

স্প্যানিশ গিটার সুরে বাজলে মুগ্ধ না হয়ে উপায় থাকে না। ফরাসি সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়লেও একই অবস্থা হয়। স্প্যানিশ গিটারের মতোই সুরে বাজছে স্পেনের ফুটবলও। অন্যদিকে বল পায়ে মন ভোলানো সৌরভ ছড়িয়ে যাচ্ছেন কিলিয়ান এমবাপ্পেরা। টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠেছে দুবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স। এবার তাদের সামনে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেন। টেক্সাসের ডালাসে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই মহারণের বিজয়ী দল ফাইনালে মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা অথবা ইংল্যান্ডের। এই তথ্যটুকু পাশে সরিয়ে রেখে আজ সেমিফাইনাল নিয়ে লিখতে বসলে সে ছবিটাই ভেসে উঠছে মনের কোণে—যেখানে রঙের অভাব নেই। বৈচিত্র্যের বিপুল তরঙ্গে কত সব চরিত্র। একপাশে মহান এমবাপ্পে। অন্য পাশে তরুণ লামিনে ইয়ামাল।
দুই দলের দুই বড় নামের চারপাশে আরও অন্তত চারটি নাম এক নিশ্বাসে উচ্চারণ করতে পারবেন যারা প্রতিভার প্রাচুর্য নিয়ে একার পায়ে ম্যাচে ভাগ্য গড়ার ক্ষমতা রাখেন। বিশ্বকাপজুড়ে এখন পর্যন্ত অসাধারণ ফুটবল খেলেছে দিদিয়ের দেশমের দল। গ্রুপ ‘আই’-এ টানা ছয়টি ম্যাচ জিতে শীর্ষস্থান নিশ্চিত করার পর নকআউট পর্বে সুইডেন, প্যারাগুয়ে ও মরক্কোকে বিদায় করেছে তারা। পুরো টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত ১৬টি গোল করেছে ফ্রান্স, আর নকআউট পর্বে একটিও গোল হজম করেনি।
প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ১-০ ব্যবধানে জয় দেখিয়েছে কঠিন পরিস্থিতিতেও ফল বের করে আনার সক্ষমতা। আর মরক্কোর বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানে জয়ে ছিল তাদের পূর্ণ আধিপত্য। যদিও সেই ম্যাচে কিলিয়ান এমবাপ্পে একটি পেনাল্টি মিস করেন, পরে একটি গোল এবং উসমান দেম্বেলের গোলে সহায়তা করে দলকে সেমিফাইনালে তুলতে বড় ভূমিকা রাখেন। রিয়াল মাদ্রিদের এই তারকা এবারও দলের সবচেয়ে বড় ভরসা। বিশ্বকাপে নিজের ২৬তম ম্যাচে মাঠে নামতে যাওয়া দেশম বিদায়ের আগে আরেকটি ফাইনাল নিশ্চিত করতে চান।
অন্যদিকে স্পেন টুর্নামেন্ট শুরু করেছিল কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র দিয়ে। তবে এরপর ম্যাচ যত গড়িয়েছে, ততই নিজেদের সেরা রূপে ফিরেছে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল। নকআউট পর্বে তারা প্রথমে অস্ট্রিয়াকে ৩-০ এবং পরে পর্তুগালকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে। শেষ আটে বেলজিয়ামের বিপক্ষে প্রথমবারের মতো গোল হজম করলেও ২-১ ব্যবধানে জিতে সেমিফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করে। এটি স্পেনের ইতিহাসে মাত্র দ্বিতীয় বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল এবং ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় শিরোপা জয়ের পর প্রথমবার শেষ চারে ওঠা।
বলা হয়েছিল না, দুই দলে প্রতিভার অভাব নেই। মাত্র ২৭ বছর বয়সে বিশ্বকাপে এরই মধ্যে ২০ গোল করেছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। ফলে লিওনেল মেসির ২১ গোলের রেকর্ড ছুঁতে তার প্রয়োজন মাত্র একটি গোল। যদিও এমবাপ্পের কাছে ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়ে দলের সাফল্যই বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তবুও এই অবিশ্বাস্য কীর্তিকে আরও সমৃদ্ধ করার সুযোগ রয়েছে তার সামনে। অন্যদিকে স্পেনের মিডফিল্ডার মিকেল মেরিনো বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে বদলি নেমে দুটি নকআউট ম্যাচের জয়সূচক গোল করেছেন। বেলজিয়ামের বিপক্ষে ইনজুরি সময়ের সেই গোলের পর এবারও ফ্রান্সের বিপক্ষে বেঞ্চ থেকে নেমে পার্থক্য গড়ে দেওয়ার আশা থাকবে তার ওপর। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, নকআউট পর্বে এখন পর্যন্ত ফ্রান্সের কোনো বদলি খেলোয়াড় সরাসরি কোনো গোলে অবদান রাখতে পারেননি। ২০১৮ সালের বিশ্বকাপের পর থেকে বড় টুর্নামেন্টে স্পেন ২৭ ম্যাচের মধ্যে মাত্র একটিতে হেরেছে। সর্বশেষ ১৪টি ম্যাচে তারা অপরাজিত থেকেছে এবং ৯টি ম্যাচে ক্লিন শিট রেখেছে। লুইস দে লা ফুয়েন্তের অধীনে স্পেন শেষ ১০ ম্যাচে ফ্রান্সকে ৭ বার হারিয়েছে। ইউরো ২০২৪-এর সেমিফাইনালে তারা ফ্রান্সকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়েছিল। এরপর ২০২৫ উয়েফা নেশনস লিগের রোমাঞ্চকর ফাইনালেও ৫-৪ ব্যবধানে জয় পায় স্পেন। তবুও যুক্তরাজ্যের বেশিরভাগ শীর্ষ বুকমেকারদের চোখে এই ম্যাচে ফেভারিট ফ্রান্স। স্পেনের জয়ের সম্ভাবনার অডস প্রায় ৯/৪ ধরা হয়েছে। ফ্রান্সের প্রধান কোচ দিদিয়ের দেশম এখনো সম্ভাব্য একাদশ ঘোষণা করেননি। দলে কোনো খেলোয়াড়ের চোট বা নিষেধাজ্ঞার বিষয়েও আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ কিলিয়ান এমবাপ্পেকে ঘিরে। মরক্কোর বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে গোড়ালির সমস্যার কারণে তাকে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল। যদিও সাম্প্রতিক অনুশীলনের ভিডিওতে তাকে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে এবং বেশ প্রাণবন্ত অবস্থায় দেখা গেছে। তবুও তার খেলার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ এখনো আসেনি। স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তেও এখনো সম্ভাব্য একাদশ প্রকাশ করেননি। দলে কোনো ইনজুরি বা নিষেধাজ্ঞার খবর নেই। ফলে পূর্ণ শক্তির দল নিয়েই মাঠে নামার সম্ভাবনা রয়েছে স্পেনের। তরুণ তারকা লামিনে ইয়ামালকে শুরুর একাদশে দেখা যাওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি।