

চলমান গ্যাস সংকট কমিয়ে সরবরাহ বাড়াতে ১৮০ দিন বা ছয় মাসের বিশেষ পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে আমদানি-নির্ভরতা কিছুটা কমে আসবে বলে মনে করছেন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের কোনো বিকল্প নেই। ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস মজুত মাত্র ৭ দশমিক ৯৬ ট্রিলিয়ন ঘনফুট অবশিষ্ট আছে।’
জ্বালানি বিভাগের নেওয়া পরিকল্পনা অনুযায়ী, সরকার আগামী ছয় মাসের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৯০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত করার আশা করছে। এজন্য বেশ কিছু পরিত্যক্ত কূপ থেকে ফের উৎপাদন শুরু করার পরিকল্পনাও করেছে। এ ছাড়া স্বল্পমেয়াদে সাতটি অনুসন্ধান কূপ, সাতটি উন্নয়ন কূপ এবং দুটি ওয়ার্কওভার কূপ খননের প্রস্তাব পেয়েছে। একই সঙ্গে স্থলভাগে এবং সমুদ্রে অনুসন্ধানে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে ‘উৎপাদন অংশীদারত্ব চুক্তি (পিএসসি) মডেল ২০২৬’ চূড়ান্ত করার প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।
খননকাজের পাশাপাশি সিসমিক সার্ভে বা ভূকম্পন জরিপকেও অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সরকার ছয় মাসের মধ্যে দুই হাজার লাইন-কিলোমিটার দ্বিমাত্রিক জরিপ বা ২ ডি সিসমিক সার্ভে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা করেছে। এ ছাড়া ব্লক ৭ এবং ৯-এ ৫০০ লাইন-কিলোমিটার অফশোর ডাটা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। রংপুর, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, জয়পুরহাট এবং পঞ্চগড়ে নতুন ত্রিমাত্রিক জরিপ বা ৩ ডি সিসমিক সার্ভের সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নতুন সরকার এমন একসময় এ কর্মসূচি নিয়েছে, যখন অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন ক্রমাগত কমছে। ২০২৩ সালে উৎপাদন যেখানে ২ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি ছিল, সেখানে ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুটে। সরবরাহের এ ঘাটতি মেটাতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। শুধু ২০২৫ সালেই বাংলাদেশ এলএনজি আমদানিতে প্রায় ৬ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছে। জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববাজারে এলএনজির অস্থিতিশীল দাম এবং অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধানে দীর্ঘদিন বিনিয়োগ না হওয়া এই আমদানি ব্যয় বাড়ার প্রধান কারণ।
সংশ্লিষ্টরা জানান, আমদানি বেড়ে যাওয়ায় জ্বালানি খাতের ভর্তুকিও বেড়েছে, যা সরকারের ওপর আর্থিক চাপ বাড়াচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকার জ্বালানি ভর্তুকির জন্য প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে জ্বালানি ভর্তুকি তুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যার ফলে ভবিষ্যতে গ্যাসের দাম আরও সমন্বয় (বৃদ্ধি) করার প্রয়োজন হতে পারে।
গত সপ্তাহে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রীকে এ পরিস্থিতির কথা জানান। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও গ্যাস সরবরাহে বাধা সৃষ্টি করছে। বর্তমানে দুটি ভাসমান টার্মিনাল থাকলেও অবকাঠামোগত কারণে এক হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি এলএনজি সরবরাহ করা সম্ভব নয়। এ ছাড়া ভোলাতে পর্যাপ্ত গ্যাস থাকলেও পাইপলাইন না থাকায় তা পরিবহন করে মূল ভূখণ্ডে আনা যাচ্ছে না। এর বিকল্প হিসেবে এলএনজি আকারে ভোলা গ্যাস আনার উদ্যোগ নিলেও তা সফল হয়নি। বর্তমানে একটি বেসরকারি কোম্পানি খুব অল্প পরিমাণ গ্যাস ভোলা থেকে এলপিজি করে ঢাকার বিভিন্ন কারখানায় সরবরাহ করছে।