

বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত তিন মাসে দেশের ৩০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য (ভিসি) পদে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর বাইরে এরই মধ্যে আরও ১৩টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপ-উপাচার্যসহ (প্রো-ভিসি) কয়েকটি ট্রেজারার পদে নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া এই শীর্ষ পদধারীদের শিগগির বাদ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। দায়িত্বের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ঢালাওভাবে এই নিয়োগ বাতিলের কারণে বিগত সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া ভিসি ও প্রো-ভিসিদের মধ্যে তৈরি হয়েছে অস্বস্তি ও অনিশ্চয়তা। এর প্রভাব পড়ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রমেও। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দাপ্তরিক কাজে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। পদ রক্ষায় তারা দৌড়ঝাঁপ করছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতা, মন্ত্রী-এমপি, সচিবালয় এবং নীতিনির্ধারণী মহলে। তুলে ধরছেন নিজেদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ড ও অর্জনের ফিরিস্তি। একইভাবে নতুন করে পদ পেতেও ওইসব জায়গায় ধরনা দিচ্ছেন বিএনপিপন্থি শিক্ষকরা। অন্যদিকে সাম্প্রতিক নিয়োগগুলোতে দলীয় বিবেচনাকে প্রাধান্যের পাশাপাশি বিতর্কিত ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এসব অভিযোগে এরই মধ্যে দুজন ভিসির নিয়োগ বাতিল করেছে সরকার। শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ প্রশাসনিক পদে ঘন ঘন রদবদল একাডেমিক পরিবেশের জন্য ইতিবাচক নয়। ভিসি, প্রো-ভিসি ও ট্রেজারার নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও প্রশাসনিক দক্ষতাকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সেই আমলে ভিসি, প্রো-ভিসিসহ শীর্ষ পদে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকরা আন্দোলন ও তোপের মুখে একের পর এক পদত্যাগ করেন। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নানা যাচাই-বাছাই শেষে শীর্ষ পদে নিয়োগ দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। তবে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর তারা পরিবর্তন শুরু করে। ৯ মার্চ বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) এবং ১৬ মার্চ একযোগে ঢাকা, জগন্নাথ, কুয়েটসহ আটটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন ভিসি নিয়োগ দেয় সরকার। এ ছাড়া গত ১৪ মে এক দিনেই ১১টি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন ভিসি নিয়োগ দেওয়া হয়। এর বাইরে বিচ্ছিন্নভাবে প্রতি সপ্তাহেই ভিসি, প্রো-ভিসি নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালেয়ে দুজন প্রো-ভিসিসহ এরই মধ্যে অন্তত ১৩ জন প্রো-ভিসি ও কয়েকজন ট্রেজারার নিয়োগ দিয়েছে সরকার।
ইউজিসির তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৫৯টি। এর মধ্যে গতকাল বুধবার পর্যন্ত ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি পদে নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। চার বছরের জন্য একজন শিক্ষককে শর্তসাপেক্ষে ভিসি বা প্রো-ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। সেখানে একটি শর্ত থাকে—রাষ্ট্রপতি (আচার্য) প্রয়োজন মনে করলে যে কোনো সময় এই নিয়োগ বাতিল করতে পারেন। এই শর্তের আলোকেই তাদের নিয়োগ বাতিল করা হয়।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগের জন্য সার্চ কমিটি থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি বলে দাবি করছে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকসহ টিআইবি। বরং রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন তারা। সম্প্রতি শিক্ষা খাত নিয়ে টিআইবি এক পর্যবেক্ষণে জানায়, ক্ষমতাসীন দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা একজনকে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, প্রো-ভিসি ও কোষাধ্যক্ষ নিয়োগের ক্ষেত্রে একাডেমিক যোগ্যতা ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার চেয়ে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা অপ্রয়োজনীয়। যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে তার পছন্দের লোকদেরই সিংগভাগ ক্ষেত্রে এসব শীর্ষপদে নিয়োগ দিয়ে থাকে।
