

দেশে বিরাজমান ঊর্ধ্বগতির মূল্যস্ফীতি প্রতিরোধে ব্যয় সংকোচন ও কৃচ্ছ্রসাধনের মতো নীতি গ্রহণ করা সত্ত্বেও সরকারি অর্থের বাড়তি অপচয়ে শীর্ষ কর্মকর্তাদের জন্য বিলাসবহুল গাড়ি কেনার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের এক সিদ্ধান্তে সে পথ তৈরি করে দেওয়া হয়। নতুন এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সরকারের সিনিয়র সচিব, সচিব ও অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদাসম্পন্ন ১ ও ২নং গ্রেডের কর্মকর্তারা আগের থেকে ৫২ লাখ টাকা বাড়তি খরচ করে নতুন বিলাসবহুল গাড়ি নিতে পারবেন। বর্তমানে এসব কর্মকর্তা ৯৪ লাখ টাকার সীমার মধ্যে গাড়ি ব্যবহার করছেন। কিন্তু এখন থেকে এ শ্রেণির কর্মকর্তাদের ব্যবহারের জন্য ১ কোটি ৪৬ লাখ ২০ হাজার টাকা মূল্যমানের ২৭০০ সিসির বিলাসবহুল জিপগাড়ি সরবরাহ করা হবে। তবে এ মূল্যসীমার মধ্যে ক্রয়কৃত গাড়ির নিবন্ধন ফিসহ প্রদেয় ভ্যাট ও ট্যাক্সের হিসাব অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
ব্যয় ব্যবস্থাপনা অধিশাখার জারি করা এ-সংক্রান্ত নির্দেশনায় সরকারি প্রশাসনে যুগ্ম-সচিবসহ গ্রেড-৩ এবং তদনিম্নপর্যায়ের কর্মকর্তাদেরও জিপ গাড়ি সরবরাহ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ শ্রেণির কর্মকর্তাদের গাড়ির নতুন মূল্যসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬৫ লাখ টাকা। এতেও আগের তুলনায় ক্রয়মূল্য বাড়ানো হয়েছে ন্যূনতম ১০ লাখ টাকা। এ ছাড়া নতুন নির্দেশনায় সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান/কোম্পানিতে কর্মরত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ব্যবহারের জন্য ১২ ধরনের গাড়ি সরবরাহে ক্রয়মূল্যের নতুন সীমা বেঁধে দেওয়া হয়, যার সবকটির মূল্যসীমাই আগের তুলনায় বাড়ানো হয়েছে।
এ বিষয়ে অর্থবিভাগের ব্যয় ব্যবস্থাপনা অধিশাখার নির্দেশনায় বলা হয়েছে, প্রাইভেট কার, জিপ, পিক-আপ (সিঙ্গেল কেবিন ও ডাবল কেবিন) মাইক্রেবাস, মোটরসাইকেল, অ্যাম্বুলেন্স, কোস্টার, মিনিবাস, (এসি) মিনিবাস (এন-এসি), বাস (নন-এসি) ও ট্রাক-এর বাজার দর বিবেচনা করে যানবাহনের মূল্য নির্ধারণ করা হলো। এখন থেকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/বিভাগ/অধিদপ্তর/পরিদপ্তরগুলো যানবাহন ক্রয়ে অনুমতি বা বরাদ্দ প্রদানের ক্ষেত্রে অর্থ বিভাগের সব শাখা/অধিশাখাকে এ নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সরকারি যানবাহন অধিদপ্তরের (পরিবহন পুল) পরিবহন কমিশনার (অতিরিক্ত সচিব) মো. আবুল হাছানাত হুমায়ুন কবীর কালবেলাকে বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের এ ধরনের নির্দেশনা আমরা এখনো পাইনি। যদি তারা এমন কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে, আমরা বিভিন্ন বিভাগের প্রয়োজনে সরকারি যানবাহন ক্রয়ে সে নির্দেশনা অনুসরণ করেই পরে অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠাব।
