ইলিয়াস হোসেন
প্রকাশ : ১৮ নভেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১৮ নভেম্বর ২০২৫, ১২:০৮ পিএম
প্রিন্ট সংস্করণ
যে কথা কেউ শোনে না

তারেক যেন আরেক জিয়া

তারেক যেন আরেক জিয়া

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও রাজনীতিতে এক অবিস্মরণীয় নাম। হিংসুকরা মুছে ফেলতে চাইলেও এ নাম জন্মদাগের মতো দেশের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ক্ষণজন্মা এ পুরুষের অনন্য কীর্তি তাকে অমরত্ব দিয়েছে। স্বাধীনতা অর্জন, সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও আধুনিক রাষ্ট্র গড়ার কারিগর জিয়া সফল এক রাষ্ট্রনায়কের নাম। তাকে সৌভাগ্যবান বলে ঈর্ষা করেছেন দেশের বড় বড় রাজনীতিবিদও। কিন্তু এ ভাগ্য অদম্য সাহস ও শ্রম-ঘামের বিনিময়ে অর্জন করেছেন তিনি। কোনো গুরুর আশীর্বাদ বা বক্তৃতার মাধ্যমে পাননি। সময়ের প্রয়োজনে ইতিহাস তাকে জায়গা দিতে বাধ্য হয়েছে। তার চলার পথ মোটেও কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। মাত্র ৪৫ বছরের জীবনের বেশিরভাগ সময়ই কণ্টকময় বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হয়েছে তাকে। শান্তিপ্রিয়, মধ্যবিত্ত পরিবারের মেধাবী সন্তান তিনি। শিক্ষা-সংস্কৃতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চা ছিল তার পরিবারের সম্পদ। পারিবারিক শিক্ষার কারণে অতিলোভ বা উচ্চাভিলাষ ছিল না কখনো। কিন্তু দেশ ও জাতির প্রয়োজনে জীবনকে বাজি রেখেছেন বারবার। সেনাজীবনে একাধিক যুদ্ধ এবং মৃত্যুঝুঁকি নিতে হয়েছে তাকে। চৌকস সেনা কর্মকর্তা হিসেবে মানুষের সম্মান ও প্রতিদ্বন্দ্বীদের সমালোচনার শিকার হয়েছেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রাখার পরও মুজিব সরকারের কাছে জিয়া ছিলেন উপেক্ষিত। কতিপয় বাকশালী আদর্শের সহযোদ্ধা জেনারেল তার নেতৃত্বকে ঈর্ষা করত। যে কারণে তাকে ডিঙিয়ে তার জুনিয়রকে সেনাপ্রধান করে তৎকালীন সরকার। শুধু তাই নয়, তাকে রাষ্ট্রদূত করে বিদেশ পাঠিয়ে দেওয়ারও চেষ্টা করে প্রতিদ্বন্দ্বী সহকর্মীরা। কিন্তু রাখে আল্লা মারে কে? তাকে নিয়ে সৃষ্টিকর্তা আরও বড় পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর পাল্টাপাল্টি ক্যুর একপর্যায়ে অনিবার্য হয়ে ওঠেন জিয়াউর রহমান। সিপাহি-জনতার বিপ্লব নিয়ে জাসদসহ অনেকে বড় বড় কথা বলে থাকেন। তাদের মধ্যে নেতৃত্ব নেওয়ার সার্বজনীন কোনো নেতা ছিলেন না। সাধারণ সিপাহি-জনতার চাপে বাধ্য হয়েই জিয়ার হাতে নেতৃত্ব তুলে দিতে হয় হঠকারী বিপ্লবীদের। জিয়া এলেন, দেখলেন, জয় করলেন। বিষয়টি এত সহজ ছিল না। মাত্র সাড়ে পাঁচ বছরের শাসনকালে ১৯টি ক্যু তাকে দমন করতে হয়েছে। নানা মত-পথের মানুষকে নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি গঠন করেছিলেন তিনি। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত নেতাদের কোন্দল মেটাতে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে তাকে। এরই মধ্যে দেশকে স্বনির্ভর করে গড়ে তোলার জন্য সবুজ বিপ্লব ছড়িয়ে দিয়েছিলেন দেশজুড়ে। সৎ, পরিশ্রমী জিয়া আজও মানুষের কাছে কর্মবীর হিসেবে সম্মানিত। এত কম সময়ে এত কাজ করে বিশ্বে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। কোনো কিছুই আপনা-আপনি হয়নি। সৌভাগ্যের বরপুত্র নয়, বাড়ির বড় ছেলের মতো কঠোর পরিশ্রমই তাকে নায়ক বানিয়েছে। এত কিছু করার পরও দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রে কতিপয় বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে নির্মমভাবে খুন হন তিনি। শোকাভিভূত বাংলাদেশ তাকে শহীদ রাষ্ট্রপতি হিসেবে সম্মান করে।