গত সপ্তাহে সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে দেখা হয় বর্তমানে কর্মরত একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির সঙ্গে। তাদের অনেকেরই নিয়োগ বাতিল করা হচ্ছে—এমন খবর পেয়ে এসেছেন শিক্ষামন্ত্রীসহ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করতে। তাদেরই একজন ঢাকা বিভাগের একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি। তিনি বলেন, ‘শুনেছি আমার নিয়োগ বাতিল করা হচ্ছে। কিন্তু আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর অনেক কাজ করেছি, আবার কিছু কাজ বাকি রয়েছে। তাই অসম্পূর্ণ কাজগুলো শেষ করার সময় যাতে দেওয়া হয় সে জন্য তদবির করতে এসেছি, দেখি কী হয়।’
সিলেটের একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি বলেন, ‘আমাকে বাদ দেওয়া হবে শুনছি। আমার জায়গায় আসার জন্য একজন শিক্ষক জোরালোভাবে স্থানীয় বিএনপির এক জ্যেষ্ঠ নেতা ও মন্ত্রীদের দিয়ে তদবির করছেন। আমি থাকার আশা ছেড়ে দিয়েছি। তবে এভাবে অস্বস্তি নিয়ে কাজ করা সম্ভব নয়।’
আরেকটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমাকে যোগ্যতার ভিত্তিতে ডেকে এনে বিগত সরকার নিয়োগ দিয়েছে। আমি এই সরকারের মতাদর্শের লোক। কিন্তু তারা রাখবে কি না সেটা তাদের বিষয়। আমাকে রাখলে কাজ করব, নিয়োগ বাতিল করলে চলে যাব। এতে আমার কোনো ক্ষতি হবে না। তবে ঘন ঘন এই পরিবর্তনের ফলে কাজের ব্যাঘাত ঘটে—এটা সরকারকে খেয়াল রাখতে হবে।’
দুই ভিসির নিয়োগ বাতিল, বিতর্কিতদের নিয়োগের অভিযোগ
গত ১৪ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. আনিসুর রহমানকে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) ভিসি নিয়োগ দেওয়া হয়। তার এই নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারির এক ঘণ্টা পেরোনোর আগেই তা বাতিল করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। অভিযোগ, তিনি ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক সমাজকল্যাণমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য নুরুজ্জামান আহমেদের বোনজামাই। যদিও পরে তাকে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আবার এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদের মেয়ে ড. দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীনকে। এই নিয়ে চলছে বিতর্ক।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আমির হোসেন ভূঁইয়াকে ১৪ মে জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল সরকার। সে হিসেবে ১৬ মে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে যোগদানও করেন তিনি। তবে তার নিয়োগের ২৩ দিনের মাথায় গত ৬ জুন তাকে অব্যাহতি দিয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৌলিতত্ত্ব ও উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের অধ্যাপক মো. আমির হোসেনকে ওই বিশ্ববিদ্যালয়টির ভিসি নিয়োগ দেওয়া হয়। আমির হোসেন ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ এবং গবেষণাপত্রে জালিয়াতির দায়ে সাময়িক বরখাস্ত হওয়ায় সমালোচনার মুখে তার নিয়োগ বাতিল করা হয়। এ ছাড়া ওই দিন ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (ডুয়েট) ভিসি হিসেবে নিয়োগ পান সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ ইকবাল। পরদিন তিনি ক্যাম্পাসে এলে তাকে প্রবেশ করতে দেয়নি বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীদের একাংশ। এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের কয়েকদিন দফায় দফায় সংঘর্ষে অচল ছিল পুরো ক্যাম্পাস। পরিস্থিতি শান্ত হলে ২১ মে তিনি ক্যাম্পাসে আসেন। এ ছাড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি পদে বিজ্ঞান বা প্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট বিজ্ঞজনের নিয়োগ দেওয়ার কথা থাকলেও একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ বিভাগের শিক্ষককে ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এসব বিষয় নিয়ে রয়েছে নানা সমালোচনা-বিতর্ক।
শিক্ষাবিদ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ বলেন, রাজনৈতিক ও দলীয় আনুগত্যের বিবেচনায় ভিসি নিয়োগ দেওয়ার একটি রীতি চলে আসছে। এর পরিবর্তন আশা করেছিলাম। কিন্তু তা হয়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেও দলীয় ভিসি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এখনো দলীয় লোকদের ভিসি নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সরকার শিক্ষাকে অগ্রাধিকারের কথা বলছে, কিন্তু কাজকর্ম সব স্ববিরোধী। এটা বড় সমস্যা। আসল পরিবর্তন সংস্কার কিন্তু এটা দেখতে পাচ্ছি না।
সার্বিক বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, কাকে নিয়োগ দেবে সেটা তো সরকারের একান্ত বিষয়। তবে আমরা সব কিছু দেখেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভিসি নিয়োগ দিয়েছি। বিএনপি নিউলি ইলেক্টেড গভর্নমেন্ট। তারা জানে কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালনা করতে হবে।