

নাটোরের চারটি আসনের দুটিতেই বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বিএনপি। এ দুটি আসনে দলটি সহজ জয় পাবে বলে স্থানীয়রা মনে করছেন। বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রার্থী থাকায় নাটোর-১ (লালপুর-বাগাতিপাড়া) ও নাটোর-৩ (সিংড়া) আসনে অবশ্য বিএনপি প্রার্থীরা কিছুটা হোঁচট খেতে পারেন। এদিকে জেলা বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীরা মনে করছেন, শক্ত নেতৃত্বের মাধ্যমে ২০০১ সালের মতো জেলার ৪টি আসনেই দল মনোনীত প্রার্থীকে জয়ী করিয়ে আনা সম্ভব। এ বিষয়ে দলটির কেন্দ্রীয় নেতা, প্রায় ৩০ বছর জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করা অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালকদার দুলু বলেন, কেন্দ্র থেকে দায়িত্ব পেলে তিনি দল মনোনীত প্রার্থীদের পক্ষে সবাইকে একাট্টা করার ব্যাপারে দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত রয়েছেন। দুলু বিশ্বাস করেন, তার দীর্ঘ দিনের নেতৃত্বকে জেলা
বিএনপির সব স্তরের কর্মী-সমর্থক যেভাবে আস্থায় রেখেছিলেন, এখনো তারা সেভাবেই তার প্রতি আস্থা রাখেন। সাবেক এই মন্ত্রী মনে করেন, এখনো সব ভেদাভেদ ভুলে দলীয় প্রার্থীদের বিজয়ী করে আনা সম্ভব।
নাটোর-১: লালপুরে ১০টি ইউনিয়ন এবং একটি পৌরসভা, অন্যদিকে বাগাতিপাড়ায় পাঁচটি ইউনিয়ন একটি পৌরসভা নিয়ে নাটোর-১ আসন গঠিত। এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন চেয়ারম্যানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির বিশেষ সহকারী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুল। এ আসনে পুতুলের ছোট ভাই ডা. ইয়াসির আরশাদ রাজন শেষ দিনে ভোট থেকে সরে দাঁড়ালেও থেকে গেছেন বিএনপির সহদপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু। মূলত স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে টিপু এবং বিএনপি প্রার্থী পুতুলের মধ্যেই হবে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা। নিজ দলের নেতাই চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন ধানের শীষের প্রার্থীকে।
অন্যদিকে, এ আসনে জামায়াতের একক প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন মাওলানা আবুল কালাম আজাদ। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন থেকে আব্দুল্লাহহেল বাকী গণসংযোগ করছেন। বরাবরের মতো এ আসনে জামায়াতে ইসলামের ভোট অন্যান্য আসনের তুলনায় অনেক কম।
ফারজানা শারমিন পুতুল বলেন, দল আমার ওপর আস্থা রেখে মনোনয়ন দিয়েছে। এ আসনের মানুষও আমার ওপর আস্থা রেখে ধানের শীষকে বিজয়ী করবে। তিনি বলেন, আশা করি ভুল অনুধাবন করে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী শেষ পর্যন্ত ধানের শীষের পক্ষে কাজ করবেন।
স্বতন্ত্র প্রার্থী তাইফুল ইসলাম টিপু বলেন, আমার বিশ্বাস এ আসনের মানুষ আমার সঙ্গে আছে। আমিই বিজয়ী হব।
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা আবুল কালাম আজাদ বলেন, ভোটাররা দাঁড়িপাল্লার পক্ষে ইতিবাচক সাড়া দিচ্ছেন, যা আমাকে জয়ের ব্যাপারে প্রত্যয়ী করে তুলছে। মানুষ পরিবর্তনের রায় দাঁড়িপাল্লার মাধ্যমেই দেবে।
নাটোর-২: সদর ও নলডাঙ্গা উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর শক্ত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। এখানে দুলুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের প্রার্থী জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির অধ্যাপক ইউনুস আলী হলেও আসনটি বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা রুহুল কুদ্দুস দুলু একজন হেভিওয়েট প্রার্থী। সাবেক মন্ত্রী হিসেবে এবং অতিতের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড বিবেচনায় নিয়ে স্থানীয় ভোটাররা দুলুকেই বিপুল ভোটে বিজয়ী করবেন বলে মনে করা হচ্ছে। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন থেকে মাওলানা মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী ও জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক রকিব উদ্দিন কমল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন।
রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেন, আমাকে ভোট দেওয়ার জন্য মানুষ অপেক্ষা করে আছে। আমার বিশ্বাস চার আসনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোটের ব্যবধানে ধানের শীষ জয়ী হবে এখানে। সেইসঙ্গে নাটোরবাসীর অভাব ও বঞ্চনার সমাপ্তি ঘটবে। তিনি আরও বলেন, আমি বিজয়ী হলে শুধু নাটোর-২ আসন নয়, সমস্ত জেলার উন্নয়নে সর্বাত্মক ভূমিকা রাখব।
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ইউনুস আলী বলেন, আমি খুবই ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছি ভোটারদের। এ আসনে জামায়াতের বিজয়ের মধ্য দিয়ে মানুষ মুক্তির স্বাদ পাবে।
নাটোর-৩: সিংড়া উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে বিএনপি ও এনসিপি অবসরপ্রাপ্ত দুজন স্বনামধন্য শিক্ষককে মনোনয়ন দিয়েছে। জীবনে প্রথমবারের মতো তারা দুজনই জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চলেছেন। নাটোর-৩ আসনে জেলা বিএনপির সদস্য অধ্যক্ষ আনোয়ারুল ইসলাম আনুকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে বিএনপি। তিনি সিংড়া দমদমা পাইলট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ। জামায়াতে ইসলামী থেকে মনোনয়ন পেয়ে ভোটের মাঠে ছিলেন অধ্যাপক মো. সাইদুর রহমান। মনোনয়ন প্রত্যাহারের মাত্র তিন দিন আগে জামায়েত নেতৃত্বাধীন ১০ দল এ আসনে জোট প্রার্থী হিসেবে এনসিপির জার্জিস কাদেরের নাম ঘোষণা করে। এস এম জার্জিস কাদির রাজশাহী নিউ ডিগ্রি সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ। ১০ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে জার্জিস কাদেরের নাম ঘোষণার পরের দিন থেকেই জুলাই যোদ্ধাসহ বিভিন্ন সংগঠন তার বিরুদ্ধে মানববন্ধন, পথসভা এবং বিক্ষোভ মিছিল করে। অনেককেই বলতে শোনা যায়, জামায়াতের প্রার্থীর জয়ের ব্যাপারে অনেকটা আশাবাদী ছিলেন। কিন্তু জার্জিস কাদেরকে মনোনয়ন দেওয়ায় এ আসনটি বিএনপির জন্য নিষ্কণ্টক হয়ে গেল।
তবে জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক দাউদার মাহমুদ দলেই আনুর আরেক শক্ত প্রতিপক্ষ। দাউদারের এ আসনে রয়েছে নিজস্ব ভোটব্যাংক। মনোনয়ন বঞ্চিত হওয়া দাউদারের সমর্থকদের ভোট এখানে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। জামায়াতের প্রার্থী অধ্যাপক সাইদুর রহমানের মনোনয়ন প্রত্যাহারের পর এখানেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থী দাউদার মাহমুদের মধ্যে।
বিএনপি প্রার্থী আনোয়ারুল ইসলাম আনু বলেন, সিংড়া বিএনপির ঘাঁটি। আমি আশাবাদী জীবনে প্রথম ভোটে বিজয়ী হয়ে আসনটি দলকে উপহার দিতে পারব।
এনসিপির প্রার্থী এস এম জার্জিস কাদির বলেন, সিংড়ার মানুষ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের এমপি বানিয়ে নিজেদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। তাই তারা এবার পরিবর্তন চান। সিংড়াবাসীর দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও যৌক্তিক অধিকার আদায়ে এনসিপিই ভূমিকা রাখতে পারবে।
নাটোর-৪: গুরুদাসপুর ও বড়াইগ্রাম উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন গুরুদাসপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল আজিজ। অন্যদিকে, জামায়াতের একক প্রার্থী জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি অধ্যাপক মাওলানা আব্দুল হাকিম। আসনটিতে বিএনপি ও জামায়াতের দুই প্রার্থী সমান তালে মাঠে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। দুই উপজেলার মধ্যে বড়াইগ্রামের বনপাড়া খ্রিষ্টান সম্প্রদায় অধ্যুষিত। তাই এই ভোট ব্যাংক যে প্রার্থী পাবেন তিনি এগিয়ে যাবেন জয়ের পথে।
বিএনপি প্রার্থী আব্দুল আজিজ বলেন, ভোটারদের কাছে আমি পূর্বপরীক্ষিত। তারা আমাকে ইউপি ও উপজেলা চেয়ারম্যান করেছে। আশা করি ভোট দিয়ে এবার এমপিও বানাবেন। জয়ের ব্যাপারে আমি আশাবাদী। এ আসনে জামায়াতের ভোট খুবই নগণ্য। এ আসনে আমি জনগণের সমর্থন নিয়ে বিপুল ভোটে বিজয়ী হব।
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা আব্দুল হাকিম বলেন, ন্যায়, ইনসাফ ও সব ধর্মের মানুষের কল্যাণের উদ্দেশ্যে আমি নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। আমি ভাইস চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় জনগণ যেভাবে আমাকে সহায়তা করেছে, এবারও আমাকে তারা এমপি হিসেবে সংসদে পাঠাবে।