

অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের শেষ মুহূর্তে এসে হাজার কোটি টাকার বাস কেনার প্রক্রিয়ার শুরু করা হয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিদায় নিতে যাচ্ছে বিদ্যমান সরকার। তার আগের মঙ্গলবার ভোটের আগে শেষ কর্মদিবস থাকবে এই সরকারের। আর তার ঠিক দুই দিন আগে প্রায় ১ হাজার ১৩৩ কোটি টাকার প্রকল্পে বাস কেনার জন্য ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া করে যাচ্ছে সরকার। এর মধ্য দিয়ে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দিয়ে যাওয়া হচ্ছে কি না—সে প্রশ্নও উঠছে।
গত ডিসেম্বরে ৩৪০টি বাস কেনার প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। ওই মাসের শুরুতে ঠিকাদার নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেয় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি)। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ২৯ জানুয়ারির মধ্যে দরপত্রের কার্যক্রম নিষ্পত্তি হওয়ার কথা। এর পরও আগ্রহী ঠিকাদারদের জন্য দরপত্র জমা দেওয়ার সময় আরেক দফা বাড়ানো হয়েছে। আগামী রোববার পর্যন্ত দরপত্র জমা দেওয়া যাবে এবং সেদিনই দরপত্র উন্মুক্ত করা হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গতকাল বুধবার পর্যন্ত মোট ৮টি প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দিয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, দরপত্র উন্মুক্ত হওয়ার পর অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করা হয়। অংশগ্রহণকারীদের মধ্য সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকবে। দরপত্র উন্মুক্ত হওয়ার পর অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে কারিগরি ও আর্থিক যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী, আহ্বান করা এই দরপত্র বিজ্ঞপ্তির আয়ু তিন মাস। অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে ঠিকাদার নিয়োগ চূড়ান্ত করতে হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে বাস সংগ্রহের প্রকল্পের পরিচালক কাজী আইয়ুব আলী কালবেলাকে বলেন, ‘শেষ দিনে এসে কোনো ধরনের তাড়াহুড়া করা হচ্ছে—এ কথা সঠিক নয়। প্রকল্পের অর্থায়নের গাইডলাইন অনুযায়ী আমরা কাজ করছি। নিয়ম মেনে সব কাজ হচ্ছে।’
বিআরটিসির জন্য ৩৪০টি সিএনজি সিঙ্গেল ডেকার এসি বাস কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কোরিয়ার এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংকের ঋণে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। তবে দরপত্রে দেওয়া কিছু শর্ত ও আর্থিক কাঠামো ঘিরে স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিআরটিসির প্রকাশিত আন্তর্জাতিক দরপত্র বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, প্রকল্পের আওতায় বাসের পাশাপাশি যন্ত্রপাতি ও রক্ষণাবেক্ষণ সরঞ্জাম কেনা হবে। প্রতিটি বাস সম্পূর্ণ নির্মিত অবস্থায় সরবরাহ করতে হবে।
দরপত্রে অংশ নিতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে ১০ লাখ মার্কিন ডলার জামানত হিসাবে দিতে হবে। দরদাতাকে অন্তত ২০ বছরের বাস সরবরাহ অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। পাশাপাশি গত ২০ বছরে বিদেশে কমপক্ষে ২০০টি ডিজেল বাস এবং কমপক্ষে ৩৪০টি সিএনজি বাস রপ্তানির অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। আর প্রতিবছর কমপক্ষে ২৫০টি সিএনজি সিঙ্গেল ডেকার এসি বাস তৈরির সক্ষমতা থাকতে হবে বলেও শর্ত দেওয়া হয়েছে। দরপত্রে কারখানা ও উৎপাদন সুবিধার প্রমাণ জমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
পরিবহন খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একসঙ্গে এই দুই শর্ত পূরণ করা প্রতিষ্ঠান খুব বেশি নেই। এতে করে দরপত্র কার্যত কয়েকটি নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক কোম্পানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়তে পারে। আর এত বড় সক্ষমতা থাকা প্রতিষ্ঠান সাধারণত বড় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড।
বিআরটিসি বলছে, আগে টেকনিক্যাল সাব-কমিটি দরপত্র যাচাই করবে। কারিগরি দিক থেকে উত্তীর্ণ হলে তবেই আর্থিক প্রস্তাব খোলা হবে। সবচেয়ে কম দরদাতাকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচন করা হবে।
