

রাজনৈতিক অঙ্গনে জোর গুঞ্জন উঠেছে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করছেন। শারীরিক অসুস্থতাকে কারণ দেখিয়ে তিনি পদত্যাগ করবেন বলে বলা হচ্ছে। এই আলোচনার বাইরে পদত্যাগের পর তার কী হবে, সে আলোচনাও উঠেছে গুরুত্বসহকারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আস্থাভাজন হিসেবে রাষ্ট্রপতি পদে নিয়োগ পেয়েছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন। এই নিয়োগের আগেও তিনি দুদকের কমিশনার, ইসলামী ব্যাংক ও এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় দুর্নীতি-লুটপাটসহ নানা অভিযোগও ওঠে। পটপরিবর্তনের পর ফ্যাসিস্ট সরকারের সুবিধাভোগী হিসেবে তার পদত্যাগের দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা মাঠে নামেন; কিন্তু তখন তার পদত্যাগে বিএনপি ও অন্তর্বর্তী সরকারের সমর্থন মেলেনি। দেশের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় তাকে বহাল রাখার পক্ষে মত দেওয়া হয়। এখন পদত্যাগের পর তার কী হয়, তা নিয়ে নানা মহলে চলছে আলোচনা।
ছাত্রনেতাদের দাবি, রাষ্ট্রপতি বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সুবিধাভোগী। তার ওই পদে থাকার কোনো অধিকার নেই। এখন ওই পদ থেকে পদত্যাগ করলে মো. সাহাবুদ্দিন কি দেশ ছেড়ে যেতে পারবেন, নাকি তার বিরুদ্ধেও মামলা হবে? তিনি কি জেলে যাবেন?—এমন নানা আলোচনা অনেকের মুখে।
বিগত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের আস্থাভাজন হিসেবে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন মো. সাহাবুদ্দিন। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। তার পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের এপ্রিলে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আমূল বদলে যায়। ওই সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন। এরপর সংসদ ভেঙে দেওয়া এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনসহ রাজনৈতিক পালাবদলের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পর্যায়ে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মো. সাহাবুদ্দিন।
গণঅভ্যুত্থানের পর তার পদত্যাগের দাবিতে বঙ্গভবন ঘেরাওসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছিল জুলাই আন্দোলনকেন্দ্রিক বিভিন্ন সংগঠন। যায়। তখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মৌখিক নির্দেশনায় বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাস ও কনস্যুলেট অফিস থেকে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের ছবি সরিয়ে ফেলা হয়। তবে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার তাকে সরানোর কোনো উদ্যোগ নেয়নি; বরং তার ওপর ভর করেই শপথ গ্রহণসহ সব কর্মকাণ্ডের বৈধতা আদায় করে নেয় অন্তর্বর্তী সরকার।
পরবর্তী সময়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। ফলে রাষ্ট্রপতি ও সরকারের রাজনৈতিক পটভূমিতে ভিন্নতা তৈরি হয়। মো. সাহাবুদ্দিন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দলটির মনোনয়নে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেও সরকার গঠনের পর বিএনপি তাকে সঙ্গে সঙ্গে সরানোর পথে যায়নি। সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই রাষ্ট্রপতির ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা ছিল। তবে সরকার বা বিএনপি প্রকাশ্যে কখনো তার পদত্যাগ দাবি করেনি।
এমনকি গতকাল বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ‘রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে গুঞ্জন তো গুঞ্জনই। যদি রাষ্ট্রপতি স্বাস্থ্যগত কারণে হোক, যে কোনো কারণে হোক পদত্যাগ করতে চান, সেই অপশন তো উনার আছে। এখানে সরকারের পক্ষ থেকে কিছু বলা হয়নি। তিনি (রাষ্ট্রপতি) স্বাস্থ্যগত কারণে পদত্যাগ করতে চেয়েছেন কি না, সেটি তাকেই জিজ্ঞেস করতে হবে।’
সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি করা নিয়ে আওয়ামী লীগের সময়েই নানামুখী আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছিল। ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ছিল। পরবর্তী সময়ে বিতর্কিত ব্যবসায়ী এস আলম গ্রুপের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতাও প্রকাশ্যে আসে। দুদকের দায়িত্ব পালন শেষে তিনি ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ভাইস চেয়ারম্যান এবং এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তখন এই দুটি ব্যাংকের মালিক ছিল আওয়ামী লীগ সরকার আমলে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গ্রুপ এস আলম। ব্যাংক দুটিতে তখন সবচেয়ে ব্যাপক লুটপাট হয়। তখন এই রাষ্ট্রপতিকে এস আলমের প্রতিনিধি বলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে আলোচনা ছিল।