এক ট্র্যাজিক হিরো হিসেবে সাধারণ মানুষের মুখে আজও উচ্চারিত হয় শহীদ জিয়ার নাম। তার বড় ছেলে তারেক রহমান এখন তারই গড়া দল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। এক অদ্ভুত মিল! একই কারণে প্রতিকূলতার সঙ্গে বছরের পর বছর যুদ্ধ করছেন তারেক রহমান। দেশ-জাতির কল্যাণে নিশ্চিত সুখের জীবন ত্যাগ করেছেন। নির্বাসিত জীবনেও দেশ, জনগণ ও দলীয় নেতাকর্মীরাই তার ব্যক্তিগত ঘর-সংসার।

বাবা রাষ্ট্রপতি এবং মা প্রধানমন্ত্রী। তাদের প্রথম সন্তান তারেক রহমান। পৃথিবীতে বিরল সৌভাগ্যের প্রতীক তিনি। অথচ, ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ এক জীবন তার। পরাধীন দেশে সেনা কর্মকর্তার মধ্যবিত্ত সংসারে জন্ম এবং বেড়ে ওঠা তারেকের। মাত্র চার বছর বয়সে মা খালেদা জিয়ার সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে বন্দি হন তিনি। বাবা মেজর জিয়া তখন রণাঙ্গনে। কোমল প্রাণে ভয়ংকর ট্রমার আঘাত। এ নিয়ে অবশ্য বাংলাদেশের মানবতাবাদীরা তেমন কোনো খোঁজ-খবর করেননি। স্বাধীনতা অর্জন এবং জিয়ার ক্ষমতা গ্রহণের পরও আর দশটা মধ্যবিত্ত পরিবারের মতো সাধারণভাবেই বেড়ে উঠতে থাকেন তারেক রহমান। ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোর সঙ্গে দারুণ খুনসুটির সম্পর্ক ছিল। তবে আনন্দের শৈশব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। কৈশোরে হন পিতৃহারা। জিয়া হত্যাকাণ্ডের পর তাদের পরিবারে নেমে আসে অমানিশা। মাত্র ১৪ বছরে বয়সে বাবা হারিয়ে অনিশ্চিত জীবনের আশঙ্কায় মুষড়ে পড়েন। অবশ্য দেশ, জনগণ ও দলের দায়ও এড়াতে পারে না জিয়া পরিবার। একপর্যায়ে গৃহবধূ খালেদা জিয়া বিএনপির হাল ধরেন। স্বামীর প্রতিষ্ঠিত দল বলে এন্ট্রি সহজ ছিল না। ঝানু রাজনীতিবিদদের আস্থায় নিয়ে নিজের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছে তাকে। দলের ভেতরে-বাইরে কঠোর পরিশ্রম ও আপসহীন চরিত্রের মাধ্যমে নিজেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দেশনেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন খালেদা জিয়া। তারেক রহমানকেও একইরকম সংগ্রাম করতে হচ্ছে। বগুড়া থেকে প্রাথমিক সদস্য পদ পান। এরপর সাংগঠনিক ও নির্বাচনী নানা কাজে সক্ষমতার প্রমাণ দিয়ে ধাপে ধাপে এগোতে থাকেন। ‘একটি উদ্যোগ, একটু চেষ্টা/এনে দেবে সচ্ছলতা’—এ স্লোগান নিয়ে জিয়া ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সামাজিক কাজ করেছেন তারেক রহমান। শহীদ জিয়ার স্বনির্ভর আন্দোলনের সঙ্গে মিল পাওয়া যায় এ তৎপরতার। দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান পদে মুনশিয়ানা দেখান তিনি। দেশ ও দলের ক্রান্তিকালে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পাওয়ায় ইস্পাতকঠিন ঐক্য গড়ে ওঠে বিএনপিতে। এক-এগারোর ষড়যন্ত্রী সরকার বিএনপি তথা জিয়া পরিবারের ওপর বুলডোজার চালায়। খালেদা জিয়াকে বন্দি করে। তারেক রহমানকে নির্যাতন করে নির্বাসনে পাঠায়। অত্যাচার সইতে না পেরে মারা যান আরাফাত রহমান। পরবর্তীকালে নিঃস্ব, রিক্ত বিএনপি চেয়ারপারসন ফ্যাসিস্ট সরকারের কারাগারে নিক্ষিপ্ত হয়ে অসুস্থ হন। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী শক্তিকে বাঁচিয়ে রাখতে অনিবার্যভাবেই নির্বাসনে থেকে দলের হাল ধরেন তারেক রহমান।

