

তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফর বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। এখনই বড় ঘোষণা না-ও আসতে পারে, তবে এ সফর শ্রমবাজার খোলার পথ অনেকটাই সুগম করতে পারে
ওবায়দুল হক
সহযোগী অধ্যাপক, ঢাবি
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আজ রোববার দুপুরে দুদিনের রাষ্ট্রীয় সফরে কুয়ালালামপুর যাচ্ছেন। তার সরকার গঠনের পর এটি প্রথম বিদেশ সফর। সফরে শ্রমবাজার, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি সহযোগিতা, হালাল অর্থনীতি, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, কৃষি, শিক্ষা, জনযোগাযোগসহ বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় বিষয় আলোচনায় আসবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সংস্কৃতিবিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারক এবং দুটি নোট অব এক্সচেঞ্জ সইয়ের কথা রয়েছে।
যদিও সফরের অন্যতম আলোচ্য বিষয় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো বলছে, দেশটির শ্রমবাজার এখনো কার্যত বন্ধ রয়েছে। ঢাকা ও কুয়ালালামপুরের বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়া ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে নতুন বিদেশি শ্রমিক নিয়োগের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। সেটি এখনো পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়নি। ফলে তারেক রহমানের সফরে শ্রমবাজার ফের খোলার বিষয়ে আলোচনা হলেও তাৎক্ষণিক কোনো কার্যকর সমাধান আসার সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিদেশি শ্রমিক কোটা পূর্ণ হয়ে যাওয়া, নিয়োগ ব্যবস্থার বিভিন্ন ত্রুটি এবং সোর্স দেশগুলোর রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর দুর্নীতি বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দায়ী। ২২ জুন দুই দেশের সরকারপ্রধানের আলোচনায় শ্রমবাজার নিয়ে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা আরও স্পষ্ট হতে পারে বলে তাদের ধারণা।
কুয়ালালামপুরের সূত্রগুলো জানায়, মালয়েশিয়ার হোম মিনিস্টার সাইফুদ্দিন নাসুশন ইসমাইলের নির্দেশে ২০২৪ সালে নতুন বিদেশি শ্রমিক নিয়োগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। বিশ্লেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশটির শ্রমশক্তির ২০ শতাংশেরও বেশি শ্রমিক। বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া ও নেপাল থেকে যাওয়া শ্রমিকদের অংশ ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ। অনেক ক্ষেত্রে চাকরি ছাড়াই শ্রমিক যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। একই সঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব, কোটা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর অনিয়ম পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের নেতৃত্বাধীন সরকারের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জও শ্রমবাজার খোলার ক্ষেত্রে বড় বাধা। পার্লামেন্টে অস্থিরতা, দলীয় বিভাজন, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে সরকার নতুন বিদেশি শ্রমিক নিয়োগের বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মী নিয়োগের বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মালয়েশিয়া সাধারণত প্রায় ১৫টি অনুমোদিত সোর্স কান্ট্রি থেকে শ্রমিক নেয়। এর মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ বাংলাদেশ থেকে, ২৪ শতাংশ ইন্দোনেশিয়া থেকে এবং ১৬ শতাংশ নেপাল থেকে নিয়োগ করা হয়। এ ছাড়া মিয়ানমার, ভারত, পাকিস্তান, ফিলিপাইনস, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, লাওস, ভিয়েতনাম, শ্রীলঙ্কা, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান ও কাজাখস্তান থেকেও শ্রমিক নেয় দেশটি। ২০২৪-২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়ায় নিয়মিত বিদেশি শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ২ দশমিক ৩ মিলিয়ন। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, অনিয়মিত শ্রমিকসহ এ সংখ্যা ৫ মিলিয়নের কাছাকাছি। তারা মূলত কৃষি, ম্যানুফ্যাকচারিং, কনস্ট্রাকশন ও সার্ভিস খাতে কাজ করেন।
বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার সর্বশেষ বড় আকারে বন্ধ হয় ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে। তবে এটি শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, সব বিদেশি শ্রমিকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য ছিল। এ কারণে ১৭ থেকে ১৮ হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক আটকে পড়েন। যাদের ভিসা বা কোটা অনুমোদিত ছিল, তাদের অনেকেই ২০২৪ সালের ৩১ মের মধ্যে মালয়েশিয়ায় প্রবেশ করতে পারেননি। এরপর নতুন নিয়োগ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের কিছু রিক্রুটিং এজেন্সির কারসাজি, উচ্চ ফি, সিন্ডিকেট, জালিয়াতি এবং চাকরি ছাড়া শ্রমিক পাঠানোর মতো বিষয়গুলোও পরিস্থিতি জটিল করেছে। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে স্বাক্ষরিত সমঝোতা অনুযায়ী চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে ২ লাখ ২০ হাজার শ্রমিক পাঠানোর লক্ষ্য থাকলেও ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রায় ৪ লাখ ৭৬ হাজারের বেশি শ্রমিক মালয়েশিয়ায় গেছেন। শুধু ২০২৩ সালেই প্রায় সাড়ে তিন লাখ কর্মী দেশটিতে যান। বর্তমানে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের ১০ লাখেরও বেশি কর্মী রয়েছেন।
