

প্রাথমিকের মতো মাধ্যমিক বিদ্যালয়েও শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া কমাতে চালু হচ্ছে মিড ডে মিল এবং স্কুল ড্রেস বিতরণ কর্মসূচি। মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের জন্য ৩ হাজার ৫০২ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘কমবাইন্ড স্টুডেন্টস ফ্যাসিলিটিস প্রোগ্রাম ইন সেকেন্ডারি এডুকেশন’ শিরোনামে একটি স্কিম হাতে নিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। দেশের পিছিয়ে পড়া এক হাজার বিদ্যালয়ে প্রথম ধাপে চলতি অর্থবছরেই চালু হবে এ কর্মসূচি। এ ছাড়া এই স্কিমের আওতায় শিক্ষার্থীরা দুপুরের খাবারের পাশাপাশি বছরে দুই সেট স্কুল ড্রেস ও এক জোড়া জুতা-মোজা পাবে। সেইসঙ্গে স্কুলে এসে যাতে বিশ্রাম নিতে পারে, সেজন্য প্রতিটি বিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য আলাদা দুটি কমন রুম তৈরি করা ও স্বাস্থ্য উপকরণ সরবরাহ করা হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত করার জন্য প্রত্যেক বিদ্যালয়ে দেওয়া হবে বিশেষ বরাদ্দ। স্কিমটির মাধ্যমে প্রথম ধাপে উপকার পাবে ২ লাখ শিক্ষার্থী। শিক্ষাবিদরা বলছেন, এটি খুবই ভালো উদ্যোগ। তবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মিড ডে মিল কর্মসূচিতে বিভিন্ন স্থানে নিম্নমানের খাবার সরবরাহের অভিযোগ ওঠায় বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অনেক শিক্ষককে খাবারের মান তদারকিতে বাড়তি চাপ সামলাতে হচ্ছে। তাই মাধ্যমিক পর্যায়ে এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা, মান নিয়ন্ত্রণ ও কার্যকর তদারকির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
মাউশি সূত্র বলছে, জাতীয় নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে এ স্কিম চালু হচ্ছে। এর জন্য সেকেন্ডারি এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের (এসইডিপি) আওতায় এ স্কিমটি বাস্তবায়ন করা হবে। এরই মধ্যে আন্তঃমন্ত্রণালয় পর্যালোচনা সভায় স্কিমটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে স্কিম দলিল তৈরি চূড়ান্তের পথে। শিগগির এ স্কিম চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার কথা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মাধ্যমিক শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্তি এবং ধরে রাখার হার বাড়াতে অনুকূল পরিবেশ তৈরির জন্যই মূলত এ স্কিমটি হাতে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং নেতৃত্বের গুণাবলির সমন্বিত বিকাশের মাধ্যমে দক্ষ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা, স্বাস্থ্যসম্মত শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা প্রধান কাজ।
তারা আরও বলছেন, স্কুল ড্রেস ও মিড ডে মিলের পাশাপাশি কমন রুম তৈরির কারণ হলো আমাদের দেশের বিদ্যালয়গুলোয় অনেক দূর থেকে শিক্ষার্থীরা আসে। অনেক সময় বৃষ্টিতে ভিজে যায় আবার কখনো দূর থেকে হেঁটে এসে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তাই স্কুলে এসে যাতে একটু বিশ্রাম নিতে পারে, সেজন্য কমনরুম তৈরি করা হয়েছে। আর সরকার আনন্দময় শিক্ষার পাশাপাশি ডিভাইস-নির্ভরতা কমাতে সুস্থ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে চায়। এজন্য খেলাধুলা ও সংস্কৃতিতে জোর দেওয়া হয়েছে। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের কিছু নির্ধারিত ক্লাসে খেলাধুলা ও সংস্কৃতি নিয়ে আলাদা বই থাকছে।
সূত্রমতে, সরকারের সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে এ প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে পাঁচ বছর। অর্থাৎ চলতি জুলাই থেকে ২০৩১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত এ প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজ চলবে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে পিছিয়ে পড়া, প্রান্তিক ও দুর্গম এলাকার এক হাজারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দেওয়া হবে দুপুরের খাবার। জনপ্রতি একজন শিক্ষার্থীর খাবারের পেছনে প্রতিদিন খরচ হবে ১২০ টাকা। এতে মোট খরচ হবে ২ হাজার ৮৭২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। আর এসব স্কুলের প্রতি শিক্ষার্থীকে ৪ হাজার টাকা দামে বছরে দেওয়া হবে দুই সেট স্কুল ড্রেস, আর দেড় হাজার টাকা দামের এক জোড়া জুতা ও মোজা। এতে পাঁচ বছরে স্কুলে ড্রেসের পেছনে ৪১৬ কোটি ৩২ লাখ টাকা, জুতা-মোজার পেছনে ব্যয় হবে ১৫৬ কোটি ১২ লাখ টাকা। বাকি টাকা খরচ হবে কমনরুম, স্বাস্থ্য উপকরণ, খেলাধুলা ও সংস্কৃতিসহ আনুষঙ্গিক খাতে। তবে এসব বরাদ্দ অনুমান করে ধরা হয়েছে, তা বাড়তে বা কমতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্কিমটির অগ্রগতি প্রসঙ্গে মাউশির পরিকল্পনা ও উন্নয়ন উইংয়ের পরিচালক প্রফেসর ড. মীর জাহীদা নাজনীন কালবেলাকে বলেন, স্কিমটির খসড়া তৈরি করা হয়েছে। শিগগির আরেকটি ওয়ার্কশপের মাধ্যমে তা চূড়ান্ত হবে। এরপর অনুমোদন পেলে কার্যক্রম শুরু হবে।
মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দীন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, আমরা ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বা আনন্দময় শিক্ষা নিশ্চিত করতে চাই। এর জন্য স্কুল ড্রেস, দুপুরে মানসম্মত খাবার, বিশ্রামের জন্য আলাদা রুম ও স্বাস্থ্য উপকরণ দেওয়া হবে। যাতে শিক্ষার্থীরা উৎসাহ নিয়ে হাসিমুখে স্কুলে আসে। প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনি ইশতেহারের ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে এ স্কিমটি নেওয়া। আশা করছি সব ঠিক থাকলে দ্রুত তা অনুমোদন পাবে।
প্রাথমিকে চালু আছে মিড ডে মিল, স্কুল ড্রেস বিতরণ শুরু ১৫ আগস্ট
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর গত বছরের ১৫ নভেম্বর শুরু হয় প্রাথমিকের মিড ডে মিল বা স্কুল ফিডিং কার্যক্রম। ওইদিন নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার খুবজীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল ফিডিং কর্মসূচির উদ্বোধন করেন তৎকালীন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই) সূত্র জানায়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় প্রথম মেয়াদে ১৫০টি উপজেলার ১৯ হাজার ৪১৯টি বিদ্যালয়ের স্কুল ফিডিং কার্যক্রম চলছে। এতে উপকারভোগী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩১ লাখ ৩০ হাজার। এ ছাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ১ কোটি ৭ লাখ শিক্ষার্থীর জন্য ধাপে ধাপে ইউনিফর্ম ও জুতা সরবরাহের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার।
অন্যদিকে আগামী ১৫ আগস্ট শিক্ষার্থীদের স্কুল ড্রেস ও জুতা বিতরণ কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, পাইলট প্রকল্পের আওতায় প্রত্যেক শিক্ষার্থী প্রতি শ্রেণিতে এক সেট স্কুল ড্রেস, একজোড়া জুতা এবং একটি স্কুলব্যাগ পাবে। তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ শিক্ষার্থীর জুতাসহ ড্রেস দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য একই ধরনের পোশাক নির্ধারণ করা হয়েছে। ছেলেদের জন্য হালকা নীল জামা ও গাঢ় নীল হাফপ্যান্ট এবং মেয়েদের জন্য আকাশি রঙের ফ্রক বা টিউনিক নির্ধারণ করা হয়েছে। সবার জন্য থাকবে সাদা জুতা ও সাদা মোজা। ব্যাগ তৈরি করা হবে পাট দিয়ে, যাতে দেশীয় পণ্যের ব্যবহারও উৎসাহিত হয়।
প্রথম ধাপে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগের নির্বাচিত ২৫টি উপজেলার প্রথম শ্রেণির মোট ৯৯ হাজার ৮৮৩ শিক্ষার্থী বিনামূল্যে ড্রেস, জুতা ও ব্যাগ পাবে। এর মধ্যে ছাত্র ৪৭ হাজার ২০২ জন এবং ছাত্রী ৫২ হাজার ৬৮১ জন।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাখাওয়াৎ হোসেন বলেন, ১৫ আগস্ট স্কুল ড্রেস বিতরণের প্রাথমিক তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথমধাপে আমরা তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ শিক্ষার্থীকে জুতাসহ স্কুলড্রেস দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। এ ড্রেসগুলো আমরা বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা থেকে অনুদান হিসেবে পাচ্ছি। তবে আমরা চলতি অর্থবছরেই সরকারিভাবে ড্রেস কেনা শুরু করব।
সার্বিক বিষয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ বলেন, এসব খুবই ভালো উদ্যোগ। তবে মিড ডে মিলের বিষয়ে চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যাতে শিক্ষার্থীরা মানসম্মত খাবার পায়, আবার শিক্ষকদের ওপর চাপ সৃষ্টি না হয়। স্কুল ইউনিফর্মের মানও নিশ্চিত করতে হবে। এসবের পাশাপাশি আমাদের কারিকুলামকে যুগপোযোগী করতে হবে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, বর্তমানে অন্যতম বড় সমস্যা হচ্ছে শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতি। অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসে না। এ সমস্যার সমাধানে শিক্ষার্থীদের জন্য ইউনিফর্ম, জুতা ও স্কুলব্যাগ দেওয়ার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এতে বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।