ইসলামী ব্যাংকের পদে থাকা অবস্থায় মো. সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ দেয় আওয়ামী লীগ সরকার। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানা মিলে সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে আওয়ামী লীগের ভেতরে আলোচনা ছিল।
পদত্যাগের পর আইনগত দিক: সংবিধান অনুসারে, একজন রাষ্ট্রপতি স্পিকার বরাবর পদত্যাগপত্র দিতে পারেন। সংবিধানের ৫০ (৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে রাষ্ট্রপতি স্বীয় পদত্যাগ করতে পারবেন।’ পদত্যাগপত্র দেওয়ার পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত কিংবা রাষ্ট্রপতি পুনরায় কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে, ক্ষেত্রমতো রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত কিংবা রাষ্ট্রপতি পুনরায় স্বীয় কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। কত দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করতে হবে, সে বিষয়ে সংবিধানে বলা হয়েছে—মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণের ফলে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে পদটি শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে তা পূর্ণ করার জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এরপর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যবস্থা করবে। নির্বাচনে জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠান: সংবিধানের ১১৯ অনুচ্ছেদ অনুসারে নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রপতি পদের নির্বাচন অনুষ্ঠান করবে এবং রাষ্ট্রপতির পদের এবং সংসদের নির্বাচনের জন্য ভোটার তালিকা প্রস্তুত করবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মেয়াদ নিয়ে ১২৩ (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি পদের মেয়াদ অবসানের কারণে ওই পদ শূন্য হলে মেয়াদ সমাপ্তির তারিখের পূর্ববর্তী ৯০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে শূন্য পদ পূরণের জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে; (২) মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণের ফলে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে পদটি শূন্য হওয়ার পর ৯০ দিনের মধ্যে, তা পূর্ণ করার জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইনে নির্বাচন কমিশনকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠান পরিচালনা করার কথা বলা হয়েছে। আইন অনুসারে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য কমিশন সংসদ সদস্যদের আহ্বান জানিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করবে। সেই প্রজ্ঞাপনে মনোনয়নপত্র দাখিলের দিন, সময় ও স্থান; মনোনয়নপত্র পরীক্ষার দিন; প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন; এবং ভোটগ্রহণের দিন ও সময় নির্ধারিত থাকবে। তবে সংসদের অধিবেশন চলাকালীন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রয়োজন হলে কমিশন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য নির্ধারিত দিনের সাত দিন পূর্বে, স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে প্রজ্ঞাপন জারি করবে।
জেলা জজ থেকে রাষ্ট্রপতি: মো. সাহাবুদ্দিন ১৯৪৯ সালের ১০ ডিসেম্বর পাবনা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৮২ সালে তিনি বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিচার) ক্যাডারে যোগদান করেন। ১৯৯৫-৯৬ সালে বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব নির্বাচিত হন। পরে তিনি বিভিন্ন জেলায় জেলা জজের দায়িত্ব পালন শেষে শ্রম আদালতের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৬ সালে জেলা ও দায়রা জজ পদ থেকে অবসর গ্রহণের পর তিনি সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে আইন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। এরপর ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত তিনি দুদকের কমিশনার ছিলেন। পরে দুটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে থাকাকালে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পান। এরপর ওই পদ থেকে পদত্যাগ করে রাষ্ট্রপতি হন সাহাবুদ্দিন।