

বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার কিচকে অবস্থিত ‘আফাকু কোল্ড স্টোরেজ’-এর নামে ৩৭ কোটি টাকার ঋণখেলাপি রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ বি এম নাজমুল কাদির শাহজাহান চৌধুরী এই ঋণ পুনঃতপশিলের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন করেছেন। এখন সেই ঋণ পুনঃতপশিলের তোড়জোড় চলছে। তবে বিষয়টি নিয়ে ইসলামী ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংক পরস্পরের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নাজমুল কাদির শাহজাহান চৌধুরী শিবগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এবং পৌরসভার বানাইল এলাকার বাসিন্দা। ৫ আগস্টের পর তার বিরুদ্ধে বগুড়া সদর এবং শিবগঞ্জ থানায় হত্যা, নাশকতা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মোট ৯টি মামলা হয়। এরপর তিনি সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যান এবং বর্তমানে সেখানে অবস্থান করছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের বগুড়ার বড়গোলা শাখার অর্থায়নে নির্মিত হয়েছিল আফাকু কোল্ড স্টোরেজ। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির ঋণ স্থিতি প্রায় ৩৭ কোটি টাকা।
তবে পলাতক আসামি হয়েও এ বি এম নাজমুল কাদির শাহজাহান ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি সহায়তার আলোকে ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ঋণটি পুনঃতপশিলের আবেদন করেন। বাংলাদেশ ব্যাংক সেই আবেদন অনুমোদন করে পরবর্তী সময়ে ইসলামী ব্যাংককে অনুমোদনের কপিও পাঠায়।
ওই নীতি সহায়তা পাওয়ার যোগ্যতার শর্ত ছিল, যাদের ৫০ কোটি বা তার বেশি পরিমাণের খেলাপি ঋণ রয়েছে, শুধু তারাই এ সুবিধা গ্রহণ করতে পারবে। অথচ আফাকু কোল্ড স্টোরেজের ঋণ পরিমাণ ৫০ কোটির কম হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি এ যোগ্যতার আওতায় পড়ে না। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ব্যাংক নীতিমালা উপেক্ষা করে প্রতিষ্ঠানটিকে সহায়তা দিয়েছে।
পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এ বি এম নাজমুল কাদির শাহজাহান চৌধুরী এবং তার স্ত্রী ইসমত আরা লাইজু ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট সরকারের পরিবর্তনের পর ১৯ সেপ্টেম্বর দেশ থেকে পালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যান। তার বিরুদ্ধে বগুড়া সদর এবং শিবগঞ্জ থানায় হত্যা ও নাশকতার অভিযোগে ৯টি মামলা রয়েছে। স্পেশাল ব্রাঞ্চ এ প্রতিবেদনটি বাংলাদেশ ব্যাংক এবং ইসলামী ব্যাংক বরাবর প্রেরণ করে। বাংলাদেশ ব্যাংকও ওই প্রতিবেদন ইসলামী ব্যাংককে অবহিত করে।
এসব তথ্য থাকা সত্ত্বেও ইসলামী ব্যাংক বগুড়া বড়গোলা শাখা ঋণটি পুনঃতপশিলের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়, ডাকযোগে, হোয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জার ব্যবহার করে আবেদন এনে নিয়মবহির্ভূতভাবে নতুন করে ঋণ পুনঃতপশিলের তোড়জোড় চলছে।
অথচ দেশের বিদ্যমান ব্যাংকিং আইনে স্পষ্ট বলা আছে—বিদেশে পলাতক আসামির কোনো স্বাক্ষরকৃত আবেদন বা কোম্পানির রেজল্যুশন কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান গ্রহণ করে তা কার্যকর করতে পারে না।
এ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে—জুলাই গণহত্যা মামলার পলাতক আসামি হয়েও কীভাবে একজন ব্যক্তি কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে ব্যাংকের আবেদনপত্রে স্বাক্ষর করেন? এতে প্রমাণিত হয়, ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বরের নীতি সহায়তার আলোকে করা আবেদনটি ছিল মিথ্যা এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
বিষয়টি নিয়ে ইসলামী ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংক পরস্পরের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করছে। ইসলামী ব্যাংক বড়গোলা শাখার ব্যবস্থাপক তৌহিদ রেজা ঋণ পুনঃতপশিলের আবেদন করার কথা নিশ্চিত করে বলেন, ‘বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক দেখাশোনা করছে। তারাই ভালো বলতে পারবে।’
তবে বাংলাদেশ ব্যাংক এর দায় নিতে নারাজ। বাংলাদেশ ব্যাংকের বগুড়া শাখার নির্বাহী পরিচালক সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আফাকু কোল্ড স্টোরেজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বাংলাদেশ ব্যাংকে কোনো আবেদন করেননি। আমাদের কাছে তার কোনো তথ্য নেই। তিনি আবেদন করেছেন তার ব্যাংকে। ঋণ অনুমোদন করলে সেটা তাদের বিষয়।’