

ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার ইকামতে দ্বীন মডেল কামিল মাদ্রাসা এমপিওভুক্ত শুধু আলিম স্তর পর্যন্ত। অথচ অনুমোদন ছাড়াই সেই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা জালিয়াতি করে বছরের পর বছর ধরে নিচ্ছেন ফাজিল ও কামিল স্তরের সরকারি বেতন-ভাতা। এমনকি আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হয়েও মো. আবু ইউছুফ মৃধা নিয়েছেন ফাজিল-কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষের বেতন স্কেল। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) তদন্তে এসব অনিয়ম ধরা পড়েছে। তদন্ত শেষে সংশ্লিষ্টদের কাছে সব মিলিয়ে আড়াই কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া শিক্ষার মানোন্নয়ন ও আর্থিক শৃঙ্খলা আনতে নানা সুপারিশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। ডিআইএ সূত্র বলছে, এই মাদ্রাসার শিক্ষক নিয়োগ থেকে নানা প্রক্রিয়ার রন্ধ্রে রন্ধ্রে রয়েছে অনিয়ম-দুর্নীতি। সব মিলিয়ে আড়াই কোটি টাকারও বেশি ফেরত আনার সুপারিশ করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, ১৯৯১ সালে এই মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে প্রথম শ্রেণি থেকে কামিল (মাস্টার্স) সমমান পর্যন্ত পড়াশোনা হয়। অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫৫০। গত বছরের ডিসেম্বরে মাদ্রাসাটি পরিদর্শন শেষে সম্প্রতি এ প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। মাদ্রাসাটি পরিদর্শন করেন ডিআইএর সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক এফ এম শাহাবুদ্দীন রুমন ও অডিটর মো. ফজলুল হক।
পরিদর্শন প্রতিবেদনের তথ্যমতে, আলিম স্তরের অধ্যক্ষ হলেও মাদ্রাসাটির অধ্যক্ষ মো. আবু ইউসুফ মৃধা ২০১৩ সাল থেকে বেতন নেন কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষের স্কেলে। তদন্তে এই জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়ায় তাকে প্রাপ্যতার অতিরিক্ত নেওয়া ৭ লাখ ৭৭ হাজার টাকা ফেরত দিতে বলা হয়েছে। শুধু অধ্যক্ষ নন, জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালার বাইরে এই মাদ্রাসার আরও ১৬ জন শিক্ষক-কর্মচারীকে দেওয়া হয়েছে ফাজিল স্তরে অবৈধ নিয়োগ। এখানেই শেষ নয়, তারা জালিয়াতি করে নিয়েছেন এমপিওর এক কোটি ২৪ লাখ ৬৯ হাজার টাকা। একইভাবে কামিল স্তরেরও তিনজন প্রভাষক ১৯ লাখ ৩০ হাজার ১১০ টাকা সরকারি বেতন-ভাতা হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
এ ছাড়া দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের অবৈধ সনদ দিয়ে চাকরি করা সহকারী গ্রন্থাগারিক রুনা লায়লাকে ১০ লাখ ৫৮ হাজার টাকা, এনটিআরসিএর সনদ ছাড়াই নিয়োগ পাওয়া প্রভাষক মো. ফারুক হোসেনকে ২১ লাখ ৩৫ হাজার ৫৪১ টাকাসহ আরও কয়েকজন শিক্ষককে অতিরিক্ত নেওয়া আরও কয়েক লাখ টাকা ফেরত দিতে বলা হয়েছে।
পরিদর্শনে আরও উঠে এসেছে, উপাধ্যক্ষ, সহকারী শিক্ষক, কম্পিউটার শিক্ষকসহ কয়েকজন অতিরিক্ত
