মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬, ২৩ আষাঢ় ১৪৩৩
কালবেলা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৬:২৭ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

খাদ্য নিরাপত্তায় উৎপাদন নয়, সরবরাহ ব্যবস্থাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ

ছবি : সংগৃহীত
ছবি : সংগৃহীত

বাজারে ঢুকলেই বোঝা যায় অর্থনীতির বাস্তবতা। চাল, ডাল, তেল, মাছ, ডিম কিংবা সবজির দামই এখন সাধারণ মানুষের কাছে মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় সূচক। গত কয়েক বছরে আয় কিছুটা বাড়লেও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে আরও দ্রুত। ফলে নিম্ন আয়ের মানুষের পাশাপাশি মধ্যবিত্তও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চাপে পড়েছে। এই বাস্তবতায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও খাদ্য নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

তবে অর্থনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক ও গবেষকদের অভিমত—শুধু উৎপাদন বাড়িয়ে নয়, উৎপাদিত খাদ্য দ্রুত, নিরাপদ ও কম খরচে ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে পারলেই মিলবে স্থায়ী সমাধান। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্য মূল্যস্ফীতির মূল সমস্যা উৎপাদনে নয়; বড় সংকট উৎপাদন-পরবর্তী ব্যবস্থাপনায়।

কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশিদ ইয়াসিন বলেন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষিকে প্রযুক্তিনির্ভর ও বাজারমুখী খাতে রূপান্তর করা হচ্ছে। উন্নত বীজ, কৃষি গবেষণা, যান্ত্রিকীকরণ, সৌরচালিত সেচ, জলবায়ু-স্মার্ট কৃষি এবং উৎপাদন-পরবর্তী অবকাঠামো উন্নয়নে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। তার মতে, কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরবরাহ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ অপরিহার্য।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেছেন, দেশের পুষ্টি নিরাপত্তা ও খাদ্য নিরাপত্তায় মৎস্যখাতের ভূমিকা আরও বাড়াতে সরকার আধুনিক কোল্ড-চেইন, ফিশ ল্যান্ডিং সেন্টার, আন্তর্জাতিক মানের প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং রপ্তানি অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। তার মতে, মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশের অর্জনকে মূল্য সংযোজন ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের শক্তিতে রূপান্তর করাই এখন সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চের (সিএসইআর) চেয়ারম্যান ও ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীম বলেন, খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু বাজার তদারকি বা আমদানি বাড়ানো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। প্রয়োজন উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পুরো ভ্যালু চেইনের আধুনিকায়ন। তার মতে, কোল্ড-চেইন, পোস্ট-হারভেস্ট ম্যানেজমেন্ট, আঞ্চলিক সংগ্রহ কেন্দ্র, ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে বড় বিনিয়োগের মাধ্যমেই খাদ্যের অপচয় কমানো এবং বাজারকে স্থিতিশীল করা সম্ভব।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিএসইআরের গবেষণা বলছে, দেশে উৎপাদিত উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ফল, সবজি ও মাছ বাজারে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হয়ে যায়। পর্যাপ্ত সংরক্ষণাগার, হিমাগার, আধুনিক পরিবহন ও লজিস্টিকস না থাকায় কৃষক যেমন ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন, তেমনি ভোক্তাকেও বেশি দামে খাদ্য কিনতে হয়। ফলে একই সঙ্গে কৃষক ও ভোক্তা—দুই পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেছেন, কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কোল্ড-চেইন, লজিস্টিকস ও মৎস্যখাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। সঠিক নীতি সহায়তা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সহজ বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে এসব খাত আগামী দিনের প্রবৃদ্ধির নতুন ইঞ্জিনে পরিণত হতে পারে। খাদ্য নিরাপত্তার আলোচনায় মৎস্যখাতকে আলাদা গুরুত্ব দিতে হবে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মিঠাপানির মাছ উৎপাদনকারী দেশ হলেও বাংলাদেশ এখনো আন্তর্জাতিক বাজারে সম্ভাবনার পুরোটা কাজে লাগাতে পারেনি। আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ, ট্রেসেবিলিটি, আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণ, কোল্ড-চেইন এবং দক্ষ রপ্তানি ব্যবস্থার অভাবে বিপুল সম্ভাবনা অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে।

সিএসইআর মনে করে, ব্লু ইকোনমিকে আগামী দশকের কৌশলগত প্রবৃদ্ধির খাত হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। গভীর সমুদ্রে বাণিজ্যিক মৎস্য আহরণ, সামুদ্রিক শৈবাল চাষ, অফশোর অ্যাকুয়াকালচার, সামুদ্রিক খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সমুদ্রবন্দরকেন্দ্রিক মেরিন এক্সপোর্ট হাব গড়ে তুলতে পারলে নতুন শিল্প, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

সংস্থাটি মনে করে ২০২৬-২৭ সালের বাজেট খাদ্য নিরাপত্তা ও মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে সেই ভিত্তিকে কার্যকর ফলাফলে রূপ দিতে হলে কৃষি ও মৎস্যকে শুধু ভর্তুকিনির্ভর সামাজিক খাত হিসেবে নয়, বরং প্রযুক্তিনির্ভর, উচ্চমূল্য সংযোজনভিত্তিক এবং রপ্তানিমুখী অর্থনৈতিক খাত হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। কোল্ড-চেইন, গবেষণা, উদ্ভাবন, বেসরকারি বিনিয়োগ ও ব্লু ইকোনমির সমন্বিত বিকাশ ঘটাতে পারলে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির চাপও কমবে এবং বাংলাদেশের অর্থনীতি টেকসই প্রবৃদ্ধির নতুন ভিত্তি পাবে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশে ধান, সবজি ও মাছের উৎপাদন বেড়েছে; কিন্তু কৃষক ন্যায্য মূল্য পান না, আবার ভোক্তাকেও বেশি দামে কিনতে হয়। এর প্রধান কারণ উৎপাদন নয়, বরং সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা। প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ফল, সবজি ও মাছ বাজারে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হয়ে যায়। পর্যাপ্ত কোল্ড স্টোরেজ, সংগ্রহ কেন্দ্র ও আধুনিক পরিবহন না থাকায় কৃষক যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হন, তেমনি খাদ্য মূল্যস্ফীতিও দীর্ঘস্থায়ী হয়।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মহরণে স্পেন-পর্তুগাল, শুরুর একাদশে রয়েছেন যারা

পদযাত্রায় হামলার জন্য সাভারের এমপিকে সন্দেহ নাহিদের

ডিজি ছাড়া ইসিতে এনআইডি সেবা বন্ধ, সেবা মিলবে মাঠে

এনসিপির সমাবেশে বোমা বিস্ফোরণ, ‘প্রশাসনের সহায়তায় হয়েছে’ দাবি নাহিদের

সরকার জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে: নাহিদ ইসলাম

পিপলস্ ইন্স্যুরেন্স পিএলসিতে থ্যালাসেমিয়া সচেতনতা ও স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি অনুষ্ঠিত

এক উপদেষ্টাসহ আওয়ামী লীগের ৪ নেতার পদত্যাগ

শুধু ব্রাজিল নয়, ভারতকেও দুঃস্বপ্ন দেখিয়েছিলেন হালান্ড

দাবি স্বাস্থ্য কর্মকর্তার / আমি কখনো কাউকে স্যার সম্বোধন করতে বলিনি

সাভারে এনসিপির সমাবেশস্থলে ককটেল বিস্ফোরণ, আহতদের পরিচয় প্রকাশ

১০

রিহ্যাব সদস্যের সংবেদনশীল অঙ্গে আঘাত, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি

১১

মেয়াদ শেষের আগেই নিয়োগ বাতিল ডেপুটি গভর্নরের

১২

বৃষ্টি নামলেই বুক কাঁপে ফেনীবাসীর

১৩

এনসিপির সমাবেশে ককটেল বিস্ফোরণের পর থানা ঘেরাও

১৪

টঙ্গীতে দুই গ্রুপের সংঘর্ষ

১৫

রিজার্ভ আরও বাড়ল

১৬

১০ জুলাই পর্যন্ত বান্দরবানের সব পর্যটন কেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা

১৭

ব্রাজিলের বিদায়ের পর বাংলাদেশি ভক্তদের ধন্যবাদ জানালেন রাষ্ট্রদূত

১৮

মিসর ম্যাচের আগে স্বস্তির খবর পেল আর্জেন্টিনা

১৯

এনসিপির সমাবেশস্থলে ককটেল বিস্ফোরণ, আহত ৩

২০
X