এপ্রিল ২০২৬-এ দুই দেশ উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে সেক্টরভিত্তিক, স্বচ্ছ, কম খরচের ও নৈতিক নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দ্রুত শ্রমবাজার খোলার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। তবে মালয়েশিয়া এমপ্লয়ার-পে মডেল, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, স্বচ্ছতা ও সিন্ডিকেটমুক্ত প্রক্রিয়ার ওপর জোর দিচ্ছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ কালবেলাকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফর ‘অনেক সম্ভাবনাময়’। তার ভাষ্য, চীনের আগে মালয়েশিয়াকে প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য হিসেবে বেছে নেওয়া একটি কৌশলগত বার্তা। তিনি বলেন, মালয়েশিয়ায় লাখ লাখ বাংলাদেশি কর্মী রয়েছেন এবং সফরকালে শ্রমবাজার ফের খোলার বিষয়টি অবশ্যই আলোচনায় আসবে। তবে আলোচনা হলেই তাৎক্ষণিক সুফল মিলবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বাজার খুললে মালয়েশিয়া তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মী নেবে। আলোচনার মাধ্যমে বাজার খুললে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি সুবিধা হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি আরও বলেন, শুধু রাজনৈতিক কারণ নয়, কিছু অসাধু দালালচক্রও অবৈধ মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত। অনেক বাংলাদেশি অবৈধভাবে অবস্থান করছেন এবং অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষ হলেও তারা দেশে ফিরছেন না। এ ক্ষেত্রে কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ দূতাবাসের আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
কুয়ালালামপুরের একটি সূত্র জানায়, আনোয়ার ইব্রাহিমের ইউনিটি গভর্নমেন্ট ২০২২ সালের হ্যাং পার্লামেন্টের পর গঠিত বিভিন্ন জোটের ওপর নির্ভরশীল। স্থানীয় কর্মসংস্থান রক্ষা এবং জাতীয়তাবাদী দাবিকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকার বিদেশি শ্রমিকের অনুপাত চলতি বছরে ১০ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার নীতি নিয়েছে। বিরোধী ইসলামী দলগুলোর চাপ এবং দুর্নীতি দমনে ধীরগতিও সরকারের সতর্ক অবস্থানের কারণ।
এদিকে আনোয়ার ইব্রাহিমের ওপর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপও বেড়েছে। তার দল পিকেআরে ভাঙন দেখা দিয়েছে। সাবেক অর্থনীতিমন্ত্রী রাফিজি রামলি এবং সাবেক মন্ত্রী নিক নাজমি নিক আহমাদ পদত্যাগ করে পার্লামেন্ট আসন ছেড়ে পার্টি বেরসামা মালয়েশিয়ার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন। এতে পিকেআরের হাজার হাজার সদস্য নতুন দলে যোগ দিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এতে আনোয়ারের দলীয় নিয়ন্ত্রণ ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। যদিও নির্বাচন ২০২৮ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে হওয়ার কথা, রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও স্ন্যাপ নির্বাচনের সম্ভাবনায় চলতি বছরের শেষভাগ বা আগামী বছরের শুরুতেই ভোট হতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ওবায়দুল হক বলেন, তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফর বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। তিনি বলেন, মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশিরা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠান এবং দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্কও শক্তিশালী। শ্রমবাজার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরাসরি সরকারপ্রধান পর্যায়ের সফর ও দ্বিপক্ষীয় আলোচনার বিশেষ প্রভাব রয়েছে। এখনই বড় ঘোষণা নাও আসতে পারে, তবে এই সফর শ্রমবাজার খোলার পথ অনেকটাই সুগম করতে পারে।
অন্যদিকে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, প্রধানমন্ত্রী ২১-২২ জুন মালয়েশিয়া এবং ২৩-২৬ জুন চীন সফর করবেন। মালয়েশিয়া সফরের সময় ২২ জুন তারেক রহমান ও আনোয়ার ইব্রাহিমের মধ্যে একান্ত বৈঠক হবে। পরে দুই দেশের সরকারপ্রধানের নেতৃত্বে উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দলের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
পররাষ্ট্র সচিব বলেন, বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, জ্বালানি সহযোগিতা, হালাল অর্থনীতি, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, কৃষি, শিক্ষা ও জনযোগাযোগ খাতে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হবে। পাশাপাশি মালয়েশিয়ার বিভিন্ন খাতে নতুন বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ, আসিয়ানে বাংলাদেশের যোগদান এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মালয়েশিয়ার সমর্থনের বিষয়ও উত্থাপন করা হবে। তিনি আরও জানান, সাংস্কৃতিক বিনিময় ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে দুটি দলিল সইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।চীন সফর প্রসঙ্গে আসাদ আলম সিয়াম বলেন, দুই দেশের মধ্যে ১৫ থেকে ১৭টি সমঝোতা স্মারক বা চুক্তি সই হতে পারে। এর মধ্যে ১৩টি সমঝোতা স্মারক, দুটি চুক্তি, একটি কর্মপরিকল্পনা এবং একটি প্রটোকল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।