

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে সোমবার বৈঠকের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন—নেতারা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি স্থাপনের ‘কাছাকাছি’ পৌঁছে গেছেন। হোয়াইট হাউসে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প এ সম্পর্কে বলেন, অন্ততপক্ষে খুব কাছাকাছি। ট্রাম্প গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ বন্ধ করতে এবং ফিলিস্তিনি অঞ্চলে এখনো জিম্মি থাকা ইসরায়েলি নাগরিকদের মুক্তি নিশ্চিত করতে নতুন করে ‘২০ দফা গাজা পরিকল্পনা’ প্রকাশ করেছেন। তার এই প্রস্তাবে ইসরায়েল, ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ, ইউরোপ ও আরব দেশগুলো স্বাগত জানালেও ‘চিরস্থায়ী শান্তির’ এ উদ্যোগ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত বিভিন্ন কারণে বাস্তবায়ন নিয়ে রয়েছে শঙ্কা।
ট্রাম্পের দেওয়া পরিকল্পনায় রয়েছে বহু ধাপ, যার মধ্যে বড় বাধা হিসেবে রয়েছে বন্দি ও জিম্মিদের মুক্তি নিয়ে বিরোধ, আন্তর্জাতিক নজরদারি, হামাসের ভবিষ্যৎ এবং গাজার ভাগ্য নির্ধারণ। বিশ্লেষকদের মতে, এসব স্পর্শকাতর ইস্যু মোকাবিলা করা না গেলে পুরো প্রক্রিয়াই ভেস্তে যেতে পারে।
বাধাগুলো নিয়ে জেরুজালেম পোস্ট লিখেছে, ইসরায়েলে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ২৫০ জন ও আরও ১ হাজার ৭০০ ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দেওয়ার প্রস্তাবকে বড় নিরাপত্তা ছাড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভুক্তভোগী ইসরায়েলি পরিবারের সদস্যরা এবং ডানপন্থি রাজনৈতিক দলগুলো এর তীব্র বিরোধিতা করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এদিকে ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে ওই ২৫০ বন্দির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে বিল পাসের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দ্বিতীয় সংকট হচ্ছে হামাসকে সাধারণ ক্ষমা প্রসঙ্গ। হামাস যোদ্ধাদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ও অবাধ চলাচলের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাবে আতঙ্কে রয়েছে ইসরায়েলের সাধারণ নাগরিকরা। এর ফলে হামাস বিদেশ থেকে আবারও কার্যক্রম চালাতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
ট্রাম্প ও সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের নেতৃত্বে একটি ‘শান্তি পরিষদ’ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ প্রস্তাব ফিলিস্তিনিদের কাছে বহিরাগত নিয়ন্ত্রণের মতো মনে হতে পারে এবং মার্কিন হস্তক্ষেপের বিষয়কে মেনে নাও নিতে পারে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের তত্ত্বাবধানে হামাসের অবকাঠামো ধ্বংস করা হবে এবং সব ধরনের অস্ত্র জমা নেওয়া হবে। তবে অতীতে এ ধরনের নজরদারির প্রস্তাব ব্যর্থ হওয়ায় এ প্রস্তাব বাস্তবায়ন কঠিন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হামাসের প্রতি যে কোনো ছাড়ের বিরোধিতা করবে ইসরায়েলে ডানপন্থি মন্ত্রী বেজালেল স্মোতরিচ, ইতামার বেন-গভির এবং ইয়েশা কাউন্সিল। অন্যদিকে পশ্চিম তীরের রামাল্লায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ মনে করছে, এতে তাদের অবস্থান দুর্বল হবে এবং এসব সংস্কারের শর্ত মেনে নেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
গাজার নিরস্ত্রীকরণের ওপর ভিত্তি করে ধীরে ধীরে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের কথা বলা হলেও, কতদিনের মধ্যে তা করা হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ধারণা দেওয়া হয়নি। এরই মধ্যে নেতানিয়াহু বলেছেন, ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকা থেকে সেনা প্রত্যাহার করা হচ্ছে না এবং ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে কোনো উদ্যোগ বলপ্রয়োগ করে হলেও ঠেকানো হবে। ইসরায়েলি এই প্রধানমন্ত্রী গাজা থেকে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) সদস্যদের প্রত্যাহারের জন্য চাপের মুখোমুখি হয়েছেন বলে সমালোচকদের মন্তব্যের জবাবে বলেছেন, ‘এটা ঘটছে না।’
গাজায় চলমান দুই বছরের গণহত্যা বন্ধ করার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের এ প্রস্তাব একটি বড় মাইলফলক। তবে পারস্পরিক অবিশ্বাস, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ, শর্তের অপব্যবহারের আশঙ্কা ও বাস্তবায়নের পথে একাধিক বড় বাধা চুক্তিকে কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ করে দিতে পারে। ইসরায়েল ফিলিস্তিনের মধ্যে হওয়া ঐতিহাসিক অন্যান্য চুক্তির মতো এ শান্তি প্রস্তাবও ব্যর্থ হতে পারে।