কালবেলা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৪ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২৬, ১২:৩৬ পিএম
প্রিন্ট সংস্করণ

জ্বালানি আমদানিনির্ভরতার খেসারত দিচ্ছেন গ্রাহক

চরম গ্যাস সংকটে আবাসিক খাত সিএনজি স্টেশনে হাহাকার
জ্বালানি আমদানিনির্ভরতার খেসারত দিচ্ছেন গ্রাহক

দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত ২২টি প্রাকৃতিক গ্যাসকূপের সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ৬১৫ মিলিয়ন ঘনফুট। এসব কূপ থেকে দৈনিক উৎপাদন করা হয় ৯০০ থেকে ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। চাহিদার বাকি অংশ, যা দৈনিক উৎপাদিত গ্যাসের প্রায় সমপরিমাণ, পূরণ করা হয় আমদানি করা এলএনজি থেকে। ফলে কোনো কারণে আমদানি ব্যাহত হলে বা এলএনজি টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে গ্যাস সংকটে পড়ে পুরো দেশ। দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাসের চাহিদা মেটাতে ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি প্রক্রিয়া শুরু হয়। কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত দুটি এলএনজি টার্মিনালের সরবরাহ সক্ষমতা ১১শ মিলিয়ন ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে টার্মিনাল থেকে ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। তবে চলতি সপ্তাহে একটি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটির ফলে গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট, যা গ্রাহকপর্যায়ে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।

পেট্রোবাংলার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত ১৮ জুলাই প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র থেকে সরবরাহ করা হয়েছে ৯২৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস, আর এলএনজি থেকে সরবরাহ করা হয়েছে ৯৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। তবে এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গত ২২ জুলাই সরবরাহ নেমে আসে ৬২১ মিলিয়ন ঘনফুটে। প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদনও কিছুটা কমে ৯০৯ মিলিয়ন ঘনফুটে এসে দাঁড়িয়েছে। ফলে সপ্তাহের ব্যবধানে সার্বিকভাবে গ্যাস সরবরাহ কমেছে অনেকটাই।

এদিকে, সময়ের ব্যবধানে দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদনও কমে আসছে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুসারে, এক বছর আগে দেশের প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদিত হয়েছিল ১০৯৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। অর্থাৎ এক বছরের মধ্যেই মোট উৎপাদন কমেছে ১৮৬ মিলিয়ন ঘনফুট। মার্কিন কোম্পানি শেভরনের অধীনে থাকা দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাসকূপ বিবিয়ানা থেকে গত বছর উৎপাদিত হয়েছিল ৯১৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস, যা এ বছরে নেমে এসেছে ৭৩৮ মিলিয়ন ঘনফুটে। এ ছাড়া আরেক বড় গ্যাসকূপ জালালাবাদের উৎপাদনও কমে এসেছে। বছরের ব্যবধানে জালালাবাদের উৎপাদন ১৩০ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমে ১২৩ মিলিয়ন ঘনফুটে এসে ঠেকেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছে, প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্রগুলোয় ক্রমান্বয়ে উৎপাদন কমে আসার প্রেক্ষাপটে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন, তা না করে আমদানির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে। ফলে আমদানি অবকাঠামোর কোনো অংশে সমস্যা দেখা দিলে গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা চাপের মুখে পড়ছে।

চরম বিপাকে গ্রাহকরা: এলএনজির এ ঘাটতি প্রভাব ফেলেছে সবক্ষেত্রেই। আবাসিক যেমন গ্যাস শূন্যতায় ভুগছে, তেমনি শিল্প খাত, কলকারখানা ও সিএনজিও গ্যাস ঘাটতির কবলে পড়েছে। বর্তমানে রাজধানীর অধিকাংশ বাসাবাড়িতে দিনের অধিকাংশ সময় গ্যাস থাকছে না। মোহাম্মদপুর, মিরপুর, বাড্ডা, রামপুরা, বনশ্রী, মৌচাক, মগবাজার এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চুলায় গ্যাস জ্বলছে না।

মোহাম্মদপুর এলাকার বাসিন্দা মো. শাহজাহান বলেন, সারা দিন চুলায় গ্যাস থাকে না। একেবারে রাত ১২টার দিকে গ্যাস আসে। তখন যাবতীয় রান্নার কাজ করে রাখতে হয়।

বাড্ডা এলাকার বাসিন্দা শিখা আক্তার বলেন, গ্যাসের সমস্যা আগেও ছিল, তবে এখন ব্যাপক আকারে বেড়েছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চুলা একেবারেই জ্বলে না। রাত ১২টার পর গ্যাস আসে। এতে করে রান্না ও খাওয়া-দাওয়ায় খুবই সমস্যা হচ্ছে। অথচ মাস শেষে ঠিকই পুরো বিল দিতে হবে।

সংকটে সিএনজি স্টেশন: গ্যাস সংকটের কবলে পড়েছে গ্যাসচালিত যানবাহনগুলো। এর মধ্যে গণপরিবহন হিসেবে বেশি বিপাকে পড়েছে সিএনজিচালিত বাহন। বুধবার রাজধানীর অধিকাংশ সিএনজি স্টেশনে সিএনজিচালিত গাড়ির বড় লাইন দেখা যায়। কিছু কিছু স্টেশনে ‘গ্যাস নেই’ নির্দেশিত সাইনবোর্ড ঝুলতে দেখা গেছে।

দীর্ঘসময় গ্যাসের জন্য অপেক্ষা কিংবা অপেক্ষা করেও গ্যাস না পেয়ে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন সিএনজিচালকরা। তারা জানান, দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা তারা উপার্জন করতে পারছেন না, যা দৈনিক ভাড়া হিসেবে জমা দিতে হয়।