অত্যাচার ও শত প্রলোভনেও বিএনপির ঐক্য ভাঙতে পারেনি ফ্যাসিস্ট সরকার এবং আওয়ামী লীগ। বিশেষ করে তৃণমূল নেতাকর্মীরা একাট্টা ছিলেন তারেক রহমানের ভার্চুয়াল নেতৃত্বে। মাঝেমধ্যে অবশ্য বিএনপির দুয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতার বিরুদ্ধে সরকারি মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। তবে দল ছেড়ে যাওয়ার চিন্তা করেননি তারা। অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় বিএনপি এখন বড় এবং ঐক্যবদ্ধ দল। তাই বলে নির্ভার হওয়ার কিছু নেই। আওয়ামী লীগের মতো পুরোনো শত্রুর জায়গা নিচ্ছে জামায়াত। এককালের এই মিত্র আওয়ামী লীগের চেয়েও ভয়ংকর প্রোপাগান্ডা মাস্টার। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপির এখন মূল প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত। শুধু তাই নয়, তাদের কমন শত্রু আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধেও দল দুটির দৃষ্টিভঙ্গি ক্ষণে ক্ষণে পাল্টাচ্ছে। তারেক রহমান এবং বিএনপিকে প্রতিনিয়ত অনলাইনে আক্রমণ করছে জামায়াতের অনুসারী বটবাহিনী। বিএনপি অতীতেও মিডিয়া যুদ্ধে খুব একটা ভালো করতে পারেনি। গবেষণা ও উন্নয়ণ চিন্তার কেন্দ্র হিসেবে শুরু করলেও ‘হাওয়া ভবন’কে অভিশপ্ত বাড়ি বানিয়ে ছেড়ে দিয়েছে আওয়ামী লীগ অ্যান্ড কোং। সে সময় গণমাধ্যমকে ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করতে পারেনি দায়িত্বপ্রাপ্তরা। তারা বোঝাতে না পেরে মিডিয়াকে বোঝা মনে করত। অথচ, তারেক রহমান এবং গণমাধ্যমের মধ্যে একটি দুর্ভেদ্য প্রাচীর রচনা করে রেখেছিল সুবিধাভোগীরা। তারা তাকে ঘিরে দিন-রাত গুণগান করত গুনগুন করে। পটপরিবর্তনের পর প্রবাস থেকে অনেক উপদেষ্টা এসেছেন দেশে। তারা ব্যক্তিগত প্রচারের জন্য গণমাধ্যমের সঙ্গে সম্পর্ক রাখেন। কিন্তু দলের হয়ে সমন্বিত উদ্যোগ এখনো কার্যকর হয়নি। অনেক উচ্ছিষ্টভোগী মহৎ কাজের দায়িত্ব পেয়ে করে-কেটে খাচ্ছে। তবে দিনশেষে তারেক রহমানের বদনামের পাল্লা ভারী করে তারা।

