

কৃষকের জমি, সরকারি রাস্তা কিছুই খেতে বাদ রাখেনি একটি আবাসন কোম্পানি। স্থানীয়দের ৪০ বিঘার বেশি জমি জোর করে দখলের পাশাপাশি সরকারি হালট (গ্রামীণ রাস্তা) ভরাট করে প্লট বানিয়ে বিক্রি করে দিয়েছে। জোরজবরদস্তির এ অভিযোগ, গাজীপুরের টঙ্গীতে ‘নর্থ টাউন’ আবাসন প্রকল্পের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের ভাষ্য, আবাসন কোম্পানিটি টঙ্গীতে এক ‘নয়া উপনিবেশ’ প্রতিষ্ঠা করেছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ থেকে আরও জানা যায়, কৃষিজমিতে রাতের আঁধারে বালু ফেলে ভরাট করে প্লট বানিয়েছে ‘নর্থ টাউন’। প্রকল্পের কারণে ফসলি জমিতে পানি জমে চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে আরও প্রায় ৩০ বিঘা জমি। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা ক্ষতিপূরণ চাইতে গেলে উল্টো মামলা-হামলার শিকার হচ্ছেন। প্রকল্পটির কারণে গুটিয়া, রাজনগর ও কাঞ্চন নগরসহ বেশ কয়েকটি গ্রামের মানুষের স্বাভাবিক চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। দেয়াল তুলে গেট লাগিয়ে পথ রুদ্ধ করায় স্থানীয়দের ঘুরপথে দীর্ঘ দূরত্ব হেঁটে পাড়ি দিতে হচ্ছে। একই সঙ্গে বছরের পর বছর জমি বেদখলে থাকায় কৃষকরা ফসল ফলাতে পারছেন না, ফলে পড়েছেন আর্থিক ক্ষতির মুখে। আবাসন কোম্পানিটির রয়েছে নিজস্ব লাঠিয়াল বাহিনী। কেউ প্রতিবাদ করলে এই বাহিনী দিয়ে তাদেরকে এলাকা ছাড়া করাসহ নানা রকম হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়।
এসবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, গাজীপুরের জেলা প্রশাসক, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বরাবর কয়েকটি গ্রামের মানুষ গণস্বাক্ষরসহ লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তাতেও মেলেনি প্রতিকার।
গণস্বাক্ষরসহ অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন টঙ্গী পশ্চিম থানার ওসি মো. আরিফুর রহমান। কালবেলাকে তিনি বলেন, ‘স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে আমি ওনাদেরকে (আবাস কোম্পানি কর্তৃপক্ষ) এরই মধ্যে থানায় ডেকেছি। জানতে চেয়েছি তারা কী কারণে রাস্তা বন্ধ করল। তারা সময় চেয়েছে। বলেছে তাদের আরও কিছু কাগজপত্র জোগাড় করতে সময় লাগবে।’
লিখিত অভিযোগে স্থানীয়রা বলেছেন, প্রায় ২৫ বছর আগে এই এলাকায় ‘নর্থ টাউন’ নামে আবাসন কোম্পানিটি কাজ শুরু করে। তারা নিচু কৃষিজমি নামমাত্র মূল্যে এক এক করে কিনে ভরাট করতে শুরু করে। একপর্যায়ে অনেক জমি না কিনেও বালু ফেলে ভরাট করা হয়। সরকারি গ্রামীণ রাস্তাও ভরাট করে প্লট বানিয়ে এরই মধ্যে বিক্রি করে দিয়েছে।
তারা আরও বলছেন, নর্থ টাউন প্রকল্পের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে গুটিয়া গ্রাম এবং উত্তর-পূর্ব দিকে কাঞ্চননগর ও রাজনগর গ্রাম, যে কারণে প্রতিদিন হাজারো মানুষকে এদিক দিয়ে যাতায়াত করতে হয়। অথচ প্রকল্পের দক্ষিণ দিকের একাংশে সীমানা প্রাচীর তৈরি করে গেট বসানো হয়েছে। এটি সারাক্ষণ তালা দিয়ে রাখায় তিন গ্রামের লোকজনের চলাচলে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। বিশেষ করে কাঞ্চননগর গ্রামের লোকজনকে প্রায় দুই মাইল অতিরিক্ত হেঁটে যাতায়াত করতে হয়। বড় সমস্যা হয় কেউ অসুস্থ হলে। হাসপাতাল বা চিকিৎসা করাতে গেলে দীর্ঘপথ হেঁটে যেতে হয় তাদের। একইভাবে কৃষক তার উৎপাদিত সবজি মাথা করে নিয়ে যান। এ ছাড়া প্রকল্পের পাশে থাকা ব্যক্তিদের জমিতে যাতায়াত এবং কাজ করতেও বাধা দিচ্ছে তাদের আবাস কোম্পানির লাঠিয়াল বাহিনী।
সরেজমিন স্থানীয়দের অভিযোগের সত্যতা পেয়েছেন এ প্রতিবেদক। দেখা গেছে; শুধু কৃষিজমিই নয়, প্রকল্পের ভেতরে থাকা সরকারি হালট ভরাট করা হয়েছে। পুরো হালটে জমির পরিমাণ প্রায় ৪ বিঘা বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা যায়, হানিফ মাতাব্বরের সোয়া বিঘা, আমজাদ মাতাব্বরের দেড় বিঘা, হালিম ও তার পরিবারের সাড়ে তিন বিঘা, আদম আলী ও তার পরিবারের আট বিঘা, নূর ইসলামের দুই বিঘা এবং কাইয়ুম ও তার পরিবারের ১০ বিঘাসহ প্রায় ৪০ বিঘা জমি বালু ভরাট করে দখলে নিয়েছে ‘নর্থ টাউন’ আবাসন প্রকল্প। জমি থাকলেও তারা ফসল ফলাতে পারছেন না। স্থানীয়দের ভাষ্য, ওই এলাকায় প্রতি বিঘা জমির মূল্য ২ কোটি টাকারও বেশি।
