আহমেদ তেপান্তর
প্রকাশ : ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:২৯ পিএম
প্রিন্ট সংস্করণ

বনলতা এক্সপ্রেস : সমকালীন রাজনৈতিক গল্পের স্যাটায়ার

বনলতা এক্সপ্রেস সিনেমার দৃশ্য । ছবি - সংগৃহীত
বনলতা এক্সপ্রেস সিনেমার দৃশ্য । ছবি - সংগৃহীত

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ সিনেমায় একটি দৃশ্যে তখনো ট্রেনের টিকিও দেখা যায়নি। কিন্তু নীরবতা আর দুর্গার চোখের এক্সপ্রেশন বুঝিয়ে দিচ্ছে—কিছু একটা আসতে যাচ্ছে। অর্থাৎ, কান দিয়ে দেখা। বুঝতে পেরেই একমাত্র ছোট ভাই অপুকে নিয়ে দৌড় সমান্তরাল লোহার পাতের দিকে। অপুর চোখে রাজ্যের বিস্ময়। কান পেতে ট্রেন আসার শব্দ শোনা ছিল সেই প্রথম। অর্থাৎ, আবহ সংগীতের সঙ্গে সাউন্ড ইফেক্ট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই দৃশ্যে দর্শক মুহূর্তে নিজের কানকে দুর্গা বা অপুর কৌতূহলের মধ্যে সন্নিবেশ করেছেন আর এর কৃতিত্ব অবশ্যই একজন দক্ষ নির্মাতার। পরবর্তী সময়ে একই পরিচালকের ‘নায়ক’ সিনেমাটি প্রায় অভিযাননির্ভর। সেখানেও সাউন্ড ইফেক্ট আর আবহ সংগীতের চমৎকার সন্নিবেশ দেখা যায়। একই সঙ্গে ট্রেনের মধ্যে চরিত্রগুলোর হাঁটাচলা, গতির সঙ্গে বাইরের দৃশ্য আর কম্পাইল শটে হালকা করে ছাতার দুলনি দর্শক চোখ ভরে উপভোগ করে। কিংবা আধুনিক সময়ের রোহিত শেঠির ‘চেন্নাই এক্সপ্রেস’, টনি স্কটের ‘আনস্টপেবল’, ডেভিড লিচের ‘বুলেট ট্রেন’ কিংবা একবিংশ শতকের অন্যতম উপভোগ্য সিনেমার তকমা পাওয়া ইওন স্যাঙ হো’র ‘ট্রেন টু বুসান’ এগুলো সবই ট্রেনে অভিযাত্রাকে ঘিরে নির্মিত। সিনেমাগুলোয় টেকনিক্যাল ব্যবহার এত সুনিপুণ দক্ষতায় প্রয়োগ হয়েছে, যেগুলো বিশ্বব্যাপী রিপিট (একই দর্শকের বারবার হলে আসা) দর্শকের আরাধ্য হয়ে উঠেছে।

এবার আসি ঈদে মুক্তি পাওয়া হুমায়ূন আহমেদের ‘কিছুক্ষণ’ উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার কথায়। পুরো সিনেমাতে ট্রেনে একদল অভিযাত্রিকের ভিন্ন গল্পের কথা দৃশ্যায়ন করা হয়েছে। যেখানে মানুষ সমাজ-পরিবারের অন্তর্ভুক্ত সে কথার প্রতিধ্বনি পাই। মানুষ তার চিন্তা-ভাবনার ভিন্নতা থাকলেও নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত বর্তমান সময় আর অভিন্ন চিন্তায় এগিয়ে যেতে চায়। এখানে আনন্দ-বেদনাও ভাগ করে নেয় আর এটাই বাস্তবতা। যে বাস্তবতা হুমায়ূন আহমেদ সবসময় তার লেখায় দেখানোর চেষ্টা করেছেন। ছোট ছোট শব্দে কঠিন সব বাক্যালাপও পপকর্নের মতো আস্বাদন পরিবেশটাকে উপভোগ্য করে তোলে। হুমায়ূনের উপন্যাস অবলম্বনে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এ এসব উপাদানের প্রয়োগ হয়েছে বটে, তবে তা কতটুকু হাওয়াই মিঠাই হয়ে উঠল—তা বলা কঠিন বৈকি। অর্থাৎ, সংলাপে কিছু কিছু জায়গায় খাপছাড়া হওয়ার কারণে ৩২ পাটি দাঁতের হাসিতে বায়ূর পরিমাণ ছিল যৎসামান্য। যদিও তা পূরণ হয়েছে একঝাঁক দক্ষ অভিনয় শিল্পীর কল্যাণে। নুহাশ হুমায়ূনের নেপথ্য বর্ণনায় দর্শক উৎসাহ অবশ্য ইতিবাচক ছিল। এ জায়গাটায় মঞ্চপ্রিয় দর্শক রিলেট করতে পারলেও ন্যারেটিভ দর্শক কিছুটা বিরক্ত, তা সত্ত্বেও এ নতুনত্ব উপভোগ্য ছিল।

