

ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার নিভৃত পল্লিতে আজও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একসময়ের প্রতাপশালী জমিদারির স্মারক—বাইশরশি জমিদারবাড়ি। অবহেলা, সঠিক পরিকল্পনার অভাব আর প্রশাসনিক উদাসীনতায় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও নান্দনিক স্থাপত্যের অপূর্ব এ নিদর্শনটি আজ ধ্বংসের মুখে। প্রতিনিয়ত চুরি হচ্ছে অমূল্য প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ, চারপাশ ঘিরে বাড়ছে ভূমিদস্যুদের থাবা। অথচ সংস্কারের উদ্যোগ নিলে এটি হতে পারত জেলার অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র।
ফরিদপুর জেলা শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে সদরপুর উপজেলার আটরশিতে এই জমিদারবাড়ির অবস্থান। ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ১৭শ শতকের গোড়ার দিকে লবণ ব্যবসার মাধ্যমে বিপুল অর্থের মালিক হয় সাহা পরিবার। পরে তারা একে একে ২২টি পরগনা বা জোত মহল কিনে জমিদারি প্রথার সূচনা করে। ১৮শ শতক থেকে শুরু করে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ পর্যন্ত ভারতবর্ষজুড়ে এই পরিবারের খ্যাতি ও প্রতিপত্তি ছিল সুপরিচিত।
একসময় প্রায় ৫০ একর জমির ওপর বিস্তৃত এই বিশাল জমিদার বাড়িতে ছিল বাগানবাড়ি, শান বাঁধানো পুকুর, পূজামণ্ডপ এবং দ্বিতল বিশিষ্ট ছোট-বড় ১৪টি দালানকোঠা। বর্তমানে প্রায় ৩০ একর জমি টিকে থাকলেও বাকিটা চলে গেছে দখলদারদের হাতে। ঐতিহাসিক এ স্থাপনার কারুকার্যখচিত দরজা-জানালা আর লোহার অলংকরণ আজও তৎকালীন আভিজাত্যের সাক্ষ্য বহন করে। তবে সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে চৌদ্দটি দালানই এখন জরাজীর্ণ।
বর্তমানে এ ঐতিহাসিক স্থাপনাটি কার্যত অরক্ষিত। মূল্যবান কাঠের দরজা, লোহার কারুকার্য এবং প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো একে একে লুট হয়ে যাচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতে বাড়িটি অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়, এমনকি দিনে-দুপুরেও এখানে ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা ঘটে। যদিও ভবনের ভেতর উপজেলা ভূমি অফিস, ইউনিয়ন ভূমি অফিস এবং বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের অফিস রয়েছে, তবু স্থাপনাটি সংরক্ষণে কোনো কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই।
জানা যায়, ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত জমিদাররা কলকাতা থেকেই তাদের সম্পত্তি দেখাশোনা করত। জমিদারি প্রথা বাতিলের পর জমিদার সুকুমার রায় বাহাদুর ছাড়া পরিবারের অন্য সদস্যরা কলকাতা চলে যান। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর তিনি আত্মহত্যা করলে অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে বাড়িটি।
সদরপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) জানান, জমিদার বাড়ির জমিগুলো বর্তমানে ‘অর্পিত সম্পত্তি’ হিসেবে শ্রেণিভুক্ত হয়েছে। তবে এসব জমি নিয়ে সরকারের সঙ্গে জমিদারদের বংশধরদের মামলা আদালতে চলমান রয়েছে।
এ আইনি জটিলতাকে বাড়িটির সংস্কার কাজে অন্যতম অন্তরায় বলে মনে করা হচ্ছে। স্থানীয়রা বলছেন, বাইশরশি জমিদার বাড়ি শুধু একটি পরিত্যক্ত ভবন নয়, এটি ইতিহাসের জীবন্ত দলিল। কার্যকর উদ্যোগ না নিলে অচিরেই এ গৌরবময় অতীত চিরতরে ধুলোয় মিশে যাবে। তাদের দাবি, অবিলম্বে এ জমিদার বাড়িকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় এনে সংস্কার করা হোক। পরিকল্পিত উন্নয়ন করা গেলে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন কেন্দ্রে রূপ নিতে পারে। এতে একদিকে যেমন বাংলার ইতিহাস ও স্থাপত্য রক্ষা পাবে, অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আসবে।