

মেয়েটির নাম তানিয়া (ছদ্মনাম)। বয়স ১৮ বছর। এক বছর আগে বিয়ে হয়েছে। সবকিছু স্বাভাবিক থাকলেও গর্ভধারণের তিন মাসের মাথায় তার গর্ভপাত ঘটে। ঘটনাটি কক্সবাজারের চকরিয়ার। পরীক্ষায় অন্য কোনো সমস্যা মেলেনি। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)-এর সাম্প্রতিক এক গবেষণায় জানা গেছে, এর পেছনে মূল কারণ ছিল মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ত পানি আর তীব্র গরম।
গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের সমতল অঞ্চলে গর্ভপাতের হার যেখানে ৯ শতাংশ, উপকূলীয় এলাকায় সেই হার তিন গুণেরও বেশি—৩৩ দশমিক ১ শতাংশ। গবেষকরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলে লবণাক্ততা এবং তাপমাত্রা বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। এরই ফল হচ্ছে এ অস্বাভাবিক গর্ভপাত।
তাপমাত্রা ও লবণাক্ততার প্রভাবে উপকূলের মানুষ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্য। শুধু গর্ভপাত নয়, কিডনি অকার্যকর হয়ে পড়ার হারও বেড়েছে। ১৮ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে এ হার স্বাভাবিকের চেয়ে দেড় গুণ বেশি, ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে তা তিন গুণের কাছাকাছি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ইনফ্লুয়েঞ্জা, হিট স্ট্রোক, হিট ওয়েভ, কলেরা, উচ্চরক্তচাপ ও শিশুমৃত্যুর মতো সমস্যা।
চকরিয়ার স্থানীয় প্রেক্ষাপটে গবেষকরা আরও জানান, অনেক ঘরবাড়ির চাল-দেয়াল টিনের হওয়ায় বাড়ির ভেতরে তাপমাত্রা বাড়ে অনেক বেশি। অথচ সামাজিক রীতিনীতির কারণে নারীরা প্রায় সারাদিন ঘরের ভেতরেই থাকেন। শিশুদের ছায়ায় শুইয়ে রাখা গেলেও নারীরা প্রচণ্ড গরমে ভেতরে থেকেই অস্থির হয়ে পড়েন। এ অতিরিক্ত গরম শরীরের স্বাভাবিক কার্যপ্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে, বিশেষ করে অন্তঃসত্ত্বাদের ক্ষেত্রে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, যেসব বাড়ির দেয়াল বাঁশ বা ইটের, সেখানে তাপমাত্রা কিছুটা সহনীয় থাকে। বাড়ির গঠনপ্রকৃতি পরিবর্তনেও তাই পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। জার্মান রেডক্রসের সহায়তায় উপকূলে ‘কমিউনিটি কুলিং সেন্টার’ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি এমন একটি কেন্দ্র, যেখানে প্রচণ্ড গরমে মানুষ আশ্রয় নিতে পারবেন, যা তাপপ্রবাহজনিত অসুস্থতা বা মৃত্যুঝুঁকি কমাতে সহায়তা করবে।
আইসিডিডিআর,বির গবেষকরা বলছেন, পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় সুপেয় পানির সংকট ভয়াবহ হয়ে উঠছে। মানুষ বাধ্য হয়ে সেই পানি পান করছে, যা কিডনির কার্যক্ষমতা কমায় এবং উচ্চরক্তচাপ বাড়ায়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে জীবনযাত্রা ও খাদ্য নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়ছে।
জার্মানওয়াচ গ্লোবালের জলবায়ু ঝুঁকি সূচক (সিআরআই-২০২০) অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শীর্ষ ১০টি দেশের একটি। বিশেষ করে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ায় উপকূলীয় এলাকার নারী ও শিশুরা বেশি সংকটে পড়ছে।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও কিশোরীদের স্বাস্থ্যে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে। অতিরিক্ত লবণাক্ত পানি গ্রহণের কারণে জরায়ুর জটিলতা, উচ্চরক্তচাপ, খিঁচুনি, গর্ভপাত, এমনকি অপরিণত শিশুর জন্মও বাড়ছে।
এ বিষয়ে আইসিডিডিআর,বির জলবায়ু পরিবর্তন, স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ড. মনজুর আহমেদ হানিফি বলেন, ‘উপকূলের নারীদের মধ্যে গর্ভপাতের হার অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। এর প্রধান দুটি কারণ হলো অতিরিক্ত তাপমাত্রা এবং লবণাক্ততা। অন্তঃসত্ত্বা নারীরা এমনিতেই গরম কম সহ্য করতে পারেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে খাবার ও পানিতে অতিরিক্ত লবণের ব্যবহার। মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় বেশি লবণ সেবন করেন, যা গর্ভপাতের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
তিনি বলেন, উপকূলজুড়ে এ সমস্যা এখন স্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিচ্ছে। জনসচেতনতা, নিরাপদ পানি সরবরাহ এবং সহনশীল আবাসন ব্যবস্থার বিকল্প নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষায় এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।