রোকন উদ্দীন
প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১১ জুলাই ২০২৬, ১০:২০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

চাষের মাছে বাড়ছে আশা, ফিরছে সুদিন

অভ্যন্তরীণ মৎস্য চাষ
চাষের মাছে বাড়ছে আশা, ফিরছে সুদিন

বাংলাদেশের মৎস্য খাতে আশাজাগানিয়া চিত্র লক্ষ করা গেছে বিগত এক দশকে। অভ্যন্তরীণ মৎস্য চাষ এবং উৎপাদনে এসেছে অভাবনীয় সাফল্য, যা দেশের মানুষের আমিষের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে দেশে সামগ্রিক মাছের উৎপাদন বেড়েছে ৩১ শতাংশ। মাছ উৎপাদনের অন্যতম উৎস প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে উৎপাদন বেড়েছে ৩৭ শতাংশ। এ ছাড়া চাষের মাছের উৎপাদন বেড়েছে ৪০ শতাংশের বেশি। তবে উল্টো পথে হাঁটছে সামুদ্রিক মাছ উৎপাদন। সমুদ্র থেকে মাছ উৎপাদন কমেছে প্রায় ১০ শতাংশ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাছের অভয়ারণ্য তৈরি করা, বিভিন্ন সময় নিষেধাজ্ঞা দেওয়াসহ নানা কারণে সাধু পানির মাছ উৎপাদন বেড়েছে। এ ছাড়া ইজারার ধরন পাল্টানোর কারণেও খালবিলের মাছ উৎপাদন বেশি হয়েছে। তারা বলছেন, যারা বিল ইজারা নিচ্ছেন, তারা নিজেদের লাভের জন্যই মাছের পোনা ছাড়েন, খাবার দেন। এতে মাছগুলো প্রাকৃতিক উপায়ের চেয়ে একটু দ্রুত বেড়ে ওঠে। এ ছাড়া চাষের মাছের উৎপাদন বাড়ার মূল কারণ বলছেন—চাহিদা বৃদ্ধি। দেশে সস্তা আমিষের চাহিদা বাড়তে থাকায় চাষের মাছের বিক্রিও বেড়েছে। এতে লাভের আশায় অনেকে খামার গড়ে তুলেছেন।

তবে সমুদ্রের মাছ কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে জলবায়ুর পরিবর্তনকে দায়ী করছেন তারা। মৎস ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণায়ের গবেষণা কর্মকর্তারা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রায়েই সাগর উত্তাল থাকে। মাছের স্থান পরিবর্তন হয়। ফলে সমুদ্রে মাছের উৎপাদন আগের মতো হচ্ছে না।

দেশে আমিষের চাহিদা পূরণের বড় উৎসগুলোর মধ্যে মাছ অন্যতম। সাধারণত তিনটি উৎস থেকে মাছের জোগান পাওয়া যায়। প্রাকৃতিক উৎস থেকে সব ধরনের মাছই পাওয়া যায়। তবে চাষের মাছের সংখ্যা সীমিত। দেশে সাধারণত রুই, কাতল, মৃগেল, কার্প, চিংড়ি, গুলশা, বোয়াল, সিং, কই, মাগুরসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ করা হয়। এ ছাড়া সমুদ্র থেকে ইলিশ, টুনা, কোরাল, রূপচাঁদা, পোয়া, ইন্ডিয়ান স্যামন, লইট্টাসহ বেশ কয়েক ধরনের মাছ পাওয়া যায়। প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় টুনা মাছ আহরণের হিসাব রাখছে ২০২০-২১ সাল থেকে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রকাশিত ‘দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার ২০২৬’ প্রতিবেদন অনুসারে, বিশ্বে স্বাদু পানির মাছ উৎপাদনের কেন্দ্র ক্রমেই এশিয়ার দিকে এগিয়ে আসছে। প্রতিবেদন অনুসারে, মাছসহ জলজ প্রাণী উৎপাদন বা চাষে বিশ্বে পঞ্চম স্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। আর অভ্যন্তরীণ জলাশয় থেকে মাছ আহরণে বাংলাদেশের ওপরে ভারত ছাড়া কেউ নেই। বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে মাছ চাষে বড় ধরনের এ অগ্রগতি এসেছে, যা অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, দেশের জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মৎস্য খাতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ২ দশমিক ৮১ শতাংশ।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুসারে, গত ১০ বছরে দেশে মাছের মোট উৎপাদন ৩১ দশমিক ৭৯ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশে মোট মাছের উৎপাদন ছিল ৩৮ লাখ ৭৮ হাজার ৩২৪ মেট্রিক টন। এ ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ৫১ লাখ ১১ হাজার ৪৯৭ মেট্রিক টনে। অর্থাৎ এক দশকে দেশে মাছের বার্ষিক উৎপাদন বেড়েছে ১২ লাখ ৩৩ হাজার ১৭৩ মেট্রিক টন।

মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির মূল কারণ হিসেবে দেশে চাষের মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিকেই দেখছেন কর্মকর্তারা। ২০১৫-১৬ সালে দেশে চাষের রুই, কাতলা, পাঙাশ, তেলাপিয়া, চিংড়িসহ বিভিন্ন মাছের উৎপাদন ছিল ২২ লাখ টনের বেশি। ২০২৪-২৫ সালে এ উৎপাদন দাঁড়য়েছে ৩১ লাখ টনের বেশি। এ হিসেবে চাষের মাছের বার্ষিক উৎপাদন বেড়েছে ৪১ শতাংশ।

এ ছাড়া নদী-খাল-বিল থেকেও মাছের আহরণ বেড়েছে। গত ১০ বছরে প্রাকৃতিক উৎস থেকে মাছের আহরণ বেড়েছে ৩৭ শতাংশ। ২০১৫-১৬ সালে দেশে নদীনালা, খালবিল থেকে মাছের আহরণ ছিল ১০ লাখ ৪৮ হাজার মেট্রিক টন, ২০২৪-২৫ সাল শেষে এ উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ১৪ লাখ ৩৬ হাজার মেট্রিক টনে।

তিনটি উৎসের মধ্যে দুটিতেই অভাবনীয় সাফল্য এলেও মাছ আহরণে সমুদ্রকে কাজে লাগানো যায়নি। দেশে ২০২০-২১ সাল থেকে টুনার হিসাব যোগ করেও সামুদ্রিক মাছ আহরণের হিসাব বাড়াতে পারিনি। গত ১০ বছরে সামুদ্রিক মাছের উৎপাদন কমেছে প্রায় ১০ শতাংশ।

মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশে সামুদ্রিক মাছের উৎপাদন ছিল ৬ লাখ ২৬ হাজার মেট্রিক টনের কিছু বেশি। কিন্তু ২০২৪-২৫ সালে সামুদ্রিক মাছের উৎপাদন কমে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৬৮ হাজার মেট্রিক টনে।

সামুদ্রিক মাছের মধ্যে ইলিশ, রূপচাঁদাসহ জনপ্রিয় মাছগুলোর উৎপাদন বছরে ৩০০ থেকে ১ হাজার টন করে কমেছে। বছর দশেক আগে সমুদ্র থেকে ইলিশের উৎপাদন ছিল বছরে ২ লাখ ৫৫ হাজার মেট্রিক টন। তবে বর্তমানে তা ২ লাখ ৫০ লাখ টনে নেমেছে।

এ ছাড়া অন্যান্য সামুদ্রিক মাছের আহরণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৬৫ হাজার ১২০ মেট্রিক টন। তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা ৪৮ শতাংশের (৪৮ দশমিক ৪৭ শতাংশ) বেশি কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৮৫ হাজার ৭৩ মেট্রিক টনে। এ বিশাল ঘাটতি সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদের টেকসই আহরণ নিয়ে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

জানতে চাইলে মৎস্যসম্পদ জরিপ শাখার উপপরিচালক মনিষ কুমার মণ্ডল বলেন, ‘আমাদের হাওড়ের মাছের উৎপাদন বেড়েছে। এ ছাড়া রুই, কাতলা, তেলাপিয়া, পাঙাশসহ বিভিন্ন জাতের মাছ চাষ হচ্ছে। এমনকি কই, গুলশা, পাবদা, শিং মাছের মতো দেশীয় প্রজাতির মাছেরও চাষ হচ্ছে এখন। ফলে সার্বিকভাবে স্বাদুপানির মাছ উৎপাদন বেড়েছে। সরকার জরিপ মডিউল পরিবর্তন, টুনা মাছের গবেষণা, মাছ আহরণের সময় নির্ধারণসহ বেশি কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। আশা করা যায়, সামনের দিনগুলোয় সমুদ্রসহ সব ধরনের মাছের উৎপাদনই বাড়বে।’