এর আগে আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রশাসনিক কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে সরকারি যানবাহন অধিদপ্তর থেকে জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) জন্য সর্বাধুনিক মিতসুবিশি পাজেরো স্পোর্ট কিউএক্স মডেলের বিলাসবহুল গাড়ি দেওয়ার আবদার তোলা হয়েছিল। এসব জিপ গাড়ির এক একটির বাজারমূল্য ১ কোটি ৪৫ লাখ ৮৪ হাজার ৫০০ টাকা। তাও আবার এক-দুটি নয়, স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জন্য এমন উচ্চমূল্যের ৪৬১টি গাড়ি কেনার প্রস্তাবও রাখে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সরকারি যানবাহন অধিদপ্তর। এ জন্য নিয়মিত বরাদ্দের অতিরিক্ত ৬১২ কোটি টাকা চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়।
অর্থাৎ অর্থ মন্ত্রণালয়ের নতুন নির্দেশনার আলোকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মকর্তাদের ব্যবহারের জন্য যে প্রাইভেট কার দেওয়া হবে, তা অনূর্ধ্ব ১৬০০ সিসির নির্ধারণ করে দিয়ে তার রেজিস্ট্রেশন ফি, ভ্যাট ও ট্যাক্সসহ এই প্রাইভেটকারের মূল্য ৪৫ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। এ ছাড়া সরকারের বিভিন্ন বিভাগে দাপ্তরিক কাজে প্রয়োজন হয় পিক-আপ ভ্যানের। এ ক্ষেত্রে অনূর্ধ্ব ২৫০০ সিসির সিঙ্গেল কেবিনের পিক-আপ ভ্যান কেনা যাবে ৩৮ লাখ টাকার ভেতর। আর একই সিসির ডাবল কেবিনের পিক-আপ ভ্যান কিনতে হবে ৫৬ লাখ ২০ টাকার মধ্যে। তবে উভয় ক্যাটাগরির পিক-আপেই রেজিস্ট্রেশনসহ ভ্যাট ও ট্যাক্স অন্তর্ভুক্ত থাকবে। মাইক্রোবাস কিনতে হবে রেজিস্ট্রেশন ফি, ভ্যাট ও ট্যাক্স খরচসহ ৫২ লাখ টাকায়। এ মাইক্রোবাসটি হবে ২৭০০ সিসির। অনুরূপভাবে ২৭০০ সিসির অ্যাম্বুলেন্স কিনতে হবে ৫৪ লাখ টাকায়। এদিকে সরকারি দপ্তরে সাধারণ চাকরিজীবীদের যাতায়াতে বেশি ব্যবহার হয়ে থাকে কোস্টার বাস ও মিনিবাস এবং বাস। এক্ষেত্রে এসিযুক্ত ৪২০০ সিসির কোস্টার বাস ও মিনিবাস সব খরচসহ কিনতে হবে ৭৫ লাখ টাকায়। আর ২৭৭১ সিসির নন-এসি মিনিবাস কিনতে হবে ৩২ লাখ টাকায় এবং নন-এসি ৫৮৮৩ সিসির বাস কেনায় সব মিলে খরচ করা যাবে ৪৬ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। ১২৫ সিসির মোটরসাইকেল কেনা যাবে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকায়। আর সরকারি কাজে ব্যবহৃত ৫ টনের ট্রাক কিনতে হবে ৩৯ লাখ টাকায় এবং ৩ টনের ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ট্রাক কেনা যাবে ৩১ লাখ ৭৫ হাজার টাকার মধ্যে।
বিদ্যমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সরকারি যানবাহন কেনার এ নতুন মূল্যসীমাকে ‘অতি হাস্যকর’ ও ‘অতিবিলাসিতা’ বলে আখ্যা দেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, দেশে অর্থনৈতিক সংকট সব সময় আসে না। আবার দীর্ঘকালও থাকে না। নতুন এই মূল্যসীমা এক-দুই বছর পরও নির্ধারণ করা যেত; কিন্তু সরকার তো নীতি গ্রহণ করে একরকম। বাস্তবায়নে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘এখন তো সবার আগে দরকার সর্বত্র চরমভাবে কৃচ্ছ্রসাধনের চর্চা করা; কিন্তু আমরা দেখছি গাড়ি বিলাসের বাহার। এটা বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সাধারণের সঙ্গে সরকারের তামাশার শামিল।