তবে অতীতে বিআরটিসির বিভিন্ন প্রকল্পে কারিগরি মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনেক সময় ‘টেকনিক্যালি নন-রেসপনসিভ’ দেখিয়ে প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠান বাদ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে মূল প্রকল্প উন্নয়ন প্রস্তাব (ডিপিপি) ও ঋণচুক্তির শর্তের বাইরে এসে ঠিকাদার নিয়োগের শর্ত সহজ করা হয়েছে। মূল প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, বাসগুলো কোরিয়ান নির্মিত হতে হবে। এখন শর্ত অনুযায়ী, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যেসব বাস সরবরাহ করবে সেগুলো কোরিয়ায় তৈরি না হলেও হবে। শুধু প্রতিষ্ঠানটি কোরিয়ান হলেই হবে।
জানতে চাইলে বিআরটিসির চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা বলেন, ‘কোনো কিছুই আমাদের একক সিদ্ধান্তে হচ্ছে না। ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান বড় ভূমিকা রাখছে। নির্বাচনের আগে এসে টেন্ডার হচ্ছে বিষয়টা এমন না। এটা রেগুলার প্রসেস। অনেক দিন জট লেগে ছিল। আমি এসে জট খুলেছি। পুরো টেন্ডারিং প্রক্রিয়া শেষ হতে ৪৫ থেকে ৬০ দিন সময় লাগবে। ফলে এই সরকারের অধীনে চূড়ান্ত হবে না। আর আমরা কোনো শর্ত পরিবর্তন করিনি। আবার ঠিকাদার নিয়োগের পর চুক্তির সময় থেকে বাস সরবরাহ করতে অন্তত ১৫ মাস সময় দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সময় বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।’
বিআরটিসি ৩৪০টি সিএনজিচালিত একতলা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস সংগ্রহ প্রকল্পটি ২০২৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদন পায়। দীর্ঘ আড়াই বছরেও এই প্রকল্পের কাজে কোনো অগ্রগতি হয়নি। প্রশাসনিক জট, দরপত্র প্রক্রিয়ায় বিলম্ব এবং বিদেশি ঋণদাতা সংস্থার নানা জটিলতায় প্রকল্পটি কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। তবে এখন হঠাৎ করেই সব কাজে গতি পেয়েছে।
মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী দেড় বছরের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা ছিল। লক্ষ্য ছিল রাজধানীর নগর পরিবহন ব্যবস্থা আধুনিক করা, বাস রুট পুনর্বিন্যাস কর্মসূচিকে সহায়তা করা এবং ধাপে ধাপে তেলচালিত পুরোনো বাস তুলে নেওয়া। পাশাপাশি রাজধানীর বাইরে আন্তঃজেলা পথে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব বাস চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, মোট ৩৪০টি বাসের মধ্যে ১৪০টি রাজধানীর বিভিন্ন রুটে এবং বাকি ২০০টি রাজধানীর বাইরে পরিচালিত হওয়ার কথা। প্রকল্পের মোট ব্যয়ের বড় অংশ, ৮২৯ কোটি টাকা আসার কথা দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহযোগিতা তহবিলের ঋণ থেকে। অবশিষ্ট ৩০৫ কোটি টাকা দেবে বাংলাদেশ সরকার।
কিন্তু অনুমোদনের পরপরই শুরু হয় সময়ক্ষেপণ। একনেকের অনুমোদনের পর প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ এবং কোরীয় পরামর্শক নিয়োগ সম্পন্ন করতেই লেগে যায় প্রায় ১৫ মাস। এরপর দরপত্র প্রস্তুত করে ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে তা দক্ষিণ কোরিয়ার এক্সিম ব্যাংকের কাছে পাঠানো হয়। সেখানে দরপত্র নথি নিয়ে একাধিক দফায় মন্তব্য আসে। প্রতিবারই সংশোধন করে ফের নথি পাঠাতে হয়।
বিআরটিসি সূত্রে জানা যায়, দরপত্র নথির ওপর মোট ৯টি মন্তব্য আসে। এসব মন্তব্য নিষ্পত্তি করতে প্রকল্পের সময়সূচি আরও পিছিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর দক্ষিণ কোরিয়ার এক্সিম ব্যাংক দরপত্র নথির চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। এরপর গত ১ ডিসেম্বর পত্রিকায় দরপত্র আহ্বানের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ বুয়েটের অধ্যাপক শামছুল হক কালবেলাকে বলেন, ‘বিআরটিসির বাস কিনতে এত আগ্রহী কেন? বিআরটিসির তো বাস রাখারই কোনো জায়গা নেই। ঢাকার রাস্তা দখল করে তারা বাস রাখে, এতে এই প্রতিষ্ঠানের লজ্জা হওয়া উচিত। কেনার আগে বিআরটিসির উচিত বাস কোথায় রাখবে এবং কীভাবে চালাবে এগুলো পরিষ্কার করা।’