সিনেমার শেষ দৃশ্যে দুই শক্তিমান অভিনেতার সংলাপ খাপছাড়া। এখানে চঞ্চল চৌধুরীর মুখে মোশাররফ করিমকে একবার সমীহবাক্য ‘স্যার’ ডাকতে শোনা গেলেও পরের সংলাপে তাকে ‘মাস্টার’ সাহেব বলে সম্বোধন কানে ঠেকেছে।

পুরো সিনেমায় একবুক কষ্ট নিয়ে পথচলা অধ্যাপকের ভূমিকায় মোশাররফ করিম একাবাক্যে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তিনি যেন হয়ে উঠেছিলেন পিতৃহৃদয়ের সত্যিকারের হুমায়ূনের অবতার। অথচ সিনেমায় তাকে একটা সিগারেটখোর, কথাবার্তা কাটাকাটা অথচ গাণিতিক ফর্মে। কেউ আহত হলেন কী হলেন না, সেটা তার ভাবনায় ছিল না; কিন্তু একই ট্রেনে অন্য অভিযাত্রী জাকিয়া বারী মমর ডেলিভারি অবস্থায় সেই গাণিতিক মানুষটির খোলসে যেন বেড়িয়ে পড়ল এক পিতৃহৃদয়। এ জায়গাটিতে ডাক্তার চরিত্রে শরিফুল রাজ, শ্যামল মাওলা, একে আজাদ সেতু, ইন্তেখাব দিনার, সাবিলা নূর, চোর, ছোট মেয়ে চরিত্র ছাড়াও বাকিদের নির্মোহ অভিনয় অনেকটা তেঁতুল টকের মতো। বিপরীতে ভিভিআইপি ক্যাবিনে শিক্ষামন্ত্রী, স্ত্রী ও নববিবাহিত শ্যালিকার জীবনাচার তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে মার্কসবাদে বিশ্বাসী এই মন্ত্রী দম্পতি এখন জীবনবাস্তবতায় ‘পোলাও পঁচা’। তাদের বাক্যালাপ সমকালীন রাজনীতির অন্দরকে শিক্ষিত শ্রেণির দর্শক রিলেট করতে পারলেও অ্যাকশন আর সোশ্যাল অ্যাকশন দেখে যারা অভ্যস্ত, তারা খেই হারিয়েছেন। এখানে নির্মাতা আঙুল দিয়ে সমকালকে সিনেমার পর্দায় দেখিয়ে দিলেন। নির্মাতার ভাগ্য ভালো গোঁড়া প্রকৃতির বলে পরিচিত সার্টিফিকেশন বোর্ড বেশ ছাড় দিয়ে গেল, সার্টিফিকেশন বোর্ড কিঞ্চিৎ বাহবা পেতেই পারে।

যে কোনো সিনেমায় চিত্রনাট্য অনুযায়ী ক্যারেক্টারাইজেশন আর স্পেস গুরুত্বপূর্ণ। নির্মাতা তানিম নূর দ্বিতীয় সিনেমা হিসেবে ‘একটি দৃশ্য’ বাদ দিলে বেশ পরিমিতিবোধের পরিচয় দিতেন এখানে। এই একটি দৃশ্য হচ্ছে সিরিয়াস মুহূর্তে হেলিকপ্টার থেকে ডা. এজাজ ও ফারুক হোসেনের বাক্যালাপ। এটা ছিল এক মন দুধে এক ফোঁটা চনার মতোই। দৃশ্যটিতে তাদের উপস্থিতি অপ্রয়োজনীয়, তাই প্রশ্ন উঠেছে হুমায়ূন আহমেদের টিমের প্রতি দুর্বলতা দেখাতে নেপোটিজমের আশ্রয় নেওয়া।

পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো সিনেমাটিও ত্রুটিমুক্ত না, তবে এমন সব ত্রুটি, যা সাধারণ দর্শকের বোধের যোজন যোজন দূরে। কিন্তু কিছু ত্রুটি এতটাই মোটা দাগে, যা পাশে বসা এক গৃহিণীর কপালেই ভাঁজ ফেলেছে। যেমন সমালোচনা লেখার শুরুতেই ট্রেনে নির্মিত গল্পের কিছু সিনেমার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বোধকরি নির্মাতা বা সিনেমার সাউন্ড ডিজাইনার যারাই ছিলেন, তারা দেখে থাকবেন। ট্রেনে ভ্রমণকালে পিনপতন নীরবতা আশা করা যায় না; একইভাবে ভ্রমণকালে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় যে অভিব্যক্তির প্রয়োজন, তা ছিল অনুপস্থিত। বনলতা এক্সপ্রেসে এ জায়গায় সাউন্ড ইফেক্টের বালাই নেই বললেই চলে। বাইরের দৃশ্যের বালাই নেই (যদিও রাত)। ট্রেনে থাকা হালকা উপকরণের অভিব্যক্তি বোঝানো যায়নি। ভিভিআইপি ক্যাবিনে ঠুনকো ধাক্কায় শোলা দিয়ে নির্মিত জেনারেল ডিজাইনের এয়ারকান্ডিশনের দুলনি দর্শক সদৃশ গৃহিণীর নজর এড়ায়নি বলেই জানালেন। পাশাপাশি সারা সিনেমায় একজন অধ্যাপকের ভূমিকায় মোশাররফ করিমকে লুঙ্গিতে দেখালেও, শেষ দৃশ্যে কেন প্যান্ট পড়াতে হলো—তাও আবার স্যান্ডেল পরিয়ে কবরস্থানে সেটা দৃষ্টিকটু ঠেকেছে। আরেকটি দৃশ্যে ট্রেনের কর্মীদের হাতে জামা-কাপড় হারানো ভিডিওগ্রাফারকে সুন্দর করে জুতাসহ রিবন বাঁধাই অবস্থায় দেখা সত্যি বিরক্তির ছিল। এ দুই দৃশ্যে কাটাকাটিতে অভ্যস্ত সার্টিফিকেশন বোর্ডের সচেতন হতে বাধা কোথায় ছিল, তা বোঝা গেল না।

শেষ কথা বলতে হয়, পরিচালক তানিম নূর লেখক হুমায়ূন আহমেদকে বেশ ভালোভাবেই রিড করেছেন। ক্যামেরার কাজ, মেকআপ-গেটআপ আর সংগীতায়োজনে সিনেমাকে দ্যুতিময় করেছে। পাশাপাশি লেখক হুমায়ূন আহমেদ আর এক ঝাঁক উল্লেখযোগ্য তারকার অভিনয়সমৃদ্ধ উপস্থিতি যে এ সিনেমার প্রাণ, তা দর্শকের প্রতিক্রিয়া থেকেই স্পষ্ট হয়েছে। ‘ত্রুটিপূর্ণ’ কিছু জায়গা ছাড়া চালক হিসেবে তানিম নূর যে ‘নির্মাতা’ হুমায়ূনকে ছাড়িয়ে যাবেন, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

লেখক: আহমেদ তেপান্তর

সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র বিশ্লেষক

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

লাম্পি রোগে বাড়ছে গরুর মৃত্যু, ডিমলায় আতঙ্কে খামারিরা

গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত ৮

কী ঘটেছিল ইতিহাসের এই দিনে

বৃহস্পতিবার রাজধানীর যেসব এলাকায় মার্কেট বন্ধ

কালবেলায় সংবাদ প্রকাশের পর বাঁকখালী নদী পরিদর্শনে ইউএনও

ইউএনজিএর সভাপতি হিসেবে কী দায়িত্ব ও মর্যাদা পাবেন খলিলুর রহমান

‘সম্পাদক পরিষদ’ গঠন হয় কীভাবে, জানালেন সাবেক এক সদস্য

মির্জা ফখরুলকে সারজিসের প্রশ্ন

৩০ বছর পর দখলমুক্ত সরকারি রাস্তা

হাদি হত্যায় তার বড় ভাইয়ের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে : ফারুক হাসান

১০

সরকারকে ধন্যবাদ দিয়ে ‘সব নিরপরাধ মায়ের’ মুক্তি চাইলেন আইভী

১১

ওসির নেতৃত্বে থানায় স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে রক্তাক্ত 

১২

নিঃসঙ্গ মায়ের মৃত্যু ঘিরে ‘মিথ্যা তথ্য’ ছড়ানোর অভিযোগ ছেলের

১৩

রিজার্ভ আরও বাড়ল

১৪

মায়ানমারে পাচারের পথে বিপুল সিমেন্ট জব্দ, আটক ৯

১৫

কারামুক্ত আইভী লড়বেন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে

১৬

পদত্যাগের দুদিন পর পার্বত্য চট্টগ্রামবাসীর প্রতি দীপেন দেওয়ানের বার্তা

১৭

এনসিপি নেতার বিরুদ্ধে বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ

১৮

৫ দিন দেশের আবহাওয়া কেমন থাকবে?

১৯

প্রিমিয়ার ব্যাংকের ইন্ডিপেন্ডেন্ট ডিরেক্টর নূরুল আলমের বইয়ের মোড়ক উন্মোচন

২০
X