এদিকে সিএনজি বিক্রিতে কমিশন বৃদ্ধি, স্বয়ংক্রিয় কমিশন সমন্বয় ব্যবস্থা চালু, অতিরিক্ত জামানত নেওয়ার প্রথা বাতিল এবং বিভিন্ন লাইসেন্স ও নবায়ন ফি কমানোর দাবিতে আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্শন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটি জানিয়েছে, ২০১৫ সাল থেকে কমিশন অপরিবর্তিত থাকলেও বিদ্যুৎ-গ্যাসের মূল্য, শ্রমিক মজুরি ও পরিচালন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়েছে, ফলে অধিকাংশ স্টেশন লোকসানে চলছে। দাবি বাস্তবায়নে আগামী ৩০ জুলাই দেশব্যাপী প্রতীকী ধর্মঘট পালন এবং এ সময়ের মধ্যে সমাধান না হলে ২৩ আগস্ট থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য দেশের সব সিএনজি ফিলিং স্টেশন বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি।

সংশ্লিষ্টরা যা বলছেন: গ্যাস সংকটের বিষয়টি নিশ্চিত করে গত মঙ্গলবার জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, কারিগরি সমস্যার কারণে সংশ্লিষ্ট ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) থেকে গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। ফলে জাতীয় পর্যায়ে গ্যাস সরবরাহে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কিছু এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় সিএনজি স্টেশনগুলো প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্যাস গ্রহণ করতে পারছে না। এফএসআরইউটির কারিগরি সমস্যা দ্রুত সমাধানে সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও বিশেষজ্ঞরা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছেন। একই সঙ্গে সীমিত সরবরাহের সর্বোত্তম ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জরুরি ও অগ্রাধিকারভিত্তিক খাতে গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রাখার চেষ্টা চলছে।

বর্তমান গ্যাস সংকটের কারণ হিসেবে এলএনজি টার্মিনালের এফএসআরইউর কারিগরি ত্রুটিকে কারণ হিসেবে চিহ্নিত করলেও জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের আমদানিনির্ভরতার কথাও উল্লেখ করেন মনির হোসেন চৌধুরী। তিনি বলেন, অতীতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে পর্যাপ্ত গুরুত্ব না দেওয়ায় আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। ফলে আমদানি অবকাঠামোর কোনো অংশে সমস্যা দেখা দিলে জাতীয় গ্যাস সরবরাহব্যবস্থা চাপের মুখে পড়ে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেইন কালবেলাকে বলেন, জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছে, যা মোটেও ভালো খবর নয়। এখন এ নির্ভরতা কাটাতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণের কথা বলেছে, তবে সেগুলো বাস্তবায়ন করাই এখন প্রধান প্রশ্ন। যেহেতু আমদানিনির্ভরতা থেকে হুট করে বের হয়ে আসা সম্ভব নয়, সেক্ষেত্রে অবশ্যই সরকারকে একটা প্রপার প্ল্যান ধরে এগোতে হবে, যাতে তা কমিয়ে আনা যায় এবং একই সঙ্গে গ্রাহকদেরও জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে হবে।

কালবেলা/এসওআর
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

শিবগঞ্জ ও মোকামতলায় দিনব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি

রাজধানীতে গুলিবিদ্ধ যুবদল কর্মীর মৃত্যু, আহত আরও ৩

আগের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিলেন সাতক্ষীরার এমপি খালেক

ভুলের জন্য নাহিদ ইসলামদের উচিত দুঃখপ্রকাশ করা: রাশেদ খাঁন

রাজধানীতে যুবদল নেতাসহ গুলিবিদ্ধ ২

সাহাবুদ্দিনসহ যেসব রাষ্ট্রপতি মেয়াদ শেষ করতে পারেননি

শনিবার টানা ৯ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকবে না যেসব এলাকায়

কয়েল জ্বালাতে গিয়ে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, দগ্ধ শ্রমিক দম্পতি

পেয়ারা পাড়তে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে যুবকের মৃত্যু

ঝাঁকড়া চুলের হৃদয়বিদারক গল্প শোনালেন স্পেনের ডিফেন্ডার

১০

এমপির ইমামতি নিয়ে মসজিদে বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীদের হাতাহাতি

১১

মেসির অবসর ও বিশ্বকাপ ফাইনাল নিয়ে এবার মুখ খুললেন ডি মারিয়া

১২

‘জালালাবাদ গোল্ড অ্যাওয়ার্ড’ পেলেন জবির কাওছার

১৩

নতুন কোচের নাম ঘোষণা করল বেলজিয়াম

১৪

১৩ জুলাই অনুষ্ঠিত এইচএসসি পরীক্ষা ফের দেওয়ার সুযোগ, অংশ নিতে পারবেন যারা

১৫

ফ্যাসিস্টের দোসর চুপ্পুকে গ্রেপ্তার করতে হবে: নাহিদ ইসলাম

১৬

ইরানের ওপর ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন নিষেধাজ্ঞা

১৭

বিশ্বকাপের যে ব্যতিক্রম তালিকায় সবার উপরে এমবাপ্পে

১৮

রাশিয়া-চীনকে ইরানে অস্ত্র সরবরাহ না করার হুঁশিয়ারি দিলেন ট্রাম্প

১৯

মেসির বিদায় হবে আর্জেন্টিনায়, পরিকল্পনায় ‘বিশেষ’ ম্যাচ

২০
X