দিতে হবে।

কমিশনের শাস্তির আদেশ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় ফি জমা দিয়ে আপিল করতে হবে। তবে শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনালের রায় চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। যদি আপিলে তারা জিতে যায়, তাহলে অর্থ ফেরত দেওয়া হবে।

যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অ্যালগরিদম, স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ বা ডিজিটাল টুলস ব্যবহার করে অনলাইন বাজারে কারসাজি করে সংশোধিত আইনে কমিশনকে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

নতুন একটি ধারা অনুযায়ী, ভোক্তার তথ্যের ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ যদি প্রতিদ্বন্দ্বীদের বাজারে প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করে, তবে সেটিকেও ‘ক্ষমতার অপব্যবহার’ হিসেবে গণ্য করা হবে।

জানা যায়, গত বছরের মাঝামাঝিতে আইন সংশোধন করে একটি খসড়া তৈরি করে কমিশন। তারপর তার উপর অংশীজনের আলোচনা শেষে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। তবে এটি এখনো যাচাই বাছাই চলছে বলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন বলেন, প্রতিযোগিতা আইনটি নিয়ে আমরা এখনো কাজ করছি। এখন পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ে একটি বৈঠক হয়েছে। আরও একটি বৈঠক হবে বিষয়টি নিয়ে। কিছু সংযোজন বিয়োজন হতে পারে। আলোচনা শেষে এটির খসড়া চূড়ান্ত হবে।

আইনের সংস্কারকে ইতিবাচক বলছেন অর্থনীতি ও বাজার বিশ্লেষকরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সানেমের নির্বাহী চেয়ারম্যান সেলিম রায়হান বলেন, আইনকে শক্তিশালী করা দরকার এটা যেমন ঠিক, তেমনি প্রয়োগের জন্য যথাযথ দক্ষ ব্যক্তিকে এখানে নিয়োগ দেওয়াটাও জরুরি। কারণ দেশে আইন অনেক রয়েছে। আবার অপপ্রয়োগও রয়েছে। তাই কেউ যাতে আইনের অপপ্রয়োগ করে কারও হাতিয়ার হিসেবে কাজ না করে সেটা লক্ষ রাখতে হব।

তিনি বলেন, আইনের সংস্কার ব্যবসায়ীদের জন্য ভয়ের তেমন কারণ নেই। যদি ব্যবসায়ীরা সঠিক থাকে এবং প্রতিযোগিতার জায়গাটা নিশ্চিত করে। আমাদের প্রতিবেশী ভারত, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া বিভিন্ন দেশে প্রতিযোগিতা আইন এবং এর প্রয়োগ খুবই শক্তিশালী। বিশেষ করে তল্লাশি ও জব্দ করার ক্ষমতা সম্প্রসারণ যদি দায়িত্বশীলভাবে প্রয়োগ করা হয়, তবে আইনের কার্যকারিতা বাড়বে।

তবে তল্লাশির ক্ষমতা যথাযথভাবে প্রয়োগ না হলে ব্যবসায়ীদের হয়রানি বাড়বে, যা ব্যবসার প্রবৃদ্ধিতে বাধা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকিন আহমেদ। তিনি বলেন, দেশের বাজার কাঠামো, প্রতিযোগিতার মাত্রা ও ভোক্তার স্বার্থ সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে সঠিক প্রমাণের ভিত্তিতে প্রতিযোগিতা আইন উপেক্ষাকারী এবং বাজারে প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান শনাক্ত করতে হবে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সুবিধাভোগীদের কবল থেকে মুক্ত করে অংশগ্রহণমূলক অর্থনীতি গড়াই লক্ষ্য : প্রধানমন্ত্রী

লেবাননের ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলোতে ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে ইসরায়েল

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স ও র‍্যাংগস ইলেকট্রনিক্সের মধ্যে সমঝোতা চুক্তি

৩ দিন পর মিলল আর্জেন্টাইন ফুটবলারের স্ত্রী-সন্তানদের মরদেহ

অশ্রুসিক্ত নয়নে না বলা গল্প শোনালেন ভিনিসিয়ুস

উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম সালমান নদভী মারা গেছেন

ভারতকে টানা দুই ম্যাচে হারিয়ে ইতিহাস গড়ল আয়ারল্যান্ড

জৈব সারের নামে বর্জ্য বিতরণ, কৃষি কর্মকর্তাকে খাগড়াছড়ি বদলি

তাসকিন ও মিমের সঙ্গে ডিনারে ওয়ালটন ফ্রিজ এবং এসির ২৪ ক্রেতা

পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহায়তাকারী যুবকের মরদেহ মিলল ময়লার স্তূপে

১০

স্যাটেলাইটের ছবিতে দেখুন ভেনেজুয়েলার ভূমিকম্পের পূর্বাপর অবস্থা

১১

বিধ্বস্ত ভেনেজুয়েলার পাশে দাঁড়ালেন নেইমার

১২

৪৭তম বিসিএসে ২১৬৭ ক্যাডার পদ শূন্য, কারণ জানাল পিএসসি

১৩

এমপি হওয়ার পর জীবন উপভোগের সুযোগ মেলেনি: মাহমুদা মিতু

১৪

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসা নীতিতে বাংলাদেশিদের জন্য কড়াকড়ি

১৫

‘আমি যদি মরিই, তবে নিজের দেশেই মরব’

১৬

ক্রীড়াঙ্গনে আনসার-ভিডিপির অবদান : সংবর্ধনা ও প্রাইজমানি পেলেন ২৩ খেলোয়াড়

১৭

দুর্নীতি প্রতিরোধে এবার ইউনিয়ন পর্যায়েও কমিটি গঠন

১৮

গ্রিন কার্ড আবেদনের নিয়মে পরিবর্তন আনল যুক্তরাষ্ট্র

১৯

কিশোরী প্রেমিকার ছুরিকাঘাতে যুবক নিহত

২০
X