পাঙাশের উৎপাদন কমে বাড়ছে রুই-কাতলায়

চাষের মাছের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে। গত ১০ বছরে পাঙাশ মাছের উৎপাদন ৫ লাখ ৪ হাজার ৬৭৪ মেট্রিক টন থেকে কমে ৪ লাখ ৩৫ হাজার ৪৪৮ মেট্রিক টনে নেমে এসেছে। বিপরীতে রুই, কাতলা ও মৃগেলসহ বড় কার্পজাতীয় মাছের উৎপাদন ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৫-১৬ সালে রুই জাতীয় মাছের উৎপাদন যেখানে ছিল ৭ লাখ ৫০ হাজার ৮৮০ মেট্রিক টন, ২০২৪-২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ৮২ হাজার ১৮ মেট্রিক টনে। মৎস্য বিজ্ঞানীরা বলছেন, পাঙাশ মাছ তুলনামূলকভাবে খাদ্য খায় বেশি। ফলে এ মাছ চাষ করলে কৃষকের বড় অঙ্কের মূলধন প্রয়োজন হয়। একই সঙ্গে মূনাফার হারও কম। অন্যান্য মাছে ৫০ টাকা বিনিয়োগ করলে তা থেকে ১০০ টাকা পাওয়া যায়। কিন্তু পাঙাশে পাওয়া যাবে ৮০ টাকার কম।

আশা জাগাচ্ছে টুনার আহরণ

সামুদ্রিক মৎস্য খাতের সার্বিক চিত্র নেতিবাচক হলেও আশার আলো দেখাচ্ছে টুনা মাছের আহরণ। গভীর সমুদ্রে টুনা আহরণে সরকারি ও বেসরকারি নানা উদ্যোগের সুফল পাওয়া যাচ্ছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশে টুনা ও টুনা সদৃশ মাছের উৎপাদন ছিল মাত্র ৪ হাজার ৬২২ মেট্রিক টন। ২০২০-২১ সালে এ উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ২২ হাজার টনে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কয়েকগুণ বেড়ে ২৬ হাজার ৬২৩ মেট্রিক টনে উঠেছে। টুনার এ ক্রমবর্ধমান উৎপাদন সুনীল অর্থনীতি বা ব্লু ইকোনমিতে বাংলাদেশের সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচন করছে।

সরকার টুনা মাছের গবেষণায় বিনিয়োগ করছে। এরই মধ্যে টুনা মাছ গবেষণায় একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাদের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে এ সমুদ্রসম্পদ আহরণ ও রপ্তানির উদ্যোগ নেবে সরকার।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

কৃষি কাজে ব্যবহার করা প্যারাকুয়াট নিষিদ্ধ করছে ভারত

দলিল লেখক হত্যা মামলায় দুজনের মৃত্যুদণ্ড, ১০ জনের যাবজ্জীবন

যাত্রীবেশে নারীকে কুপিয়ে ছিনতাই, হোতাসহ গ্রেপ্তার ২

ভারতের চেয়ে বাংলাদেশের পাট উন্নত: ভারতের কৃষিমন্ত্রী

স্থানীয় নির্বাচন / এবার মাঠকর্তাদের ভোটকেন্দ্র ঠিক করতে বলছে ইসি

ইন্ডাস্ট্রি বাদ দিলেও হার মানেননি গোবিন্দ

‘‎সড়কে ইজিবাইক বন্ধ করলে বাস চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হবে’ 

সুনামগঞ্জে অবৈধ বালু উত্তোলনে নিষেধাজ্ঞা

মানব পাচার ও প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে নতুন আইন কার্যকর হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

খালে গোসল করতে নেমে প্রাণ গেল মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর

১০

রাজধানীতে শিক্ষার্থীদের ফের সড়ক অবরোধ

১১

বিআইএন নিবন্ধন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে এনবিআরের চিঠি

১২

বন্যা মোকাবিলায় সরকার সমন্বিতভাবে কাজ করেছে: ত্রাণমন্ত্রী

১৩

বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসনে কাজ করছে সরকার: ত্রাণমন্ত্রী

১৪

হত্যা মামলায় ফের গ্রেপ্তার সাবেক সচিব জিয়াউল 

১৫

যৌন নিপীড়ন মামলায় ৫৬ লাখ ডলারের বেশি ক্ষতিপূরণ দিলেন ট্রাম্প

১৬

রাতারাতি ঢাকাকে বদলানো সম্ভব নয়, মেয়র-প্রশাসকও অসহায়: মির্জা ফখরুল

১৭

ব্যাংক খাতে সন্দেহজনক লেনদেন বেড়েছে ৭৪ শতাংশ

১৮

জীবনানন্দের ‘মাল্যবান’ থেকে মঞ্চে ‘সম্‌+সার’

১৯

নরসিংদীতে শিশুর পা মুচড়ে দেওয়ার ঘটনায় মামলা, গ্রেপ্তার ২

২০
X