ভুক্তভোগীরা জানান, দীর্ঘদিন তাদের কৃষিজমি বালু ফেলে ভরাট করে বেদখল করে রেখেছে নর্থ টাউন কর্তৃপক্ষ। অথচ তারা বারবার উপযুক্ত মূল্য এবং ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আশ্বাস দিয়েও বাস্তবায়ন করেনি। এসব জমিতে একাধিক ফসল ফলানো হতো। বালু ভরাট করায় দীর্ঘদিন ধরে কোনো ফসল করতে পারছেন না তারা। এর ফলে চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
নিজের ৮ বিঘা জমি বেদখল হওয়ার কথা জানিয়ে গুটিয়া গ্রামের হানিফ আলী বলেন, ‘আমার ৮ বিঘাসহ বিভিন্ন ব্যক্তির ৩০ বিঘার বেশি জমি ভরাট করে রেখেছে নর্থ টাউন কর্তৃপক্ষ। সরকারি হালট ভরাট করে বিক্রি করে ফেলেছে। তাদের প্রকল্পের কারণে অন্তত ৩০ বিঘা জমিতে পানি জমা হয়ে পুকুরে পরিণত হয়েছে। ফলে সেই জমিও চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। সেখানেও জমির মালিকরা কোনো ফসল ফলাতে পারছেন না।’
তাজুল ইসলাম নামে আরেক ব্যক্তি বলেন, প্রকল্পের পাশে তার নিজস্ব জমি রয়েছে। সেই জমি ক্রয় কিংবা অন্য কোথাও বদল করে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল তাকে। প্রস্তাব দিলেও তারা সেটা বাস্তবায়ন করেনি। উল্টো তার জমিতে যাতায়াত ও কাজ করতে বাধা দিচ্ছে প্রকল্প পাহারায় থাকা লোকজন। এমনকি কাজ অব্যাহত রাখায় তাকে হুমকিও দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তিনি থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাননি।
আইন অনুযায়ী কৃষিজমি ভরাট অবৈধ: ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩-এর ১১ ধারায় বলা হয়েছে—সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের স্বার্থযুক্ত বা জনসাধারণের ব্যবহার্য কোনো ভূমি যদি অবৈধ উপায়ে দখল বা উহাতে প্রবেশ করেন বা কোনো স্থাপনা বা কাঠামো নির্মাণ করেন তাহলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। একই আইনের ১২ ধারায় বলা হয়েছে, অবৈধভাবে সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের স্বার্থযুক্ত বা জনসাধারণের ব্যবহার্য কোনো ভূমি আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে ভরাট করে এর শ্রেণি পরিবর্তন করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
এ ছাড়া ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষি ভূমি সুরক্ষার উদ্দেশ্যে চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রণীত অধ্যাদেশের ১০ ধারায় বলা হয়েছে—কোনো ব্যক্তি কৃষিজমি, জলাধার বা জলাভূমি থেকে মাটি অপসারণ করলে; অথবা কৃষিভূমি, জলাধার মাটি, বালু বা অন্য কোনো বস্তু দ্বারা ভরাট করলে; অথবা কৃষিভূমি, জলাধারে কোনো বাণিজ্যিক আবাসন, রিসোর্ট, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, কারখানা বা অনুরূপ কোনো স্থাপনা নির্মাণ করলে তা হবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এজন্য দায়ী ব্যক্তি বিচারিক প্রক্রিয়ার অতিরিক্ত হিসাবে, সরকার বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নির্দেশ অনুসারে অপসারিত মাটি পুনঃস্থাপন অথবা ভরাটকৃত মাটি বা বালু বা অবকাঠামো অপসারণ করতে বাধ্য থাকবেন।
জানতে চাইলে পরিবেশ ও মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘কৃষিজমি ভরাট করা বেআইনি। যাদের জমি ভরাট করেছে তাদের ক্ষতিপূরণসহ জমি ফেরত দেওয়া উচিত। আর সরকারি রাস্তা কোনোভাবেই বিক্রি করার সুযোগ নেই। এটা জনগণের ব্যবহারের জন্য অবশ্যই অবমুক্ত রাখতে হবে। এই বিষয়ে অভিযোগ দিলে অবশ্যই প্রশাসনের উচিত হবে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া।’
যা বলছে নথ টাউন কর্তৃপক্ষ: অভিযোগের বিষয়ে জানতে গত শনিবার যোগাযোগ করা হয় নর্থ টাউন আবাসন প্রকল্পে পরিচালক হোসাইন মোহাম্মদ ফরহাদের সঙ্গে। তিনি প্রশ্ন শুনে মিটিংয়ে ব্যস্ত আছেন জানিয়ে পরদিন যোগাযোগ করতে বলেন। পরদিন রোববার ফের ফোন দিলে তিনি আবারও মিটিংয়ে ঢুকে গেছেন বলে জানান। এরপর জোরাজুরি করলে হোসাইন মোহাম্মদ ফরহাদ বলেন, ‘আমি তো এখানে চাকরি করি। তাই চাইলেও কিছু বলতে পারব না কর্তৃপক্ষের কনসার্ন।’ পরে প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে লিখিত প্রশ্ন পাঠিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে ব্যাখ্যা দেওয়ার অনুরোধ করলে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন।