

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যাদের উপস্থিতি সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। সেই তালিকার শীর্ষে নিঃসন্দেহে রয়েছেন মহানায়ক উত্তম কুমার। তিনি শুধু একজন জনপ্রিয় অভিনেতা নন; বরং বাংলা সিনেমার স্বর্ণযুগের প্রতীক, এক অনন্ত আবেগের নাম। তার এক চিলতে হাসি, সংলাপ বলার স্বতন্ত্র ভঙ্গি, পর্দাজুড়ে সহজাত ব্যক্তিত্ব আর অনবদ্য অভিনয় আজও দর্শকদের একইভাবে মুগ্ধ করে।
আজ (২৪ জুলাই) মহানায়কের ৪৭তম প্রয়াণ দিবসে তাকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেছে দুই বাংলার অগণিত ভক্ত, শিল্পী ও চলচ্চিত্রপ্রেমীরা। চার দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তার জনপ্রিয়তায় এতটুকু ভাটা পড়েনি; বরং নতুন প্রজন্মের কাছেও তিনি সমান প্রাসঙ্গিক, সমান প্রিয়।
১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই একটি চলচ্চিত্রের শুটিং চলাকালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন উত্তম কুমার। তার আকস্মিক প্রয়াণ বাংলা চলচ্চিত্রে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু একজন শিল্পীর মৃত্যু হলেও তার শিল্প কখনো হারিয়ে যায় না—উত্তম কুমার সেই সত্যেরই উজ্জ্বল উদাহরণ।
আজও টেলিভিশনে তার কোনো সিনেমা প্রচারিত হলে দর্শক থমকে দাঁড়ান। তার অভিনয়ের সূক্ষ্মতা, সংলাপের আবেগ, রোমান্টিক উপস্থিতি কিংবা গানভিত্তিক দৃশ্যগুলো এখনো সমানভাবে দর্শকের হৃদয় স্পর্শ করে। তাই ‘মহানায়ক’ উপাধিটি যেন তার নামের সঙ্গেই চিরস্থায়ী হয়ে গেছে।
প্রয়াণ দিবসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও মহানায়ককে স্মরণ করেছেন টালিউডের তারকারা। আবেগঘন এক বার্তায় অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘মহানায়ক উত্তম কুমার শুধুমাত্র একজন কিংবদন্তি অভিনেতা নন, তিনি বাংলা সিনেমার চিরন্তন প্রেরণা। তার অভিনয়, ব্যক্তিত্ব এবং শিল্পের প্রতি নিবেদন আজও আমাদের পথ দেখায়। তার মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা জানাই। তিনি আমাদের মধ্যে নেই, কিন্তু তার সৃষ্টি, তার সিনেমা এবং তার উত্তরাধিকার প্রতিটি প্রজন্মের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবে। মহানায়ককে আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম।’
প্রসেনজিতের এই পোস্ট মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। অনুরাগীরাও মন্তব্যের মাধ্যমে মহানায়কের প্রতি তাদের ভালোবাসা, স্মৃতি আর শ্রদ্ধা প্রকাশ করেন। অনেকেই লিখেছেন, ‘বাংলা সিনেমা মানেই উত্তম কুমার—তিনি কখনো পুরোনো হন না।’
শুধু ভার্চুয়াল জগতেই নয়, এদিন মহানায়কের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে কলকাতার কেওড়াতলা মহাশ্মশানেও জড়ো হন অসংখ্য মানুষ। তার সমাধিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। উপস্থিত ছিলেন অভিনেতা রুদ্রনীল ঘোষ, অভিনেত্রী পাপিয়া অধিকারী, রূপা গঙ্গোপাধ্যায়, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তসহ টলিউডের একাধিক শিল্পী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। শ্রদ্ধাঞ্জলির মধ্য দিয়ে তারা স্মরণ করেন বাংলা সিনেমার সেই চিরসবুজ নায়ককে, যিনি অভিনয়ের সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছিলেন।
বাংলা চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগের সবচেয়ে উজ্জ্বল মুখ হিসেবে উত্তম কুমারের অবদান শুধু অসংখ্য কালজয়ী সিনেমাতেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি বাঙালির সংস্কৃতি, নন্দনচেতনা, প্রেমের ভাষা এবং চলচ্চিত্র ভাবনার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছেন। তার অভিনয় আজও অভিনয়শিল্পীদের জন্য পাঠ্য, তার ব্যক্তিত্ব আজও অনুকরণীয়, আর তার সিনেমা এখনো দর্শকের কাছে নির্মল বিনোদন ও শিল্পের অনন্য সংমিশ্রণ।
৪৭ বছর পরও তাই উত্তম কুমার শুধুই ইতিহাসের একটি নাম নন। তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের এক চিরজাগ্রত অধ্যায়, এক অমলিন উত্তরাধিকার। যতদিন বাংলা সিনেমা থাকবে, ততদিন মহানায়কের আলোও সমান উজ্জ্বল হয়ে জ্বলতে থাকবে—প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে, দর্শকের হৃদয় থেকে হৃদয়ে।