

কয়েকশ গ্রাহক ও সাব-এজেন্টের কাছ থেকে উড়োজাহাজের টিকিটের অগ্রিম টাকা নিয়ে টিকিট সরবরাহ না করে ৩৪ কোটি ৬৯ লাখ টাকা হাতিয়েছে অনলাইনভিত্তিক ট্রাভেল প্রতিষ্ঠান ‘ফ্লাইট এক্সপার্ট’। এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ কর্মকর্তারা পালিয়েছেন। তবে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তদন্ত শেষে ফ্লাইট এক্সপার্টের (এফইবিডি) ছয় কর্মকর্তাসহ ৭ জনের নামে মানি লন্ডারিংয়ের মামলা করেছে।
সিআইডি জানিয়েছে, তদন্ত শেষে গত ১১ জুলাই রাজধানীর মতিঝিল থানায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে ওই মামলাটি করা হয়। এতে ফ্লাইট এক্সপার্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সালমান বিন রশিদ শাহ সায়েম, তার বাবা প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান এম এ রশিদ শাহ সম্রাট, পরিচালক আমির হামজা রশিদ শাহ নায়েম, পরিচালক এ কে এম শাহদাত হোসেন, পরিচালক আব্দুল গণি মেহেদী, হেড অব ফাইন্যান্স মো. সাকীব হোসেন এবং সোমা ইন্টারন্যাশনাল সার্ভিসেসের স্বত্বাধিকারী মোতাহের হোসেনকে আসামি করা হয়েছে।
সিআইডি সদর দপ্তরের বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান জানিয়েছেন, সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে সাতজনের বিরুদ্ধে মামলাটি করা হয়। মামলায় প্রায় ৩৪ কোটি ৬৯ লাখ ৩১ হাজার ৯০ টাকা মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ আনা হয়েছে। সিআইডি মামলাটি তদন্ত করবে।
ফ্লাইট এক্সপার্ট নামে প্রতিষ্ঠানটি ২০১৬ সালে অনলাইনভিত্তিক উড়োজাহাজ টিকিট বিক্রির কার্যক্রম শুরু করে। পরে প্রতিষ্ঠানটি হোটেল বুকিং, হজ ও ওমরাহ প্যাকেজসহ বিভিন্ন ভ্রমণসেবা দিতে থাকে। প্রতিষ্ঠানটি নানা অফার দিয়ে শত শত ট্র্যাভেল এজেন্সির কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। এরপর গত বছরের ১ আগস্ট প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে পালিয়ে যান ফ্লাইট এক্সপার্টের এমডি সালমান বিন রশিদ শাহ সায়েম ও তার বাবা প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান এম এ রশিদ শাহ সম্রাট। মক্কা ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস নামে তাদের আরেকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত ট্রাভেল এজেন্টরা বলছেন, টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনায় ১৭টি ট্র্যাভেলস এজেন্সির পক্ষ থেকে ওই সময় মামলা করা হয়েছিল। ওই মামলায় ফ্লাইট এক্সপার্টের তিন কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তবে মূলহোতারা আড়ালেই থেকে যায়।
এদিকে সিআইডির অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, ফ্লাইট এক্সপার্ট ২০১৯ সালে এফইবিডি নামে যৌথ মূলধনি কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত হয়। তবে তারা ফ্লাইট এক্সপার্ট ও এফইবিডি—উভয় নামেই ব্যবসায়িক কার্যক্রমসহ ব্যাংকিং লেনদেন চালাত। প্রতিষ্ঠানটি ব্যবসা থেকে ব্যবসা (বি-টু-বি) ও ব্যবসা-থেকে-ভোক্তা (বি-টু-সি)—উভয় পদ্ধতিতে উড়োজাহাজ টিকিট বিক্রি করত। বিভিন্ন সময়ে অস্বাভাবিক মূল্যছাড়ের ঘোষণা দিয়ে তারা দেশের বিভিন্ন সাব-এজেন্ট ও সাধারণ গ্রাহকদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অগ্রিম অর্থ সংগ্রহ করত। তবে নির্ধারিত টিকিট সরবরাহ না করে প্রতিষ্ঠানটির এমডি সালমান বিন রশিদ শাহ সায়েম দেশত্যাগ করেন।
সিআইডির তদন্তকারীরা বলছেন, এফইবিডির নামে পরিচালিত বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে জমা হওয়া অর্থ পরে ফ্লাইট এক্সপার্টের বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির অর্থ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হিসাবে স্থানান্তর, উত্তোলন ও রূপান্তরের মাধ্যমে অপরাধলব্ধ সম্পদের উৎস, মালিকানা, প্রকৃতি গোপনের চেষ্টা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে প্রমাণ পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটির এমডি দেশত্যাগের পরও কোম্পানির কয়েকজন পরিচালক ও অর্থ বিভাগের প্রধান বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ উত্তোলন-স্থানান্তর করেন। এসব লেনদেনের মাধ্যমে প্রতারণার মধ্য দিয়ে অর্জিত অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গেছে।