

চট্টগ্রাম নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন ও জলাবদ্ধতা নিরসনে বসানো হয়েছিল আধুনিক প্লাস্টিকের বিন (ডাস্টবিন)। লক্ষ্য ছিল বাসিন্দারা যত্রতত্র ময়লা না ফেলে এসব বিনে ফেলবেন। কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতেই উধাও হয়ে গেছে প্রায় সাড়ে চার হাজার বিন।
রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, নিম্নমানের উপকরণ এবং চুরির কারণে ভেস্তে গেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) এই উদ্যোগ। এতে প্রায় আড়াই কোটি টাকারও বেশি আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
চসিক সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের মে মাসে বন্দর নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডের বিভিন্ন জনবহুল স্থানে মোট ৫ হাজার বিন বসানো হয়েছিল। তবে এক বছরের মাথায় দেখা যাচ্ছে, প্রায় ৯০ শতাংশ বিনেরই কোনো অস্তিত্ব নেই। এই বিনগুলো সিটি করপোরেশন নিজস্ব তহবিল থেকে কেনেনি। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, বিভিন্ন ব্যাংক ও কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান অনুদান হিসেবে এগুলো চসিককে দিয়েছিল।
পরে ওয়ার্ড অফিস, সাবেক কাউন্সিলর ও স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের মাধ্যমে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার ও জনবহুল স্থানে এগুলো বসানো হয়। আয়তন ভেদে একেক ওয়ার্ডে একেক পরিমাণ বিন বসানো হয়েছিল। প্রতিটি বিনের ধারণক্ষমতা ২৪০ লিটার। যার প্রতিটির বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে ৬ হাজার টাকা।
অন্যান্য ওয়ার্ডের মতো চসিকের ২৫ নম্বর রামপুর ওয়ার্ডের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ১০০টি বিন বসানো হয়েছিল। ওয়ার্ডের পরিচ্ছন্ন সুপারভাইজার মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, বিন বসানোর পর শুরুতে মোটামুটি সব জায়গায় দেখা যেত। তবে ধীরে ধীরে সংখ্যা কমতে কমতে থাকে। এখন অধিকাংশ জায়গায় বিন দেখা যায় না।
একই চিত্র বাকলিয়া এলাকাতেও। স্থানীয় বাসিন্দা আবুল হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের এলাকায় ব্রিজের পাশে ছয়টি বিন বসানো হয়েছিল। এখন একটাও নেই। সব চুরি হয়ে গেছে।
এমনকি খোদ সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারাও এই বাস্তবতার মুখোমুখি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, আমার বাসা লালখান বাজার এলাকায়। বাসা থেকে অফিসে আসার পথে রাস্তায় তিনটি বিন দেখতাম। এখন একটিও চোখে পড়ে না।
সরেজমিনে চসিকের বিভিন্ন এলাকায় পরিচ্ছন্নতার কাজে নিয়োজিত অন্তত ১০ জন পরিচ্ছন্নকর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরবরাহকৃত বিনগুলোর মান তেমন ভালো ছিল না। টোকাই ও ভাঙারি চোরেরা প্রথমে ঢাকনা চুরি করে। পরবর্তীতে রাতের আঁধারে এগুলো ভেঙে নিয়ে গেছে।
চসিকের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দিন চৌধুরী কালবেলাকে বলেন, শহর পরিচ্ছন্ন রাখতে ৪১টি ওয়ার্ডে পাঁচ হাজার বিন বসানো হয়েছিল। তবে এখন ৫০০ এর মতো পাওয়া যাচ্ছে। বাকিগুলো টোকাই, ভাঙারি চোরেরা চুরি করে নিয়ে গেছে।
জনসাধারণের সচেতনতার অভাবকে দায়ী করে তিনি বলেন, জনসাধারণের যেন কোনো দায়বদ্ধতা নেই। সিটি করপোরেশনের পক্ষে বিন পাহারা দিয়ে নিরাপত্তা দেওয়া অসম্ভব। জনগণকে সরকারি সম্পদকে নিজেদের সম্পদ মনে করতে হবে। আমাদের জনবল অপ্রতুল। ডোর-টু-ডোর প্রকল্প বন্ধ হওয়ায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আরও খারাপ হয়েছে। তবে আমরা এই অবস্থার উত্তরণের জন্য কাজ করছি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী কালবেলাকে বলেন, এটা অত্যন্ত দুঃখজনক একটা ঘটনা। আমার বাসার পাশেও একটা ছিল। ইদানিং সেটাও দেখা যাচ্ছে না। সিটি করপোরেশনের উচিত ছিল এই বিনগুলোর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বিনগুলো একদিনে উধাও হয়নি। পরিচ্ছন্নতা বিভাগের মাঠ পর্যায়ে যারা কাজ করে তারা কেন বিন হারানোর পর রিপোর্ট দেননি? শুরুতেই পদক্ষেপ নেওয়া হলে এতগুলো বিন উধাও হতো না। এটা অনুদান দাতাদের অসম্মান করার মতো। এরকম হলে সামনে কেউ অনুদান দিতে আগ্রহী হবে না।