কালবেলা ডেস্ক
প্রকাশ : ১৯ জুলাই ২০২৬, ০৩:৫৬ পিএম
আপডেট : ১৯ জুলাই ২০২৬, ০৪:০২ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
জিয়াউর রহমান হত্যা

৪৫ বছর পর যেভাবে সন্ধান মেলে মেজর মোজাফফরের

গ্রেপ্তার মোজাফফর হোসেন। ছবি: সংগৃহীত
গ্রেপ্তার মোজাফফর হোসেন। ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর গোয়েন্দাদের জালে ধরা পড়েছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার অন্যতম আসামি মেজর (অব.) মোহাম্মদ মোজাফফর হোসেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের এক মামলার তদন্ত করতে গিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা সেই সূত্রের সন্ধান পায়। তদন্তের অংশ হিসেবে মোবাইল ফোনের ফরেনসিক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ সূত্র মোজাফফরকে ৪৫ বছর পর গ্রেপ্তারের পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে।

ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তদন্তের অংশ হিসেবে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার সাবেক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর মোবাইল ফোনের ফরেনসিক বিশ্লেষণ করা হয়। এতে তার কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) সংগ্রহ করে দেখা যায়, ২০২৩ সাল থেকে রাজধানীর বনানী ও মিরপুর ডিওএইচএস এলাকা থেকে ব্যবহৃত একাধিক মোবাইল নম্বরের মাধ্যমে এক ব্যক্তি মাসুদ উদ্দিনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করতেন। তাদের মধ্যে সংক্ষিপ্ত সময়ের ফোনালাপ এবং খুদেবার্তা আদান-প্রদানের তথ্যও পাওয়া যায়। তবে নম্বরগুলো ভুয়া পরিচয়ে নিবন্ধিত থাকায় প্রথমদিকে ব্যবহারকারীকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

পরে সন্দেহজনক নম্বরগুলো পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়। প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ নিশ্চিত হয়, নম্বরগুলো ব্যবহার করছিলেন জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার পলাতক আসামি মেজর (অব.) মোহাম্মদ মোজাফফর হোসেন।

এরপর গোয়েন্দা পুলিশ তার অবস্থান শনাক্ত করে রাজধানীর বনানী ডিওএইচএসের একটি বাসায় অভিযান চালায়। বুধবার রাত ১০টা ১০ মিনিটের দিকে সেখান থেকে ৭৭ বছর বয়সী মোজাফফরকে গ্রেপ্তার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে আর্মড ফোর্সেস ডিভিশনকে জানানো হয়। পরদিন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আইনানুগ প্রক্রিয়া শেষে তাকে ঢাকা সেনানিবাসের মিলিটারি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, দীর্ঘ ৪৫ বছরের মধ্যে বেশিরভাগ সময় মোজাফফর প্রতিবেশী একটি দেশে অবস্থান করেছিলেন। সেখানে তিনি ভিন্ন নামে পরিচয়পত্রও তৈরি করেছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং বনানীর যে বাসা থেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন, সেটি তার শ্বশুরবাড়ি। তদন্তের সময় নাকের নিচের একটি তিল দেখে তার পরিচয় চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করা হয়।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের সূত্র ধরেই প্রথমে মোজাফফরের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়। এরপর একটি মোবাইল অপারেটরে কর্মরত তার এক স্বজনের মাধ্যমে বাসার অবস্থান শনাক্ত করা হয় এবং অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়।

প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা বলেন, ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা সন্দেহজনক নম্বরগুলো শনাক্ত করলেও মূল অনুসন্ধান ও অভিযানের কাজ করেছে পুলিশ। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা শুধু সন্দেহজনক নম্বর নিয়ে বসে ছিলাম। আসল কাজটা করেছে পুলিশ।’

বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনা ও প্রকাশিত বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে জিয়াউর রহমানকে হত্যার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত সেনা কর্মকর্তাদের একজন ছিলেন মেজর মোজাফফর। হত্যার সময় তিনি জিয়ার কাছাকাছি ছিলেন বলে উল্লেখ রয়েছে।

সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত বই ‘বাংলাদেশ: অ্যা লিগ্যাসি অব ব্লাড’-এ জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের একটি বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, হামলাকারীরা সার্কিট হাউসে জিয়াউর রহমানকে খুঁজছিলেন। গোলাগুলির শব্দ শুনে জিয়া কক্ষ থেকে বের হলে তার সবচেয়ে কাছেই ছিলেন মেজর মোজাফফর ও লেফটেন্যান্ট মোসলেহউদ্দিন।

বইটিতে দাবি করা হয়, ওই সময় মোজাফফর দৃশ্যত আতঙ্কিত ছিলেন এবং তিনি ও মোসলেহউদ্দিন মনে করেছিলেন, জিয়াকে হত্যা নয়; বরং সার্কিট হাউস থেকে সরিয়ে নেওয়া হবে। পরে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমান এসে খুব কাছ থেকে গুলি করে জিয়াউর রহমানকে হত্যা করেন।

এ ছাড়া পরে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুরের দপ্তরে অনুষ্ঠিত বৈঠকেও মোজাফফর উপস্থিত ছিলেন বলে মাসকারেনহাস তার বইয়ে লিখেছেন। হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক ঘণ্টা পর তিনি মেজর শওকত আলী ও মেজর রেজাকে সঙ্গে নিয়ে আবার সার্কিট হাউসে যান। সেখানে জিয়ার কক্ষে তল্লাশি চালানো হয় এবং ব্যক্তিগত কাগজপত্র ও ডায়েরি খোঁজা হয় বলে বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এসব তথ্য আদালতে প্রমাণিত কোনো সাক্ষ্য নয়; এগুলো বিভিন্ন প্রকাশিত বর্ণনা ও বইয়ের ওপর ভিত্তি করে জানা তথ্য।

জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর বিদ্রোহ ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট সেনা কর্মকর্তারা চট্টগ্রাম সেনানিবাস ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। মাসকারেনহাসের বর্ণনা অনুযায়ী, সেই দলে ছিলেন মোজাফফরও। পরে গোলাগুলির মধ্যে তিনি পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।

জিয়াউর রহমান হত্যার ঘটনায় সামরিক আদালতে ১৮ সেনা কর্মকর্তার বিচার হয়। তাদের মধ্যে ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ড এবং অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। তবে মেজর এস এম খালেদ ও মেজর মোজাফফর পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। তাদের ধরিয়ে দিতে পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছিল।

মোজাফফর হোসেনের দীর্ঘ পলাতক জীবনের বড় অংশ এখনো রহস্যে ঘেরা। মেজর জেনারেল (অব.) মইনুল হোসেন চৌধুরীর স্মৃতিকথা ‘এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক’-এ মোজাফফরের অবস্থান সম্পর্কে কিছু তথ্য পাওয়া যায়।

স্মৃতিকথার বরাতে জানা যায়, ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত থাইল্যান্ডে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত থাকার সময় মইনুল হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে ব্যাংককে দেখা করেছিলেন পলাতক মেজর এস এম খালেদ ও মোজাফফর। জিয়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নিয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছিল বলেও উল্লেখ রয়েছে।

মইনুলের বর্ণনায় বলা হয়, পলাতক মোজাফফর তখন ভারতে ছিলেন। ভারত থেকে ব্যাংককে গিয়ে খালেদকে সঙ্গে নিয়ে দেখা করেন মোজাফফর।

তবে তিনি কতদিন ভারতে ছিলেন, কী পরিচয়ে ছিলেন কিংবা কীভাবে বিভিন্ন দেশে যাতায়াত করেছেন—এসব তথ্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।

জানা গেছে, জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর মোজাফফর ভারতে আত্মগোপনে ছিলেন। একপর্যায়ে তিনি ছদ্মনাম ব্যবহার করে সীমান্ত অতিক্রম করে যাতায়াত করতেন।

কালবেলা/এমএ/এএসএম
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সরকারি হাসপাতালই মানুষের একমাত্র ভরসার জায়গা হতে হবে: প্রধানমন্ত্রী

ইয়াবা মামলায় দুজনের যাবজ্জীবন

হাতীবান্ধা থানার ওসির অপসারণ দাবিতে জামায়াতের বিক্ষোভ

‘২৪ জুলাই দেখা হবে’, ভিডিও বার্তায় ঢাকার ভক্তদের আতিফ

শিক্ষার্থীকে বলাৎকারের অভিযোগে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ গ্রেপ্তার

অতিবৃষ্টির আঘাতে বগুড়ার কৃষি, ৫ কোটি টাকার ফসলহানি

প্রক্সির সহায়তায় নিয়োগ, যোগদান করতে এসে কারাগারে ৪ জন

বিচারপ্রার্থীর মামলা সঠিকভাবে আদালতে উপস্থাপনের আহ্বান প্রধান বিচারপতির

কুকুরেয়ার প্লাস্টিকের ব্যাগে ‘বিশ্বকাপ ট্রফি’! আসল রহস্য কী?

আলিফ হত্যা: সাক্ষ্য দিতে গিয়ে আদালতে কান্নায় ভেঙে পড়লেন আইনজীবী

১০

আর্জেন্টিনার হারে মেসির পাশে দাঁড়ালেন অমিতাভ বচ্চন

১১

সিএসইতে এ বি সিদ্দিকের স্মরণসভা

১২

নদীতে বিলীন বসতভিটার অর্ধেক, আশ্রয় হারানোর শঙ্কায় পরিবার

১৩

স্পেনের বিশ্বকাপ জয়ে খুশি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সমালোচকরা: ইরান

১৪

বিআরবি হসপিটালস লিমিটেডে আইভিএফ সেন্টারের সাফল্য উদযাপন

১৫

৯৯৯-এ ফোন: দুর্গম ঝরনায় যাওয়া ১০ শিক্ষার্থী উদ্ধার

১৬

সৌদি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক / হজে ব্যাকঅ্যাপ আবাসন ১ শতাংশ রাখার অনুরোধ বাংলাদেশের

১৭

এই শিরোপা ফিরিয়ে আনতে সবকিছু উজাড় করে দেব: নিকো পাজ

১৮

এক্স-রে করে পেটে ইয়াবা শনাক্ত, গ্রেপ্তার ৬

১৯

ভারী বৃষ্টি নিয়ে আবহাওয়া অফিসের নতুন বার্তা 

২০
X