

বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে ফুটবলভক্তরা তাদের ভাগ্য ফেরাতে বিভিন্ন লোকজ আচার ও অন্ধবিশ্বাসের ওপর ভরসা রাখছেন—তথ্যটা জানার পর যারা হাসছেন, তাদের জন্য আরও মজার তথ্য রয়েছে।
আমন্ত্রণ পেলেও আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইর নিউজার্সিতে না যাওয়ার কারণও কিন্তু এই কুসংস্কার, স্থানীয়ভাবে যাকে বলা হয় ‘কাবালা’। শুধু হাভিয়ের মিলেই নন, এমন চর্চা করতেন ১৯৮৬ সালে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী দলের কোচ কার্লোস বিলার্দো। কেবল ওই কোচের নন, দেশটির অনেক মানুষের অন্ধবিশ্বাস ছিল মাঠের লড়াইয়ের চেয়ে বেশি ভূমিকা ছিল বাইরের একটি ঘটনার! কী সেই ঘটনা চলুন আগে জেনে নিই। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সমাজবিজ্ঞানী দিয়েগো মুর্জি বলছিলেন, ‘১৯৮৬ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচের সময় ড্রেসিংরুমে ফোন বেজে উঠেছিল। একজন খেলোয়াড় ফোন ধরেছিল, কিন্তু ওপাশ থেকে কেউ কোনো কথা বলেনি। বিলার্দো এটি লক্ষ করেছিলেন। আর্জেন্টিনা সেই ম্যাচ জিতেছিল বলে পরবর্তী প্রতি ম্যাচের আগে তিনি কাউকে দিয়ে ওই নম্বরে ফোন করাতেন, সেই একই খেলোয়াড়কে দিয়ে ফোনটি ধরাতেন। আগে থেকেই নিশ্চিত করতেন যেন ওপাশ থেকে কল করা ব্যক্তি কথা না বলেন।’ বাইরে থেকে এই খামখেয়ালি অভ্যাসগুলোকে অদ্ভুত মনে হলেও, যারা এগুলো পালন করছেন তাদের কাছে এটি মোটেও কোনো কৌতুক নয়। ফাইনালের উন্মাদনা যতই বাড়ছে, সমর্থকদের স্নায়ু শান্ত করতে কোনো না কোনো অবলম্বন প্রয়োজন হয়ে পড়ছে। দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশটিতে সৌভাগ্য বয়ে আনার এমন রীতিনীতি খুবই সাধারণ বিষয় এবং তীব্র মানসিক চাপ সামলাতে ‘কাবালা’ভক্তদের বেশ সাহায্য করছে—এমনটা বিশ্বাস করেন বহু সমর্থক। বুয়েনস আইরেসের আন্দ্রেস গঞ্জালেস নামক এক ভক্ত বলছিলেন, ‘ম্যাচ চলাকালে গত ম্যাচে যে ব্যক্তি যেখানে বসে খেলা দেখেছিল, সে সেখান থেকে এক চুলও নড়তে পারবে না।’ নিজেকে ‘ফুটবল আসক্ত’ বলে দাবি করা ৪৮ বছর বয়সী এই হিসাবরক্ষক বেশ দৃঢ়তার সঙ্গে বুঝিয়ে বললেন, ‘যদি খেলা দেখার মাঝে আপনি বাথরুমে যান আর ঠিক তখনই দল গোল দেয়, আমরা আপনাকে বাথরুমেই আটকে রাখব। ম্যাচ শেষ না হওয়া পর্যন্ত আপনি ওখানেই থাকবেন।’
বিক্রয়কর্মী এস্তেলা ভার্গাসের বাড়িতে ম্যাচের নিয়মগুলো একেবারে পাথরে খোদাই করা নিয়মের মতো—‘সবাই একই পোশাক পরবে, একই চেয়ারে বসবে এবং তাদের পোষা কুকুর অবশ্যই ঘরের বাইরে রাখতে হবে।’ ৬৫ বছর বয়সী এস্তেলা বলেন, ‘আমাদের কুকুর যেহেতু একটি ইংলিশ বুলডগ, তাই ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচের সময় আমরা তাকে আর্জেন্টিনার জার্সি পরিয়ে দিয়েছিলাম। স্পেনের বিরুদ্ধে ম্যাচের দিন রোদ হোক বা বৃষ্টি, তাকে ঘরের বাইরেই থাকতে হবে।’ সমাজবিজ্ঞানী দিয়েগো মুর্জি এমন চর্চা সম্পর্কে বলেন, ‘ফুটবলে আর্জেন্টাইনরা নিজেদের স্রেফ দর্শক মনে করে না, বরং তারা নিজেদের মূল চরিত্র বা খেলোয়াড় মনে করে। এই আচারগুলো সেই ভাবনারই অংশ—সৌভাগ্য ডেকে এনে এবং দুর্ভাগ্যকে দূরে তাড়িয়ে দলের জয়ের সঙ্গে নিজেকেও জড়িয়ে রাখা। ফুটবলবিশ্বে এই বিষয়টি অত্যন্ত প্রবল।’ বোকা জুনিয়র্স ও জাতীয় দলের অন্ধভক্ত ৭৪ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত লিদিয়া ওতেরো বলেন, ‘আমার সবকটি টোটকা প্রতিবারই কাজ করে। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেমিফাইনালের প্রথমার্ধে কুকুর টিভির দিকে মুখ করে বসে খেলা দেখছিল এবং আর্জেন্টিনা কোনো গোল করতে পারছিল না। তারপর দ্বিতীয়ার্ধে আমি কুকুরের মুখটি উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দিলাম এবং ঠিক তখনই ম্যাচের ভাগ্যও ঘুরে গেল!’ ২০২০ সালে প্রয়াত ফুটবল কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনা এখনো আর্জেন্টিনায় ঈশ্বরের মতো পূজনীয়। বুয়েনস আইরেসের ভিলা দেভোতো এলাকায় ম্যারাডোনার বাড়িটি এখন ভক্তদের জন্য একটি পবিত্র বেদিতে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রিয় ১০ নম্বর জার্সিধারীকে শ্রদ্ধা জানানো হয়। আবার প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স ‘জমাট’ করে দেওয়ার পুরোনো ঐতিহ্যও হারিয়ে যায়নি। ১১ বছর বয়সী মেসির পাকা ভক্ত রদ্রিগো সেরনা বলছিল, ‘আমি প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের স্টিকার নিয়ে ডিপ ফ্রিজে ভেতর রেখে দিই। আমার দাদা আমাকে এই বুদ্ধি শিখিয়েছিলেন।’