

ফুটবল মাঠের কিছু নামেই যেন গতির আঁচ পাওয়া যায়—কিলিয়ান এমবাপ্পে তেমনই নাম। বিশ্বকাপজুড়ে বিছিয়ে থাকা কীর্তির তালিকা এতই সমৃদ্ধ যে, তুলনা টানতে হয় লিওনেল মেসির মতো কিংবদন্তির সঙ্গে। সেমিফাইনালে স্পেনের রক্ষণ পরিকল্পনায়ও সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত নাম বোধকরি এমবাপ্পে।
গল্পটা শুরু হোক অতীত থেকে। ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপ—উনিশ বছরের তরুণ প্রথমবার বিশ্বমঞ্চে পা রেখেই হয়ে উঠলেন চ্যাম্পিয়ন। ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে গোল করে তিনি পেলের পর প্রথম কিশোর হিসেবে বিশ্বকাপ ফাইনালে জালের দেখা পান। চার বছর পর কাতারে তো রূপকথাই লিখলেন—আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ফাইনালে হ্যাটট্রিক করে বসলেন, ১৯৬৬ সালে জিওফ হার্স্টের পর হয়ে গেলেন ফাইনালে হ্যাটট্রিক করা একমাত্র ফুটবলার। ম্যাচ ৩-৩ ড্র হয়ে টাইব্রেকারে গড়ালে ফ্রান্স শিরোপা হারায় ঠিকই, কিন্তু এমবাপ্পের নামের পাশে যোগ হয় গোল্ডেন বুট আর অবিস্মরণীয় এক রাত।
এবার বর্তমানে ফিরে আসা যাক। চলমান বিশ্বকাপে এমবাপ্পে যেন নিজের সঙ্গেই প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। সেনেগালের বিপক্ষে উদ্বোধন ম্যাচেই জোড়া গোল করে তিনি অলিভিয়ে জিরুকে টপকে হয়ে যান ফ্রান্সের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা গোলদাতা। জাতীয় দলের হয়ে গোলসংখ্যা এখন ৬৪, ১০৪ ম্যাচে। যা রিয়াল মাদ্রিদ তারকাকে ফরাসি ফুটবলের সর্বকালের শীর্ষ গোলদাতার আসনে বসিয়ে দিয়েছে। সুইডেনের বিপক্ষে জোড়া গোল, প্যারাগুয়ের বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে লক্ষ্যভেদ এবং মরক্কোর বিপক্ষে আরেকটি—এই পথ ধরে তিনি এখন সর্বকালের বিশ্বকাপ গোলদাতার তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে, শুধু মেসির পেছনে। নকআউট পর্বে তার গোল-সংশ্লিষ্টতা এখন ১৪। জয়সূচক গোলের হিসাবে তো তিনি একাই শীর্ষে—বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বাধিক আটটি ম্যাচজয়ী গোলের মালিক এখন এমবাপ্পে।
কিন্তু পরিসংখ্যানের চেয়েও বড় হয়ে ধরা দেয় নেতৃত্ব। মাঠে তিনি নিছক একজন গোলমেশিন নন, বরং দলের হৃদয়। মরক্কোর বিপক্ষে পেনাল্টি মিস করেও দ্বিতীয়ার্ধে গোল করে আর সতীর্থ উসমান দেম্বেলেকে দিয়ে গোল করিয়ে দলকে টেনে নিয়ে গেছেন সেমিফাইনালে। গত দুই বিশ্বকাপেই ৮ গোল আর দুই অ্যাসিস্ট করে ১৯৬৬ সালের পর একমাত্র ফুটবলার হিসেবে পরপর দুটি আসরে সমান কীর্তি গড়েছেন তিনি।
এমবাপ্পে থামতে রাজি নন। শিরোপার স্বাদ অজানা নয়, কিন্তু এই দলের সঙ্গে এখনো তা অধরা। সেমিফাইনালের আগে নিজেই বলেছেন, ‘আমি চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম, আবার রানার্সআপও হয়েছি, কিন্তু এই দল এখনো কিছুই অর্জন করেনি।’ কথাগুলোয় স্পষ্ট এক ক্ষুধা, যা তাকে প্রতি ম্যাচে আরও ধারালো করে তোলে। মঙ্গলবার রাতে ডালাসে স্পেনের বিপক্ষে সেমিফাইনালে নামছে ফ্রান্স, আর পরিসংখ্যানবিদদের চোখেও তারাই এগিয়ে। অপটার হিসাব অনুযায়ী ফাইনালে ওঠার ৩৭ শতাংশের বেশি সম্ভাবনা ফ্রান্সের, শিরোপা জয়ের সম্ভাবনা ৩৪ শতাংশের কাছাকাছি।
লামিন ইয়ামালের মতো নতুন প্রজন্মের প্রতিভা যখন স্পেনের জার্সিতে উজ্জ্বল, তখন এমবাপ্পে যেন সেই পুরোনো প্রজন্মের প্রতিনিধি, যিনি এখনো তারুণ্যের গতিতে ছুটছেন। বয়স সাতাশ, কিন্তু ক্ষুধাটা এখনো উনিশের। হয়তো এই বিশ্বকাপই তাকে এনে দেবে সেই অপূর্ণ স্বপ্ন—নিজের নেতৃত্বে তোলা প্রথম বিশ্বকাপ। আর যদি না-ও হয়, ইতিহাসের পাতায় নাম এরই মধ্যে এমনভাবে খোদাই হয়ে গেছে যে, ভবিষ্যতের প্রজন্ম তার গোলসংখ্যা গুনতে গুনতেই শিখবে বিশ্বকাপের ইতিহাস। প্রশ্ন একটাই থেকে যায়—মেসির রেকর্ড ছোঁয়া, নাকি ছাড়িয়ে যাওয়া, কোনটা আগে ঘটবে এমবাপ্পের ক্যারিয়ারে?