বেতন-ভাতা গ্রহণ করেছেন। একজন পদত্যাগকারী শিক্ষকের ইনডেক্স ব্যবহার করে অন্য ব্যক্তির নামে বিল উত্তোলনের ঘটনাও ধরা পড়েছে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আর্থিক ব্যবস্থাপনায়ও একাধিক অনিয়মের কথা বলা হয়েছে। গত তিন বছরের ২০ হাজার ১৩৭ টাকা ভ্যাট সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি। শিক্ষক-কর্মচারীদের ভবিষ্যৎ তহবিল চালু করা হয়নি, সংরক্ষিত তহবিলে প্রয়োজনীয় অর্থ নেই, নিয়মিত ব্যাংক লেনদেন ও বার্ষিক বাজেট প্রণয়ন করা হয় না। ব্যয়ের ভাউচার যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয় না এবং প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতিরও অভাব রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিয়োগ বিধিসম্মত না হওয়ায় সহকারী শিক্ষক কুব্বাদ আলী সরদারের কাছ থেকে ২ লাখ ২৬ হাজার টাকা, প্যাটার্নবহির্ভূত সহকারী মৌলভী আব্দুল কুদ্দুসের কাছ থেকে ৪ লাখ ৪৪ হাজার টাকা, কামাল হোসেনের কাছ থেকে ২ লাখ ৮১ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরতযোগ্য বলে জানিয়েছেন ডিআইএ। এ ছাড়া উপাধ্যক্ষ মুহা. শাহ সিকান্দারের কাছ থেকে প্রাপ্যতার অতিরিক্ত সরকারি বেতন-ভাতাদি বাবদ নেওয়া ৪৯ হাজার টাকা, সহকারী শিক্ষক শেখ সায়েদুর রহমানের কাছ থেকে ১৬ হাজার, কম্পিউটার শিক্ষক মো. রেজাউল করিমের কাছ থেকে অতিরিক্ত নেওয়া ৭৯ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত আনতে বলা হয়েছে। তবে অধ্যক্ষ আবু ইউছুফ মৃধা কর্তৃক প্রাপ্যতার অতিরিক্ত নেওয়া টাকা থেকে ১ লাখ ৫৩ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে ফেরত দিয়েছেন বলেও জানিয়েছে ডিআইএ।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আগের একটি পরিদর্শন প্রতিবেদনে ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক নাজমুন নাহারের বিরুদ্ধে উত্থাপিত ১১ লাখ ৪১ হাজার ২০০ টাকা ফেরতের আপত্তি প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে। কারণ, আগের প্রতিবেদনে তার যোগদানের তারিখ ভুল উল্লেখ করা হয়েছিল। নথি যাচাইয়ে দেখা যায়, তিনি নিবন্ধন বাধ্যতামূলক হওয়ার আগেই নিয়োগপ্রাপ্ত ছিলেন। এ ছাড়া ফাজিল ও কামিল স্তরের এমপিওভুক্ত ১৯ জন শিক্ষক-কর্মচারী অনুমোদিত ছুটি ছাড়াই দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকায় তাদের বিরুদ্ধে চাকরিবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। অপরদিকে, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে বেতন বন্ধ থাকা আলিম স্তরের ৯ জন শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন ছাড়েরও সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া পাঠ পরিকল্পনা প্রণয়ন, সাপ্তাহিক ও মাসিক মূল্যায়ন পরীক্ষা গ্রহণ, বিজ্ঞানগারে বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি বৃদ্ধি, নিয়মিত ব্যবহারির ক্লাস আয়োজন, সাবসিডিয়ারি রেজিস্টার সংরক্ষণসহ একাধিক একাডেমিক ও প্রশাসনিক ঘাটতির বিষয়ও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে অধ্যক্ষ মো. আবু ইউছুফ মৃধা বলেন, সাবেক এমপি মজিবুর রহমান চৌধুরীর অবৈধ হস্তক্ষেপ ও সুপারিশে এসব অবৈধ বেতন-ভাতা চালু হয়েছিল। ডিআইএ এসব বিষয়ে আপত্তি তুলেছে। আমরা বলেছি নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে যে অতিরিক্ত বেতন-ভাতা নেওয়া হয়েছিল তা ফেরত দেওয়া হবে।
ডিআইএর পরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলাম বলেন, আমরা অনিয়মগুলো খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করেছি। মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে।