

তীব্র গরম নাকি অন্য কোনো রহস্য? আশুলিয়ার একটি পোশাক কারখানায় হঠাৎ করেই ‘অজ্ঞাত কারণে’ একের পর এক শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনায় চরম আতঙ্ক ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। গত দুই দিনে কাঠগড়া আমতলা এলাকার ‘ম্যাগপাই কম্পোজিট টেক্সটাইল লিমিটেড’ কারখানার সুইং ও কাটিং সেকশনের অন্তত শতাধিক শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এদের মধ্যে অনেকেরই মুখ দিয়ে ফেনা বের হতে দেখা গেছে এবং অনেকেই অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
এদিকে, এই পরিস্থিতির মধ্যেও কারখানা ছুটি না দিয়ে উৎপাদন সচল রাখায় শ্রমিকদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও শ্রমিকদের সূত্রে জানা গেছে, সোমবার (২৯ জুন) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ম্যাগপাই কম্পোজিটের সুইং সেকশনে প্রথম এই ঘটনার সূত্রপাত। কয়েকজন শ্রমিক কাজ করার সময় হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে যান।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) সকালেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন শ্রমিক হুড়মুড় করে অসুস্থ হয়ে পড়েন।
অসুস্থ সুইং অপারেটর আসমার স্বজন আমিনুল জানান, ফ্যাক্টরির ফেব্রিক্স (কাপড়) নাড়াচাড়া করার সময় এক ধরনের ঝাঁঝালো গন্ধ বা গরম হাওয়া আসার পরপরই শ্রমিকরা নাক-চোখে জ্বালাপোড়া অনুভব করেন এবং এক পর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। অসুস্থদের প্রায় সবাই নারী শ্রমিক। সাভারের ল্যাবজোন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য সকাল থেকেই কারখানার সামনে রিকশা ও স্ট্রেচারের সারি দেখা যায়।
ল্যাবজোন হসপিটাল প্রাইভেট লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার শাহাদাত হোসেন জানান, সোমবার ও মঙ্গলবার মিলিয়ে তাদের এখানে ৪০ জনেরও বেশি শ্রমিক চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের প্রায় সবাই শ্বাসকষ্ট ও অচেতন অবস্থায় এসেছিলেন।
কারখানায় কোনো বিষাক্ত গ্যাস বা কেমিক্যালের প্রতিক্রিয়া হয়েছে কি না,এমন প্রশ্নে তিনি জানান, চিকিৎসকেরা সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ এখনো আইডেন্টিফাই করতে পারেননি। তবে ধারণা করা হচ্ছে, কাজের জায়গায় পর্যাপ্ত অক্সিজেনের ঘাটতি অথবা অতিরিক্ত গরমের কারণে এই ‘ম্যাস সাইকোজেনিক ইলনেস’ বা শারীরিক জটিলতা তৈরি হতে পারে।
কারখানায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে শ্রমিকদের পক্ষ থেকে সাধারণ ছুটি দাবি করা হলেও কর্তৃপক্ষ তা নাকচ করে দেয়। এ বিষয়ে কারখানার হেড অফ অপারেশন ও সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার (এডমিন, এইচআর, কমপ্লায়েন্স) সাব্বির সিদ্দিকী বলেন, ‘অসুস্থের সংখ্যা ২০-২৫ জনের বেশি নয়। অনেকেই হয়তো সকালে নাস্তা না করে আসায় এমন হতে পারে। আমাদের নিজস্ব রেসকিউ টিম ও ডাক্তার তাদের দেখছেন।’
ছুটি না দেওয়ার পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘আমাদের সামনে শিপমেন্টের ডেট আছে। ১০ বা ২০ জনের জন্য পুরো ১০০০ শ্রমিকের ফ্যাক্টরি ছুটি দিয়ে দেওয়া কোনো সমাধান হতে পারে না। তবে যারা অসুস্থ বোধ করছেন, তাদের গাড়ি দিয়ে হাসপাতালে পাঠানো এবং চিকিৎসার সব খরচ আমরা বহন করছি।’
আশুলিয়া ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের (ওসি) ইন্টেলিজেন্ট ইফতেখার জানান, গরমের কারণে শ্রমিকরা অসুস্থ হতে পারেন বলে মালিকপক্ষ দাবি করেছে। তবে প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর এবং একটি বিশেষজ্ঞ মেডিকেল বোর্ডের মাধ্যমে বিষয়টি খতিয়ে দেখার প্রক্রিয়া চলছে।
উল্লেখ্য, গত কয়েকদিনে এই এলাকার আরও দুই-তিনটি কারখানায় একই ধরনের বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটায় শ্রমিকদের মনে নতুন করে ‘কেমিক্যাল বা গ্যাস’ আতঙ্ক দানা বাঁধছে।