

প্রাগৈতিহাসিক ইউরোপে মানুষ কেবল পরিবেশের সহযাত্রীই ছিল না, বরং কৃষি বা স্থায়ী বসতির আবির্ভাবেরও বহু আগে থেকে তারা তাদের চারপাশের পরিবেশকে সক্রিয়ভাবে বদলে দিয়েছিল। নতুন এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ছোট ছোট শিকারি-সংগ্রাহক দলও ভূমির রূপান্তরে ভূমিকা রেখেছিল। আগুনের ব্যবহার ও শিকারের মাধ্যমে নিয়ান্ডারথাল বা প্রাচীন মানুষরা কয়েক হাজার বছর আগে ইউরোপের ভূদৃশ্যে দৃশ্যমান চিহ্ন রেখে গিয়েছিল।
ধারণা করা হয়, প্রায় ১০ হাজার বছর আগে কৃষির সূচনার সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশে মানুষের প্রভাব শুরু হয়। কিন্তু নতুন এ গবেষণার ফল তার বিপরীত চিত্র তুলে ধরে। এতে দেখা গেছে, বহু হাজার বছর আগে থেকে প্রাচীন মানুষ ও আদিম আধুনিক মানুষ উভয়েই ইউরোপের বাস্তুতন্ত্র গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে।
বিজ্ঞানীরা কম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমে পরীক্ষা করেন যে জলবায়ু, বন্য প্রাণী, আগুন ও মানুষের কার্যকলাপ উদ্ভিদের ওপর কীভাবে প্রভাব ফেলেছিল। গবেষণায় ইউরোপের অতীতের দুটি উষ্ণ সময়কাল—সর্বশেষ হিমবাহ-পরবর্তী উষ্ণ যুগ ও প্রারম্ভিক হোলোসিন যুগ-বিবেচনা করা হয়। সিমুলেশনের ফল জীবাশ্মীভূত পরাগের তথ্যের সঙ্গে তুলনা করে দেখা হয়, মানুষের কার্যক্রম উদ্ভিদের আচ্ছাদনকে কীভাবে রূপ দিয়েছে। গবেষকরা যখন শিকার ও আগুনের ব্যবহারের মতো মানুষের কার্যক্রমগুলো যুক্ত করেন, তখন তথ্যগুলো অনেক বেশি বোধগম্য হয়ে ওঠে।
এ গবেষণায় যুক্ত অরহাস বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক জেন্স-ক্রিশ্চিয়ান স্বেনিং বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, বৃহৎ তৃণভোজী প্রাণী এবং প্রাকৃতিক দাবানল—কেবল এগুলো দিয়ে পরাগের তথ্যের ফলাফল ব্যাখ্যা করা যায় না। সমীকরণে মানুষকে এবং মানুষের সৃষ্ট দাবানল ও শিকারের প্রভাবগুলোকে বিবেচনায় নেওয়ার ফলে তথ্যের সঙ্গে মডেলের মিল অনেক বেশি পাওয়া যায়।
সর্বশেষ হিমবাহ-পরবর্তী উষ্ণ যুগে প্রাচীন মানুষ হাতি, গণ্ডার, বাইসনের মতো বিশালাকার তৃণভোজী প্রাণীর পাশাপাশি বাস করত। কিন্তু প্রারম্ভিক হোলোসিন যুগে, যখন হোমো সেপিয়েন্সরা উপস্থিত ছিল, তখন অনেক প্রজাতিই বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল বা তাদের সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমে গিয়েছিল; যেখানে শিকার একটি বড় ভূমিকা পালন করেছিল।
স্বেনিং ব্যাখ্যা করেন, প্রাচীন মানুষ বিশালাকার হাতি শিকারও করত। শিকারের একটি শক্তিশালী পরোক্ষ প্রভাবও ছিল। কম চারণকারী প্রাণী মানে বেশি গাছপালা ঘন হয়ে ওঠা। তবে, প্রাচীন মানুষদের সংখ্যা কম হওয়ায় তাদের প্রভাব সীমিত ছিল। তারা বড় প্রাণীদের বা তাদের বাস্তুতান্ত্রিক ভূমিকা সম্পূর্ণ নির্মূল করতে পারেনি, যা পরবর্তী সময়ে আধুনিক মানুষের ক্ষেত্রে ঘটেছে।
সিমুলেশন অনুযায়ী, মেসোলিথিক যুগের শিকারি-সংগ্রাহকদের কর্মকাণ্ড উদ্ভিদের প্রকারের বণ্টনের ৪৭ শতাংশ পর্যন্ত প্রভাবিত করতে পারত। গবেষণার প্রধান লেখক আনাস্তাসিয়া নিকুলিনা বলেন, প্রাচীন মানুষদের প্রভাব কম ছিল, কিন্তু তা এখনো পরিমাপযোগ্য।
এ গবেষণায় সমগ্র ইউরোপজুড়ে সংগ্রহ করা বিপুল পরিমাণ জীবাশ্মীভূত পরাগের তথ্য এবং উন্নত কম্পিউটার মডেলিং ব্যবহার করা হয়েছে, যা প্রাগৈতিহাসিক যুগেই মানুষের পরিবেশ গঠনকারী ভূমিকার নতুন প্রমাণ উপস্থাপন করেছে। সূত্র: আর্থ ডট কম।