

ফিফা বিশ্বকাপে মাঠের চারপাশে, স্টেডিয়ামের বড় পর্দায় এবং সমর্থকদের উৎসব এলাকায় সৌদি আরবের তেল কোম্পানি আরামকোর উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। ২০২৪ সালে ফিফার সঙ্গে বৈশ্বিক অংশীদারত্ব চুক্তি করার পর প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বকাপের একমাত্র জ্বালানি স্পন্সর হিসেবে নিজেদের ব্র্যান্ডকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছে। কিন্তু বিশ্বকাপের এই বর্ণিল আয়োজনের মাত্র ১০০ মাইল দূরে টেক্সাসের পোর্ট আর্থারে দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতা।
পোর্ট আর্থারের পশ্চিমাংশে বসবাসকারী অনেক মানুষের অভিযোগ, আরামকোর মালিকানাধীন মোটিভা তেল শোধনাগার বছরের পর বছর ধরে এমন দূষণ ছড়াচ্ছে, যা স্থানীয়দের স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। ২০১৭ সালে সৌদি আরবভিত্তিক আরামকো এই বিশাল শোধনাগারের একক মালিকানা গ্রহণ করে। প্রায় ৩ হাজার ৬০০ একরজুড়ে বিস্তৃত এই স্থাপনাটি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ তেল শোধনাগার এবং প্রতিদিন প্রায় ৬ লাখ ৫৪ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা জামাল জনসনের ভাষায়, এলাকায় ক্যানসার ও নানা জটিল রোগের ঘটনা অস্বাভাবিকভাবে বেশি। তিনি জানান, তার পরিবারে ক্যানসার ও মোটর নিউরন রোগে আক্রান্ত হয়ে একাধিক সদস্যের মৃত্যু হয়েছে। তার অভিযোগ, শোধনাগার থেকে নির্গত বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাব দীর্ঘদিন ধরে মানুষকে অসুস্থ করে তুলছে।
২০২১ সালের এক গবেষণায় পোর্ট আর্থারকে টেক্সাসের সবচেয়ে দরিদ্র শহর হিসেবে উল্লেখ করা হয়। শহরটির প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এখানকার ক্যানসারজনিত মৃত্যুহার টেক্সাসের গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি, বিশেষ করে কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর মধ্যে। শিশুদের হাঁপানির হারও জাতীয় গড়ের প্রায় দ্বিগুণ বলে ধারণা করা হয়। বাসিন্দাদের অভিযোগ, বাতাসে নিয়মিতভাবে বেনজিন, মিথেন, কার্বন ডাই-অক্সাইড, হাইড্রোজেন সালফাইড ও সালফার ডাই-অক্সাইডের মতো দূষণকারী পদার্থ ছড়িয়ে পড়ে। বেনজিনকে বিশেষভাবে ক্যানসার সৃষ্টিকারী রাসায়নিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিবেশগত নিয়ম লঙ্ঘনের কারণে মোটিভাকে একাধিকবার জরিমানার মুখে পড়তে হয়েছে। ২০২৩ সালে অনুমোদনহীন সালফার ডাই-অক্সাইড নির্গমনের ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটিকে জরিমানা করা হয়। এর আগেও দূষিত পানি নিঃসরণসহ বিভিন্ন ঘটনার জন্য বড় অঙ্কের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। পরিবেশকর্মী হিলটন কেলি, যিনি দীর্ঘদিন ধরে পোর্ট আর্থারের পরিবেশগত সমস্যা নিয়ে কাজ করছেন, বলেন শহরের অসংখ্য মানুষ অকালেই ক্যানসারে প্রাণ হারিয়েছেন। তার মতে, শিশুদের শ্বাসকষ্টের সমস্যাও আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। বিশ্বকাপে আরামকোর বিজ্ঞাপন যখন কোটি কোটি দর্শকের সামনে প্রতিষ্ঠানটির ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরছে, তখন পোর্ট আর্থারের অনেক বাসিন্দা মনে করেন তারা শিল্পদূষণের ভার বহন করলেও উন্নয়নের সুফল থেকে বঞ্চিত। তাদের কাছে বিশ্বকাপের উজ্জ্বল আলো পৌঁছায় না; বরং প্রতিদিনের বাস্তবতা হলো স্বাস্থ্যঝুঁকি, দূষণ এবং অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই।