

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, যুগোপযোগী এবং বৈষম্যহীন করার লক্ষ্যে ‘শিক্ষা আইন ২০২৬’-এর খসড়া চূড়ান্ত করেছে সরকার। এই প্রস্তাবিত আইনে বাণিজ্যিক কোচিং সেন্টার এবং নোট-গাইড বইয়ের দৌরাত্ম্য বন্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থার বিধান রাখা হয়েছে। একইসঙ্গে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে এই আইনের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
জনগণের মতামতের জন্য এ সংক্রান্ত খসড়া আইন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৫টা পর্যন্ত প্রস্তাবিত শিক্ষা আইন, ২০২৬ (খসড়া)-এর উপর নির্ধারিত [email protected] ই-মেইলে মতামত পাঠাতে বলেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
প্রস্তাবিত আইনটি মোট ১১টি অধ্যায় এবং ৫৫টি ধারায় বিন্যস্ত। জনগণের মতামতের পর তা চূড়ান্ত করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হবে বলে জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
কোচিং ও গাইড বই নিষিদ্ধ: বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত কোচিং সেন্টার এবং সহায়ক বা নোট বইয়ের প্রকাশনা ও বিপণন স্থায়ীভাবে বন্ধে কঠোর বিধিনিষেধ।
শিক্ষার্থীর সুরক্ষা: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশ নিশ্চিত করতে সুরক্ষা বলয় তৈরি।
আইনি কাঠামো: শিক্ষাকে স্রেফ সুযোগ হিসেবে নয়, বরং নাগরিকের অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।
প্রস্তাবিত আইন বিষয়ে শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার (সিআর আবরার) জানিয়েছেন, শিক্ষা ব্যবস্থাকে আইনি কাঠামোর আওতায় এনে শিক্ষাকে নাগরিকের অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যেই একটি সমন্বিত শিক্ষা আইন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, আইন কখনোই খুব বিস্তারিত হয় না। এটি মূলত দিক-নির্দেশনা দেয়। ভবিষ্যতে বিধিমালা ও নীতির মাধ্যমে একে আরও কার্যকর করা হবে।
শিক্ষা উপদেষ্টা আরও বলেন, এই আইনটি দীর্ঘ আলোচনার ফল। মাঠপর্যায়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শিক্ষা প্রশাসক, শিক্ষাবিদ এবং বিভিন্ন জেলার অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে খসড়া তৈরি করা হয়েছে।
এটি শিক্ষা আইন, ২০২৬ নামে অভিহিত হবে বলে খসড়ায় বলা হয়েছে।
খসড়া আইনের ১৫ ধারায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, আইনটি কার্যকর হওয়ার তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে সব ধরনের বাণিজ্যিক কোচিং সেন্টার, গাইড বই এবং নোট বইয়ের কার্যক্রম দেশে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধের কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে। শিক্ষার্থীদের মূল পাঠ্যবইমুখী করতে ধারাবাহিকভাবে এসব কার্যক্রম নিরুৎসাহিত করা হবে।
আইনে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক এবং ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মাধ্যমিক স্তর নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষাকে শিশুর মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এছাড়া ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদের জন্য নিজস্ব মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
খসড়া আইনের ১৫ ধারায় বলা হয়েছে, আইনটি কার্যকর হওয়ার তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে সব ধরনের বাণিজ্যিক কোচিং সেন্টার, গাইড বই এবং নোট বইয়ের কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হবে। সরকার বিধিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে এগুলো নিয়ন্ত্রণ করবে। তবে সরকার অনুমোদিত ‘সহায়ক পুস্তক’-এর ক্ষেত্রে এই বিধিনিষেধ প্রযোজ্য হবে না।
প্রস্তাবিত খসড়া আইনে প্রথমবারের মতো কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা কার্যক্রমের মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে মূলধারার শিক্ষার সমান গুরুত্ব দিয়ে ডিপ্লোমা পর্যায় পর্যন্ত উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের শারীরিক শাস্তি ও মানসিক নিপীড়ন নিষিদ্ধ করা হয়েছে খসড়া আইনে। ৩৯ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো শিক্ষক শিক্ষার্থীকে শারীরিক আঘাত বা মানসিক নির্যাতন করলে তা ‘অসদাচরণ’ হিসেবে গণ্য হবে এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া র্যাগিং ও সাইবার বুলিং প্রতিরোধে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
খসড়া আইনে উচ্চশিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণে ‘অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল’ এর ভূমিকা জোরদার এবং স্নাতক পর্যায়ে অভিন্ন গ্রেডিং পদ্ধতি চালুর কথা বলা হয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ইউজিসি কর্তৃক নির্ধারিত অভিন্ন ন্যূনতম যোগ্যতা অনুসরণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করতে ‘জাতীয় গবেষণা পরিষদ’ এবং ‘কেন্দ্রীয় গবেষণাগার’ স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিধান বিষয়ে খসড়ায় বলা হয়েছে, প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য একটি ইউনিক আইডি বা স্বতন্ত্র পরিচিতি নম্বর থাকবে, বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগে এনটিআরসিএর মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে, সরকারের অনুমতি ছাড়া কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাদের স্থাবর সম্পত্তি বিক্রয় বা ইজারা দিতে পারবে না, ই-লার্নিং ও দূরশিক্ষণ জনপ্রিয় করতে দেশব্যাপী একটি সাধারণ অনলাইন লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু করা হবে।
খসড়া আইনে বলা হয়েছে, এই আইন আপাতত বলবৎ অন্য যে কোনো আইনের ওপর প্রাধান্য পাবে। যদি অন্য কোনো আইনের সঙ্গে এই আইনের বিরোধ দেখা দেয়, তবে এই আইনটিই কার্যকর হবে বলে প্রস্তাবিত আইনে উল্লেখ করা হয়েছে।