

ধূসর ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিন একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছে সবুজের অস্তিত্ব। কংক্রিট আর যানজটের ভিড়ে কখনো কখনো নিঃশ্বাস নেওয়াটাই কষ্টকর হয়ে ওঠে। এমন এক বাস্তবতায় কিছু মানুষ এখনো মনে করেন—সবুজ মানেই জীবন আর প্রকৃতি মানেই প্রশান্তি। তাদের কাছে গাছ কেবল শখ নয়, বরং জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ। এমনই এক উদাহরণ তৈরি করেছেন পিরোজপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. শহীদুল ইসলাম ও তার স্ত্রী উদ্যোক্তা নাসরিন ইসলাম। এ দম্পতির বাড়ির ছাদ এখন কেবল একটি বাগান নয়, বরং সবুজের নিবিড় এক আশ্রয়, যেখান থেকে প্রতিদিন তারা খুঁজে নেন প্রাণ ও শান্তির বার্তা।
প্রায় ১২ বছর আগে নাসরিন ইসলাম ছাদে প্রথম দুটি গাছ এনে রাখেন। তখন বিষয়টি ছিল নিছক শখের। কিন্তু গাছে ফুল ফুটতে দেখে তার মনে হলো, এটি কেবল সৌন্দর্য নয়, মানসিক প্রশান্তিরও উৎস। তখন থেকেই তিনি ছাদজুড়ে গাছ লাগানোর পরিকল্পনা করেন।
পেশায় তিনি একজন উদ্যোক্তা, বুটিক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। কাজের ব্যস্ততার মাঝেও প্রতিদিন সময় বের করে ছাদে গাছের যত্ন নেন। বর্তমানে তার ছাদে শতাধিক গাছ রয়েছে। ফুল, ফল, সবজি তো আছেই, এর পাশাপাশি মাশরুম চাষও শুরু করেছেন। সফেদা, জাম, জামরুল, মিষ্টি করমচা, ড্রাগন ফল, ক্যাপসিকাম, জাম্বুরা, পেঁপে, ডালিম, তিনফল, লাউ, টমেটো, বেগুন, মৌ শিম, ঝিঙে, চিচিঙ্গা, করলা, তুলসী, নিমপাতা, পুদিনা, আদা, অরিগেনো—সব মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ খামারের চেহারা নিয়েছে ছাদটি।
নাসরিন ইসলাম বলেন, ‘প্রথমে শখ থেকে শুরু করেছিলাম, এখন এটা আমার জীবনের অংশ। সকালে উঠেই প্রথমে ছাদে যাই। গাছে পানি দিই, পোকা হয়েছে কি না দেখি, গাছের সঙ্গে কথা বলি। মনে হয় ওরা আমার সঙ্গেই বড় হচ্ছে।’
গাছের সঠিক পরিচর্যার জন্য তিনি শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি খামার এবং কৃষি বাড়িতে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। নিজেই তৈরি করেন জৈব সার। কারওয়ান বাজার বা পলাশী থেকে ফেলে দেওয়া মাছের আঁশ, নষ্ট সবজি বা পাতা এনে খইল, ভুসি ও মাটির সঙ্গে মিশিয়ে সার বানান তিনি। কখনো কড়ই গাছের পাতা দিয়েও সার প্রস্তুত করেন। তার ভাষায়, ‘এই সার মাটিকে ঝরঝরে রাখে, শিকড় সহজে খাবার পায়, গাছও ভালো ফলন দেয়।’
স্ত্রীর এমন ভালোবাসা ও মমতা দেখে শহীদুল ইসলামও ছাদবাগানে যুক্ত হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘নাসরিনের ছাদবাগান দেখে আমারও আগ্রহ তৈরি হয়। এখন আমরা দুজনে মিলে সিজন অনুযায়ী গাছ লাগাই। বাজার থেকে সবজি খুব কমই কিনতে হয়, যা উৎপাদন করি, তা আশপাশের প্রতিবেশীর সঙ্গেও ভাগ করে নিই।’
তার মতে, ছাদবাগানের ফল-সবজিতে কোনো ফরমালিন নেই বলে এটি নিরাপদ খাদ্যের উৎসও। গাছ থাকার ফলে ছাদের তাপমাত্রাও অনেকটা কমে গেছে বলে জানান তিনি।
তাদের গ্রামের বাড়ি নোয়াখালিতেও একটি ছোট বাগান করেছেন শহীদুল ইসলাম। বলেন, ‘ঢাকায় যেমন ছাদে গাছ লাগিয়েছি, গ্রামেও একইভাবে চেষ্টা করছি। গাছগুলো এখন আমাদের পরিবারের সদস্য।’
নাসরিন ইসলাম বলেন, ‘ছাদবাগান শুধু ফল বা সবজির উৎস নয়, এটি মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও জরুরি। গাছের সঙ্গে সময় কাটালে মন শান্ত হয়, চাপ কমে যায়।’ এই দম্পতির ছাদবাগান এখন তাদের আশপাশের মানুষদেরও অনুপ্রাণিত করছে। তাদের দেখে অনেকেই ছাদে গাছ লাগানো শুরু করেছেন।
‘সবুজ মানেই জীবন, সবুজ মানেই প্রশান্তি’—এ বিশ্বাসেই তারা ঢাকার ধুলোমাখা ছাদে গড়ে তুলেছেন এক টুকরো প্রাণের জগৎ। নিঃশব্দে তা যেন বলে যাচ্ছে, প্রকৃতিই মানুষের শেষ আশ্রয়।