

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ আনার মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বেসরকারি সেলের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী মোহাম্মদ সম্রাট রোবায়েত।
গত ২৫ ফেব্রুয়ারি বর্তমান চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দিলেও ৯ মার্চ তিনি ট্রাইব্যুনালে একটি অনাপত্তিপত্র দাখিল করেন।
প্রাথমিক অভিযোগে সম্রাট রোবায়েত দাবি করেছিলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় চট্টগ্রামে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আসামি সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীকে রক্ষার চেষ্টা হয়েছিল।
তার অভিযোগ অনুযায়ী, তাজুল ইসলাম এ মামলায় ফজলে করিমের ছেলে ফারাজ করিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হতে দেননি। তিনি বিশেষ আইনি ক্ষমতা ব্যবহার করে ফারাজকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থেকে বাদ দেন।
চিফ প্রসিকিউটরের কাছে দেওয়া সম্রাট রোবায়েতের লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছিল, সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম এবং তার ঘনিষ্ঠ প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম, মো. মিজানুল ইসলাম ও তারেক আবদুল্লাহ মিলে একটি চক্র গড়ে চিহ্নিত অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা চালান।
তাতে বলা হয়, চট্টগ্রামের ঘটনায় ট্রাইব্যুনালের তদন্তে ৫৫ জনের বেশি সাক্ষী সরাসরি ফারাজ করিমের নাম বললেও বিশেষ আইনি ক্ষমতা ব্যবহার করে ফারাজের নাম গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থেকে বাদ দেন তাজুল ইসলাম। পারিবারিক সম্পর্কের কারণে ফারাজের মায়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল তার।
শারীরিক অবস্থা স্বাভাবিক থাকা এবং আইজি প্রিজনের ভাষ্যমতে অসুস্থতা ‘সিজনাল’ হওয়ার পরও ফজলে করিমকে জামিন দেওয়ার ষড়যন্ত্র হয় বলেও অভিযোগ করেন সম্রাট রোবায়েত।
সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম অবশ্য শুরু থেকেই এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন ও বিচারপ্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা হিসেবে অভিহিত করেছেন। অভিযোগে নাম আসা অন্যান্য প্রসিকিউটররাও তাদের বিরুদ্ধে আনা দাবিগুলোকে মিথ্যা বলে নাকচ করে দেন।
তাজুল ইসলাম বলেন, ‘বিচারপ্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ করার হীন উদ্দেশ্যে এ ধরনের ভিত্তিহীন, মিথ্যা প্রোপাগান্ডা সুকৌশলে চালানো হচ্ছে।’
তবে, অভিযোগ দাখিলের সপ্তাহ দুয়েক না পেরুতেই গত ৯ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কাছে একটি অনাপত্তিপত্র দেন সম্রাট রোবায়েত। তার স্বাক্ষরিত সে অনাপত্তিপত্রটি গ্রহণ করেন ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর আব্দুল্লাহ আল নোমান।
সেখানে তিনি বলেন, গত ৯ মার্চ সকাল ৯টায় প্রসিকিউশনের অফিস রুমে চট্টগ্রামের মামলার বিষয়ে আমার সঙ্গে কথা হয় প্রসিকিউটরদের। আমি জানাতে চাই, তদন্তকারী কর্মকর্তা যে ২২ জনকে আসামি করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছেন, সে বিষয়ে আমি একমত। কোনো ভুল হয়নি। উক্ত মামলার বিষয়ে পরবর্তী কার্যক্রম চালালে আমার কোনো আপত্তি নেই।
এদিকে অভিযোগে নাম আসা আরেক প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম জানান, ‘যে মামলা নিয়ে আমাকে জড়ানো হয়েছে তার সঙ্গে আমি কোনোভাবেই সম্পর্কিত নই। এই মামলা সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই। অভিযোগকারী মিথ্যা বলছেন।’ একই সুরে কথা বলেছেন অভিযোগে নাম আসা অন্য প্রসিকিউটরাও।
প্রসঙ্গত, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে চট্টগ্রাম-৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরী এখন কারাগারে আছেন। গত সোমবার এ মামলায় ট্রাইব্যুনালে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য ছিল, তবে তা হয়নি। আগামী ১২ এপ্রিল প্রতিবেদন দাখিলের নতুন দিন ধার্য হয়েছে।
ফজলে করিম চৌধুরীকে জামিন করিয়ে দেওয়ার জন্য এক কোটি টাকা চাওয়ার অভিযোগ রয়েছে এই মামলার দায়িত্বপ্রাপ্ত তৎকালীন প্রসিকিউটর মো. সাইমুম রেজা তালুকদারের বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে ‘জামিনের জন্য এক কোটি টাকা চান প্রসিকিউটর’ শিরোনামে ১০ মার্চ প্রথম আলো ও নেত্র নিউজের যৌথ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। অনুসন্ধানে উঠে আসে, ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের কাছে এক কোটি টাকা চেয়েছিলেন সাইমুম রেজা তালুকদার।