রাজনীতিতে উত্তরাধিকার বা পরিবার প্রথা নিয়ে উচ্চকণ্ঠ সুশীল এবং নতুন রাজনীতিক সমাজ। আজকের অবস্থানে আসতে শুধু কাঠখড় নয়, নিজেকেও পোড়াতে হয়েছে তারেক রহমানকে। শুধু নিজের কারণে নয়, ভোগবাদী পারিষদবর্গের অতি ভক্তি ও ভোগের প্রায়শ্চিত্তও করতে হয়েছে তাকে। তার কমান্ডিং ভয়েস কমান্ডার পিতা জিয়াউর রহমানের কথা মনে করিয়ে দেয়। কালো সানগ্লাসের সমালোচনা মিষ্টি হাসি দিয়ে আড়াল করেছেন তিনি। এরকম ব্যক্তিগত অনেক সমালোচনা হয়তো ব্যক্তিত্ব দিয়ে ম্লান করে দেবেন আজকের পরিণত রাজনীতিবিদ তারেক রহমান। কিন্তু সহযাত্রী বাছাইয়ে ভুল করলে সহমরণে কাউকে পাওয়া যাবে না। ডান-বাম সবাইকে এক কাতারে এনেছিলেন জিয়া। তবে দেশ-জাতি ভুলে কোনো নেতাকে আরামে থাকতে দেননি তিনি। সাধারণ মানুষ তারেক রহমানকে সেভাবে দেখতে চান। যদিও তিনি নিজের পরিচয়ে বড় হতে চান। নামের সঙ্গে জিয়া বা কোনো বিশেষণ যোগ করতে নিষেধ করেছেন। এক দিন পরই ষাট বছরে পা দেবেন তারেক রহমান। এবারও প্রবাসে থাকবেন। আগামীতে হয়তো দেশের গণমানুষের সঙ্গে জন্মদিনটা কাটাবেন। আগাম শুভ জন্মদিন, তারেক রহমান।

লেখক: হেড অব নিউজ, আরটিভি

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

স্বামীকে বেঁধে রেখে স্ত্রীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ

বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে ঊর্ধ্বগতি

স্টেডিয়ামে ট্রাম্পকে দেখে দর্শকদের দুয়োধ্বনি 

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধবিরতির পর কমলো তেলের দাম

চবিতে দেশের প্রথম ওশান স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশন চালু

স্ত্রীকে হত্যা করে বাসায় তালা দিয়ে পালালেন ছাত্রদল নেতা

আর্জেন্টিনা সমর্থকের মাথা ফাটাল ব্রাজিল সমর্থক

বিধ্বস্ত মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টারের ক্রুদের অবস্থা জানালেন ট্রাম্প

ইসরায়েলের ভাসমান কারাগারে ৫২ ঘণ্টা, ভয়াবহ অভিজ্ঞতা ফ্লোটিলা কর্মীর

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা নিয়ে হাইকোর্টের রায় আপিল বিভাগে স্থগিত

১০

বাবা-ছেলেকে ধরে নিয়ে গেছে ইসরায়েলি বাহিনী

১১

মোবাইলে বিশ্বকাপ দেখবেন যেভাবে

১২

প্রকাশ্যে রাজমিস্ত্রিকে গুলি

১৩

গোল না খাওয়ার পরিসংখ্যানে শীর্ষে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল ৪৩তম

১৪

যুবদল নেতা বহিষ্কার

১৫

রাশিয়ার ড্রোন হামলায় ইউক্রেনে নিহত ৪, আহত ১০

১৬

ম্যারাডোনার ‘ঈশ্বরের হাত’ ছোঁয়া সেই বল এখন কোথায়

১৭

ট্রাক-কাভার্ডভ্যানের সংঘর্ষে প্রাণ গেল যুবকের

১৮

বিয়ে বাড়িতে গরুর মাংস নিয়ে দুপক্ষের সংঘর্ষ, আহত ১০

১৯

আজ বিশ্ব অ্যাক্রেডিটেশন দিবস

২০
X